কুমারটুলিতে হয়ে গেল রং মাটির পাঁচালী

0
rang matir panchali in kumartuli
কুমারটুলিতে 'রং মাটির পাঁচালী'। নিজস্ব চিত্র।

স্মিতা দাস

শতকোটি দেবদেবীর সূতিকাগৃহ দু’ দিন হয়ে উঠেছিল আলো ঝলমলে প্রদর্শনীশালা। রং, মাটি আর খড়ের গন্ধে স্যাঁতস্যাঁতে কুমারটুলি শুধু নিজের জন্য মনের আনন্দে কাজ করেছে। কোনো ফরমায়েশি কাজ নয়। শুধুই নিজের মনের মাধুরীতে সুসজ্জিত কুমারটুলি। বিশ্ব শিল্পকলা দিবস উপলক্ষ্যে শিল্পের আঁতুড়ঘর কুমারটুলিতে চৈত্র সংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখ, এই দু’ দিন ধরে চলল প্রদর্শনী। এশিয়ান পেন্টস শারদসম্মানের উদ্যোগে এবং কুমারটুলি আর্ট ফোরামের সহযোগিতায় আয়োজন করা হয়েছিল ‘রঙ মাটির পাঁচালী’ শীর্ষক প্রদর্শনীর।  

গোটা কুমারটুলিটাই এই দু’ দিন হয়ে উঠেছিল প্রদর্শনীশালা। ছোটো বড়ো সব শিল্পীই নিজেদের পছন্দের কাজ করে সাজিয়েছিলেন নিজের নিজের স্টুডিও। তাঁদের কাজ বিশ্বের দরবারে যে কোনো শিল্পের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা ধরে। অথচ তাঁদের জন্য আলাদা করে কখনোই কিছু ভাবা হয়নি। এই বার দেখা গেল তেমনই ভাবনা আর তার সার্থক বাস্তবায়ন।

আরও পড়ুন স্বাস্থ্য পরিষেবায় ব্লকচেন কী, জানা গেল হেলথ টেক ২০১৯-এ

প্রদর্শনীতে ছিল বিখ্যাত শিল্পী সুবল পাল, মিন্টু পাল, চায়না পাল, পরিমল পালের শিল্পসৃষ্টি থেকে শুরু করে নবাগত তরুণ শিল্পীদের বহু কাজ। কুমোরটুলির আনাচেকানাচে ছিল রোশনাই।

এই অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে শিল্পী পরিমল পাল খবর অনলাইনকে জানান, পুজোর শিল্পী হিসাবে মানুষ তাঁদের চেনে। তার বাইরেও যে কুমারটুলির শিল্পীদের অন্য সত্তা আছে সেটাই বেরিয়ে এসেছে এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। বিশ্ব শিল্পকলা দিবসে যে এখানকার শিল্পী আর শিল্পকে সম্মানিত করা হয়েছে এটি খুবই গর্বের। তিনি বলেন, আগামিতেও এমন প্রদর্শনী চালিয়ে যাওয়া হবে। প্রদর্শনীতে এক কথায় তিনি তাঁর ছোটোবেলাটি একটি ছোট্টো সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছেন।

শিল্পী সঞ্জয় পাল বলেন, এশিয়ান পেন্টসের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ। নিজের ঘরেই নিজের সৃষ্টির প্রদর্শনী। খুবই ভালো লাগছে। এর আগে ১৯৯০, ১৯৯৪ সালে এমন প্রদর্শনী হয়েছিল। কিন্তু সহযোগিতায় কোনো সংস্থা বা কেউ ছিল না। শুধু কুমারটুলির শিল্পীদের উদ্যোগেই হয়েছিল। এ বারেরটা একটু অন্য রকম। তাঁর ইচ্ছে এমন প্রচেষ্টা দীর্ঘজীবী হোক। প্রদর্শনীতে কাচ, সুতো, ফাইবার, দেওয়াল আর রং দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন একটি প্রবাদকে – দেওয়ালেরও কান আছে। 

শিল্পী চায়না পাল বলেন, খুবই ভালো লাগছে। বছর বছর এমন হলে খুবই ভালো লাগবে। নতুন একটি উৎসবের মতো। এই সময়টা অন্য কাজের চাপ কম থাকে তাই মন দিয়ে কাজটা করাও যাবে। প্রতি বছর হোক, সেটিই চান চায়না। জানিয়ে রাখা ভালো, একচালা ঠাকুরের জন্য বিখ্যাত চায়না পাল। এই প্রদর্শনীতেও তিনি একচালা ঠাকুরই দর্শকদের উপহার দিয়েছেন।

শিল্পী মিন্টু পাল বললেন, এশিয়ান পেন্টস তো প্রতি বছর শারদ সম্মান দিয়ে থাকে। সে থিমশিল্পী থেকে পুজো উদ্যোক্তা সকলকেই। কিন্তু ঠিক যে জায়গাটা থেকে সেই সৃষ্টি মণ্ডপে যায় – সেই জায়গা, সেই শিল্পী, সবই বঞ্চিত হয়েই থাকে। কিন্তু এ বছর বিশ্ব শিল্পকলা দিবস উপলক্ষ্যে এই নতুন চিন্তাভাবনা, এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত। কুমারটুলির শিল্পীরা যে শুধু প্রতিমা গড়েন না, তাঁরা অন্য শিল্পকর্মেও সুনিপুণ এই বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে গেল এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে। তাই এই উদ্যোগকে সাধুবাদ। তিনি আশাবাদী, আগামী দিনে এটি আরও বড়ো হয়ে উঠবে। শিল্পীর হাতই যে তার পরিচয়, হাতটাই সম্পদ আর সত্তার প্রতিফলন সেই ভাবনাটিই প্রদর্শনীতে তিনি তুলে ধরেছেন।    

ক্রিওক্রাফট ভেনচার্সের ম্যানেজিং পার্টনার সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় বললেন, কুমারটুলিকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে গিয়েই এই ভাবনাটা মাথায় আসে। কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে কোনো উপকার করা। ফিরিয়ে দেওয়ার অর্থ কুমারটুলির শিল্পীদের সম্মানিত করা। আর সেটা করা যেতে পারে শিল্পীদের সৃষ্টি নিয়ে একটি প্রদর্শনী করে। তার পরই চিন্তা আসে কখন করা যায় এই অনুষ্ঠান। মনে হয় বিশ্ব শিল্পকলা দিবসের কথা। পাশাপাশি বাঙালির নববর্ষ। মনে হল সোনায় সোহাগা। ঠিক হল এই দিনই করা যাতে পারে এই উৎসব। সাগ্রহে এগিয়ে আসে ‘এশিয়ান পেন্টস শারদ সম্মান’। এতে সহযোগিতা করেছে তারা। গত কয়েক দশক ধরে  সমাজ-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে পথ-চলা, তার একটি বড়ো শরিক এশিয়ান পেন্টস শারদ সম্মান। তাদের সহযোগিতা পেয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত সকলে। সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেছে কুমারটুলির তিনটি সমিতিই। পাশাপাশি গোটা কাজটি তুলে ধরতে সাহায্য করেছেন সুশান্ত পাল, পার্থ দাশগুপ্ত, সুমন চৌধুরী, নূতন সরকার আর সৈমিন্দ্র, জানালেন সব্যসাচীবাবু।   

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here