শম্ভু সেন:

বিশ্বব্যাপী এই বিধ্বংসী কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় সারা পৃথিবীর প্রায় সব শিল্পীই নিজেদের বাড়িতে বসে ভার্চুয়াল ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে কিছু না কিছু কাজ করছেন, তা তিনি গায়ক, বাদ্যযন্ত্রশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, বাচিকশিল্পী, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা বা অন্য যে কোনো শিল্প মাধ্যমের সঙ্গেই যুক্ত থাকুন না কেন মূলত তিনটি কারণ তাদের এই কাজে প্রণোদিত করেছে। প্রথমত, লকডাউন চলাকালীন ঘর-গেরস্থালির নানা রকম দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও অনেকটা উদ্বৃত্ত সময় থাকছে; দ্বিতীয়ত, এত দিন বাড়ির মধ্যে কোয়ারান্টাইন থেকে একঘেয়ে জীবনে কিছু বৈচিত্র্য আনা এবং তৃতীয়ত, ক্রিয়েটিভ এক্সারসাইজ। সারা বিশ্বেই এই সময় বেশ কিছু ভালো মানের কোয়ারান্টাইন প্রজেক্ট হয়েছে। বাংলাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই, কলকাতার চার জন ভিন্ন ধারার মিউজিশিয়ানও একটি দারুণ কোয়ারান্টাইন মিউজিক প্রজেক্ট করে ফেলেছে, নাম ‘ফোক কানেক্ট’। 

এর সূত্রপাত এই বছরই জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে। চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ডের উপল সেনগুপ্তের বিখ্যাত ‘রুফ কনসার্ট ২০২০’-এর জন্য কাজ করতে গিয়ে দেখা হয় সহজিয়ার মূল গায়ক দেব চৌধুরী ও মিউজিক ডিজাইনার-প্রোডিউসার রুদ্রনীল চৌধুরীর। তাঁরা পরস্পরকে দীর্ঘদিন ধরে চিনলেও এর আগে এক সঙ্গে কোনো কাজ করেননি। এর ঠিক পর পরই চুঁচুড়ায় আরেকটি রুফ কনসার্ট ‘চিলেকোঠা’র জন্য এক সঙ্গে পারফর্ম করা যায় কি না, এ রকম চিন্তা-ভাবনা থেকেই ‘ফোক কানেক্ট’-এর ভাবনা শুরু হয়।

দেব বলেন, “আমি রুদ্রনীলকে ওর কাজের মাধ্যমে অনেক আগে থেকেই চিনতাম, আমি ওর কাজ অত্যন্ত পছন্দ করি, আর রুদ্রনীল শুধুই নানা রকম ইনস্ট্রুমেন্ট বাজায় না, ও যে মিউজিকটা প্রোডিউস করে তার অন্তর্নিহিত অর্থ ও দর্শন বোঝে।” রুদ্রনীল যোগ করেন, “আমি সব সময় লোকসংগীত নিয়ে কাজ করতে চেয়েছি, তবে সব সময়েই এমন একজন মানুষকে খুঁজেছি যে শুধু লোকসংগীত গায়ক-বাদক না, বিষয়টি গভীর ভাবে জানে ও যাপন করে।”

রুদ্রনীল চৌধুরী মিউজিক প্রোডিউসার হিসাবে সংগীতের নানা রকম ধারা – ব্লুজ, জ্যাজ, রক ইত্যাদি নিয়ে কাজ করলেও লোকসংগীতের প্রতি তাঁর একটা বিশেষ ঝোঁক বরাবর ছিল। রুদ্রনীলের বাবা ভালো খোল বাজান, সঙ্গে আরও নানা রকম তালবাদ্য। চন্দননগরের পৈতৃক বাড়িতে সুরের আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা। অন্য দিকে দেবের সাংগীতিক পথ চলা শুরু হয় মহীনের ঘোড়াগুলির গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। কান্ট্রি, ব্লুজ, রক এবং সিনেমার মিউজিক নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার পর গত পনেরো বছর ধরে তিনি বাংলার লোকসংগীত নিয়ে নিবিষ্ট এবং বিস্তৃত কাজ করছেন।

মূলত দেব ও রুদ্রনীল এই দু’জনের সাংগীতিক ভাবনার মেলবন্ধনের নামই ‘ফোক কানেক্ট’। এই জার্নির মধ্যে দিয়ে তাঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন ধারার ফোক মিউজিশিয়ানদের কানেক্ট করতে চান। চুঁচুড়ায় সেই রুফ কনসার্ট ‘চিলেকোঠা’র সময়েই এই প্রজেক্টে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হন আরও দু’জন দারুণ মিউজিশিয়ান। গায়ক-গিটারিস্ট-প্রোগ্রামার-প্রোডিউসার ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার রুদ্র সরকার এবং ‘পরশপাথর’-এর সেই বিখ্যাত পারকাশনিস্ট পিকলু তথা কিংশুক চক্রবর্তী।

পুরো প্রজেক্টটি কনসিভ করে সিনে লাইভ মিডিয়া এন্টারটেনমেন্ট। কিন্তু এই কাজটি বাস্তবায়িত হওয়ার মুখেই লকডাউন শুরু হল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সবাই নিজেদের বাড়ির সেটআপে অডিও রেকর্ডিং এবং স্মার্টফোনে বা ডিজিটাল ক্যামেরায় ভিডিও রেকর্ডিং করেন। তাঁদের সহায়তা করেন তনুশ্রী, মেঘা, প্রিয়তা আর কৃষ্ণেন্দু। পরে সামগ্রিক সাউণ্ড মিক্সিং-মাস্টারিং, ভিডিও এডিটিং এবং পোস্ট-প্রোডাকশন করেছেন রুদ্র সরকার।

এই ‘ফোক কানেক্ট’-এর প্রথম নিবেদন লালন সাঁইজির সেই বিখ্যাত গান ‘প্রেম রসিকা হব কেমনে’। এই গানটিকেই প্রথম গান বেছে নেওয়ার কারণ হিসাবে দেব বলেন, “গানটি খুবই রিদমিক, গ্রুভি এবং এর মিউজিক ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমেরিকার লোকসংগীতের একটি জনপ্রিয় ধারা ব্লু-গ্রাস স্টাইল ব্যবহার করার ফলে গানটির মিউজিকাল অ্যাপ্রোচ বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের যে কোনো ভাষার মানুষকে কানেক্ট করবে।” রুদ্রনীল বলেন, “আমাদের এই প্রথম ট্র্যাকটির মধ্যে আমরা কোনো সিন্থেটিক সাউন্ড ব্যবহার করিনি, প্রায় সবটাই অ্যাকুয়াস্টিক এবং অথেনটিক।”

সাউন্ড-স্টুডিও-লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন-কাট-এর প্রচলিত ধারার বাইরে এসে এখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী একেবারে অন্য রকম ভাবে পরিণতি পেল এই কোয়ারান্টাইন প্রজেক্ট, যা উপল সেনগুপ্তের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ‘Gaan Taan’ থেকে সম্প্রতি রিলিজ হয়েছে। আমরা খবর অনলাইনের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগের সাফল্য কামনা করি – বাংলা লোকসংগীতের বিশ্বায়ন হোক।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন