অমর পাল স্মরণে লোকগানের জমজমাট আসর নবম সহজিয়া উৎসবে

0
ninth sahajiya festival.
সহজিয়া সম্মান ২০১৯ - প্রাপ্তি মুহূর্তে গুল মহম্মদ, শুভেন্দু মাইতি, মনসুর ফকির, দেবদাস বাউল, দেব চৌধুরী ও 'সহজিয়া'র সদস্যরা।

শম্ভু সেন

সময়টা ষাট দশকের গোড়া। আমার তখন শৈশব। মায়ের হাত ধরে ভবানীপুরের সিনেমাহলে দেখতে গিয়েছিলাম ‘শিউলিবাড়ি’। সেই ছবির কাহিনি কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে উত্তমকুমার, অরুন্ধতী দেবী, ছবি বিশ্বাস অভিনয় করেছিলেন। আর মনে আছে একটি গান – ‘রাই জাগো রাই জাগো শুকশারি বলে/কত নিদ্রা যাও গো রাধে শ্যমনাগরের কোলে’। শোনার পরমুহূর্ত থেকেই গানটি আমার মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। আর লোকগানের প্রতি তৈরি হয়েছিল এক অগাধ ভালোবাসা। পরে জেনেছিলাম, এই গানকে বলে ভোরাই, আর যিনি গেয়েছেন তাঁর নাম অমর পাল। শিল্পীকে বসিয়েছিলাম আমার মনের মণিকোঠায়, ভবিষ্যতে যাঁর প্রতিটি গানের জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। সে আমার শৈশবের সুখস্মৃতি, যে স্মৃতি আজও আমাকে অপার আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

সংগীত পরিবেশন সৌমিত্রের।

সেই শৈশবে রেডিওয় অমর পালের ভোরাই শুনে ঘুম ভাঙত। কানে আসত – ‘প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনার মাঝে’ কিংবা ‘রাই জাগো গো, জাগো শ্যামের মনোমোহিনী, বিনোদিনী রাই’ অথবা ‘জাগো হে এ নগরবাসী’

আমার সেই স্মৃতি সে দিন উসকে দিল সহজিয়া ফাউন্ডেশন। রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহে ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় আয়োজিত হয়েছিল নবম সহজিয়া উৎসব। আর সেই উৎসব উৎসর্গ করা হয়েছিল সদ্যপ্রয়াত অমরশিল্পী অমর পালকে। লোকগানের এই কিংবদন্তি শিল্পী আকাশবাণীতে প্রথম গেয়েছিলেন ১৯৫১ সালে। সিনেমায় প্রথম প্লেব্যাক করেন ১৯৫৮-য়। প্রায় ২৫টি ছবিতে প্লেব্যাক করেছিলেন তিনি। তবে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘হীরক রাজার দেশে’র সেই গান ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’ শিল্পীকে এনে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মূলত ভোরাই গানের জন্য বিখ্যাত হলেও তাঁর কণ্ঠে অনায়াসে খেলা করত বাউল-ফকির-ভাটিয়ালি-সারি-জারি গান

লোকগান আর তাঁর উদ্দেশে লেখা স্বরচিত কবিতায় সে দিন স্মরণ করা হল অমর পালকে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অমর-পুত্র অনুপ পাল। তিনি বাবার ছবিতে উত্তরীয় পরালেন।

সহজিয়া উৎসবের অন্যতম অঙ্গ হল সহজিয়া সম্মান প্রদান। লোকসংস্কৃতি গবেষক-গায়ক শুভেন্দু মাইতি, বীরভূমের প্রবীণ বাউল সাধক দেবদাস বাউল এবং রঙ্গ-ব্যঙ্গ গীতিকার ও গায়ক গুল মহম্মদ এ দিন সহজিয়া সম্মানে সম্মানিত হলেন।

সম্মাননার প্রত্যুত্তরে শুভেন্দু মাইতি বললেন দু’ চার কথা। বললেন, অনেকেই বলেন পেটে ভাত না থাকলে গান হবে কী করে? তাই যদি হত তা হলে রতন টাটা গান লিখত, আদিত্য বিড়লা সুর করত আর মুকেশ আম্বানি গাইত। তাঁর সাফ কথা নিরন্ন মানুষই লোকসংস্কৃতি বাঁচিয়ে রেখেছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন তিনি। বললেন, দেশের পরিস্থিতি রাজনৈতিক নেতাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।

