শ্রোতা-দর্শকদের হৃদকমলেই থাকল দেবের ‘সহজিয়া’ আর সৌমিত্রর ‘ভূমি’

0
সৌমিত্র আর দেবের যৌথ পরিবেশনা।

নিজস্ব প্রতিনিধি: সে দিন ছিল ‘হৃদকমল’-এর পঞ্চম বর্ষ পূর্তি উৎসব। সেই উপলক্ষ্যে রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত ‘হৃদকমলে রাখবো’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সম্মাননা জানানো হল বাংলা ব্যান্ড ‘ভূমি’র প্রধান সৌমিত্র রায়কে। এ ছাড়াও সম্মানিত করা হল বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অরুণাভ লাহিড়ী, নাট্য পরিচালক আইনজীবী হীরক কুমার ঘোষকে। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন কবি অরুণ চক্রবর্তী, নাট্য পরিচালক চিকিৎসক তপনজ্যোতি দাস এবং অভিনেত্রী সাওন সেন।

স্বাগত ভাষণে ‘হৃদকমল’-এর সাধারণ সম্পাদক প্রবীর চৌধুরী সকলকে ধন্যবাদ জানালেন। সংস্থার সভাপতি প্রতিমা রায় স্মরণ করলেন প্রয়াত সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেনকে। তিনি জানালেন, ‘হৃদকমল’-এর প্রথম তিন বছরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নবনীতা দেবসেন।          

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল দেব চৌধুরী ও তাঁর ‘সহজিয়া’ এবং সৌমিত্র রায় ও তাঁর ‘ভূমি’র পরিবেশনা। ‘সহজিয়া’র পরিবেশনায় কী ছিল না! বাউল, ফকির, দরবেশি, গোয়ালপাড়ি, ঝুমুর, কাওয়ালি, বিহু – লোকসংগীতের ঐতিহ্যশালী ভাণ্ডার একেবারে উজাড় করে দিল শ্রোতা-দর্শকদের কাছে। আর ‘ভূমি’ মঞ্চে হাজির হয়েছিল তাদের জনপ্রিয় সব গানের ডালি নিয়ে।

‘শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছো গো রাই ঘুমাইয়া’ – উদাত্ত গলায় ধরলেন দেব, সভাগৃহ ‘ভোরাই’-এর সুরে তখন মাতোয়ারা। অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘ভূমি’কে স্মরণ করে দেব বললেন, “আজ বারান্দায় রোদ্দুরের সঙ্গে এক মঞ্চে গাওয়া। সেই ছোটোবেলা থেকেই ‘ভূমি’র গান শুনছি।” দেবের দ্বিতীয় গান ও-পার বাংলার – ‘দিল না দিল না নিল মন দিল না, এত যে নিঠুর বঁধু জানা ছিল না’। একের পর এক গান পরিবেশনের ফাঁকে দেব জানিয়ে দিয়েছিলেন, “আজ একটু অন্য ধরনের গান পরিবেশন করব।”

ও-পার বাংলার লালনের পরেই দেবের গলায় এ-পার বাংলার হাউরে গোঁসাইয়ের ‘খ্যাপা তোর কোন বিন্দুতে মদন অচেতন’ অনুষ্ঠানে অন্য মাত্রা যোগ করল। তার পরেই দেব চলে গেলেন প্রতিমা বড়ুয়ার গাওয়া সেই জনপ্রিয় গোয়ালপাড়ি গানে – ‘তোমরা গেইলি কি আসিবেন মোর মাহুত বন্ধুরে’।

রবীন্দ্র সদনে ‘হৃদকমলে রাখবো’ অনুষ্ঠানে।

বৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল এ দিন সহজিয়া তথা দেবের পরিবেশনা। গোয়ালপাড়ির পরে দেবের উপস্থাপনা বাংলা কাওয়ালি। গান শুরু করার আগে দেব নিজেই জানালেন, “এখন যে গান গাইছি সচরাচর গাই না।” তার পরেই ধরলেন ‘ধন্য ধন্য মেরা সেলসেলা এল, দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়া এল’। গোটা প্রেক্ষাগৃহ কাওয়ালির তালে যেন নেচে উঠল।

