the holy shephard
নিকোলাস রোয়েরিখের আঁকা দ্য হোলি শেফার্ড।

অরুণাভ ঘোষ

পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত অ্যান্টনি কবিয়াল যিশু ও কৃষ্ণকে একই রূপে দেখেছিলেন। গেয়েছিলেন, “কৃষ্টে আর খ্রিস্টে কোনো তফাত নাই রে, শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে”। সে দিক দেখতে গেলে অ্যান্টনিরই দোসর রাশিয়ান চিত্রশিল্পী নিকোলাস রোয়েরিখ। তিনিও ‘কৃষ্ট’ আর ‘খ্রিস্ট’-এর মধ্যে কোনো প্রভেদ দেখেননি। ভারতের সংস্কৃতিতে রোয়েরিখের অবদান অপরিমেয়।   

রাশিয়ান চিত্রশিল্পী নিকোলাস রোয়েরিখের ১৯টি ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী হতে চলেছে ভারতীয় জাদুঘরে। আগামী জুন মাসের এক তারিখে শুরু হয়ে ওই প্রদর্শনী চলবে পুরো মাস। প্রদর্শনীতে রোয়েরিখের যে ছবিগুলো দেখা যাবে সেগুলো এলাহাবাদ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। এই প্রথম তার থেকে ১৯টি ছবি প্রদর্শিত হবে কলকাতায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী নিকোলাস রোয়েরিখ মূলত একজন পুরাতাত্ত্বিক, ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক। তিনি জীবনের শেষ ক’টা বছর ভারতে কাটিয়েছেন। হিমালয় অঞ্চলের  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে অপরূপ শোভা তিনি তুলির টানে ক্যানভাস-বন্দি করেছেন তা ভারতের অমূল্য সম্পদ।

উল্লেখ্য, আমেরিকার বস্টন মিউজিয়ামে রোয়েরিখের পাঁচ হাজার ছবির একটি সংগ্রহ আছে। ভারতেও তাঁর বেশ কিছু ছবির বিশেষ সংগ্রহ রয়েছে। নিকোলাস রোয়েরিখ তাঁর স্ত্রী হেলেনার প্রভাবে পূর্ব এশিয়া বিশেষ করে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মতত্ত্ব তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও ভগবদ গীতার অসীম টান অনুভব করতেন নিকোলাস। শ্রীকৃষ্ণের প্রতিও আকৃষ্ট হন নিকোলাস। বিদেশি হিসাবে তিনিই প্রথম শ্রীকৃষ্ণকে ক্যানভাসে চিত্রায়িত করেন। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ লীলা করছেন গোপীদের সঙ্গে। ছবির শিরোনাম ‘দ্য হোলি শেফার্ড’।

নিকোলাস প্রসঙ্গে জাদুঘরের অধিকর্তা রাজেশ পুরোহিত জানান, তিনি ছিলেন এক সমৃদ্ধশালী পরিবারের সন্তান। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও পুরোনো জিনিসের প্রতি তাঁর টান ছিল অসীম। এ ছাড়াও গির্জার দেওয়ালে যে চিত্রকলা বা ফ্রেসকো আঁকা হয়, তার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। কমিউনিস্টদের বলশেভিক বিপ্লবের পর তিনি দেশ ছেড়ে প্রথমে ফিনল্যান্ডে যান। তার পরে লন্ডনে কিছু দিন কাটিয়ে ১৯২০-এর শরতে পাড়ি দেন আমেরিকায়। পাঁচ বছর পরে রোয়েরিখ দম্পতি পুত্রদের এবং ছ’ জন বন্ধুকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়েন ‘রোয়েরিখ এশিয়ান এক্সপেডিশন’-এ। সেই অভিযান শেষে তাঁরা ভারতে আসেন ১৯২৮-এ। হিমাচল প্রদেশের নগগরে তিনি ডেরা বাঁধেন। সেখানে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব সংগ্রহশালা।

আরও পড়ুন ঝড়বৃষ্টিতে ভোট? জেনে নিন তৃতীয় দফার ভোটের পাঁচ কেন্দ্রের আবহাওয়া

রাজেশ পুরোহিত বলেন, নিকোলাস রোয়েরিখ নিজের আঁকার মধ্যে দিয়ে নানা অনুসন্ধানমূলক বিষয়কে সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁর জীবৎকালে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছেন। তাঁর আঁকা ছবিতে সব চেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে মধ্য এশিয়া, মঙ্গোলিয়া ও হিমালয় অঞ্চলের। তাঁর প্রত্যেকটি ছবিতে তাই আলাদা বিষয় ফুটে উঠেছে। ছবিগুলিতে প্রকৃতি ও রঙের খেলা অপূর্ব ভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। রোয়েরিখের বাড়িতে ১৯৪২ সালে এসেছিলেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। সঙ্গে ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।

ভারত স্বাধীন হওয়ার বছরে ডিসেম্বর মাসে নগগরেই প্রয়াত হন নিকোলাস রোয়েরিখ। উল্লেখ্য, তাঁর পুত্র স্বেতস্লাভ তৎকালীন ভারতের সিনেমা জগতের ‘ফার্স্ট লেডি’ দেবিকারানির সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here