সংগীত পরিবেশন করছেন গাবু।

সহজিয়া উৎসব উপলক্ষ্যে এ দিন চাঁদের হাট বসেছিল রবীন্দ্র সদন মঞ্চে, আর প্রেক্ষাগৃহ ছিল কানায় কানায় ভরতি। লোকগানের প্রায় ছয় দশককে এ দিন হাজির করেছিল সহজিয়া। ছিলেন দেবদাস বাউল, শুভেন্দু মাইতি, মনসুর ফকির, ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র বাপিদা (তাপস দাস) ও বুলাদা (প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়) থেকে শুরু করে হাল আমলের পটা, উজ্জয়িনী, শতদল, পর্ণাভ প্রমুখ।

‘সহজিয়া’র প্রেসিডেন্ট সিদ্ধার্থ দাসের প্রারম্ভিক বক্তৃতা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু। তার পর আসরবন্দনা করলেন দেবদাস বাউল। এর পর নানা আঙ্গিকের লোকগান আর তাঁর উদ্দেশে লেখা কবিতায় স্মরণ করা হল অমর পালকে। একে একে লোকসংগীত পরিবেশন করলেন ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র স্রষ্টা গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র ‘লক্ষ্মীছাড়া’র গাবু, ‘চন্দ্রবিন্দু’র উপল, উপালি চট্টোপাধ্যায়, পটা, শতদল, ‘দোহার’-এর রাজীব, অমর পালের দুই ছাত্র রাজকুমার ও প্রাণেশ, পর্ণাভ, ‘ভূমি’র সৌমিত্র, উজ্জয়িনী, রঞ্জনপ্রসাদ, জি বাংলার ‘সারেগামাপা’-র মিউজিক ডিজাইনার রথীজিৎ, বুলাদা-বাপিদা, ‘ক্যাকটাস’-এর সিধু, ইন্দ্রজিৎ, তপন রায়, জয়শংকর, নাজমুল, তীর্থ বিশ্বাস, জি বাংলার ‘সারেগামাপা’-খ্যাত তীর্থ, কার্তিক দাস বাউল, মনসুর ফকির এবং দেব ও তাঁর সহজিয়া লোকগানের দল। কবিতায় অমর পালকে শ্রদ্ধা জানালেন অরুণ চক্রবর্তী ও বাসু পাল।

রথীজিতের পরিবেশনা।

গান শোনালেন শুভেন্দু মাইতিও। ৭৫ বছর বয়সে তাঁর দরাজ ভরাট গলায় ‘সেলাম চাচা সেলাম তোমার পায়ে, বড়ো নাওয়ের মাঝি মোরে বানাইশেন আল্লায়’ দর্শক-শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রাখল।

সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর সেই বিশ্বখ্যাত ভূতের নাচের দৃশ্য কোরিওগ্রাফ করেছিলেন কিংবদন্তি লোকনৃত্যশিল্পী শম্ভু ভট্টাচার্য। আর ‘গুপী গাইন…’-এর সিক্যুয়েল ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে গান গেয়েছিলেন অমর পাল। এ দিনের অনুষ্ঠানে এক অদ্ভুত সমাপতনে মিলে গেলেন লোকশিল্পের দুই ধারার এই দুই প্রাণপুরুষ। প্রয়াত শম্ভু ভট্টাচার্যের স্ত্রী চন্দ্রা ভট্টাচার্যের সাহায্যার্থে সহজিয়া ফাউন্ডেশনের আবেদনে এ দিন উপস্থিত দর্শকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হল ২৫ হাজার টাকা এবং সেই টাকা তুলে দেওয়া হল চন্দ্রাদেবীর হাতে।

আরও পড়ুন নতুন করে রবি ঠাকুরের ‘শাস্তি’

এ দিনের অনুষ্ঠানে আরও যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী অনসূয়া চৌধুরী, কবি অরুণ চক্রবর্তী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ শিবির চৌধুরী, অভিনেত্রী শাওন সেন, চিত্রপরিচালক অনিন্দিতা সর্বাধিকারী প্রমুখ। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মধুশ্রী এবং ‘সহজিয়া’র প্রাণপুরুষ দেব চৌধুরী।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here