এর দেব পরিবেশন করলেন ১৬০০ পদের সৃষ্টিকর্তা শাহ আবদুল করিমের গান – ‘আমার মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়নারে’। এর মাঝে সহজিয়ার তরুণ চৌধুরী পরিবেশন করলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’র সেই বহুল প্রচারিত গান – ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’ – আজকের দিনে এর চেয়ে বড়ো সত্যি আর কিছু নেই। এর পরের পরিবেশনা শ’ দেড়েক বছর আগে রাধারমণ দত্ত পুরকায়েতের লেখা ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’।

এ বার সেই বিপুল জনপ্রিয় গান ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা’র রচয়িতা কবি অরুণ চক্রবর্তীর লেখা আরেকটি কবিতা অবলম্বনে গান ‘মন দে যৈবন দে’। কবি স্বয়ং মঞ্চে হাজির হয়ে ‘সহজিয়া’র সঙ্গে গলা মেলালেন, উদ্বেল হয়ে উঠল সভাগৃহ।

লোকসংগীতের নানা ধারা ছুঁয়ে দেব এলেন দরবেশি গানে। গান পরিবেশন করার আগে দেব শোনালেন সেই কাহিনি, কী ভাবে আলাপ হয়েছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত লোকগীতির দরবেশি ধারার কিংবদন্তি শিল্পী কালাচাঁদ দরবেশের সঙ্গে আর সেই আলাপ তাঁর সংগীতজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। দেব উপস্থাপন করলেন কালাচাঁদের গান – ‘তুমি জানো না সে বন্ধুর বাড়ি আছে কোন জাগায়’।

‘সহজিয়া’র শেষ পরিবেশনা অসমের সেই বিখ্যাত গান ‘ফাগুনের পসুয়ায়’। এরই সুরে ‘ভূমি’র গান ‘ফাগুনের মোহনায়’। ‘সহজিয়া’ ও ‘ভূমি’র যৌথ পরিবেশনা প্রেক্ষাগৃহে এক দারুণ পরিবেশ সৃষ্টি করল, মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিল শ্রোতা-দর্শকদের। এ দিন দেব ছাড়া ‘সহজিয়া’র পক্ষে মঞ্চে ছিলেন তরুণ (বাঁশি), দীপ (কিবোর্ড), তিলক মহারাজ (খোল), ইন্দ্র (ড্রামস), অর্ণব (পারকাশন), রাজদীপ (বেস গিটার) এবং শংকর (ঢোল)।

আরও পড়ুন: বোলপুরের মঞ্চ মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিল বাগুইআটি নৃত্যাঙ্গন ও আন্তরিক

‘সহজিয়া’র পরে মঞ্চে এল ‘ভূমি’, ‘ভূমি’ শুধু একটা ব্যান্ডের নাম নয়, ‘ভূমি’ বাংলা সংগীত জগতে একটা আন্দোলন। এই আন্দোলনের পথিকৃৎ সৌমিত্র রায় ৪০ বছর বয়সে সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে গানকেই পাথেয় করে নিয়েছিলেন। ‘ভূমি’র চলার পথে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, ভাঙা-গড়া এসেছে, কিন্তু তারা থেমে যায়নি, বরং এগিয়ে চলেছে আরও উঁচু শিখর ছোঁয়ার জন্য। তাদের মুকুটে অনেক পালক – ‘ভূমি’ এশিয়ার একমাত্র ব্যান্ড যারা নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সদর দফতরে অনুষ্ঠান করার সুযোগ পেয়েছে। ১৯৯৯-এ তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘যাত্রা শুরু’ দিয়ে পথ চলা শুরু। আজ প্রকাশিত হয়েছে ১৪টা অ্যালবাম, রাজ্য-দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে ‘ভূমি’ করেছে ১৭৭৮টা লাইভ প্রোগ্রাম।

এ দিন মঞ্চে ‘ভূমি’ এল তাদের অত্যন্ত পরিচিত গানের সম্ভার নিয়ে। ‘বারান্দায় রোদ্দুর’, ‘পচা কাকা’, ‘কান্দে শুধু মন’, ‘লালে লালেশ্বরী’র উন্মাদনায় মেতে উঠলেন উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকরা।

সমগ্র অনুষ্ঠানটি কথায় ও আবৃত্তিতে সুচারু ভাবে বেঁধে রেখেছিলেন বাচিক শিল্পী শোভনসুন্দর বসু।        

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.