গড়িয়া উৎসবে শ্রোতা-দর্শকদের মাতিয়ে দিল ‘সহজিয়া’

0
sahajiya songs at garia utsav

নিজস্ব প্রতিনিধি: গড়িয়া উৎসবের চূড়ান্ত দিনে একটা মনোজ্ঞ সন্ধ্যা উপহার দিল ‘সহজিয়া’। দেব চৌধুরীর নেতৃত্বে সহজিয়া ফাউন্ডেশন রবিবার যে লোকসংগীতের ডালি তুলে দিল শ্রোতা-দর্শকদের, তা এক কথায় অনবদ্য। ‘সহজিয়া’ পরিবেশন করল লোকগানের বিভিন্ন ধারার নমুনা। সেই গান শ্রোতা-দর্শকদের টানা এক ঘণ্টা মজিয়ে দিল, আপ্লুত করে রাখল, মাতিয়ে দিল।

গড়িয়ার কানুনগো পার্কে এই প্রথম গড়িয়া উৎসব আয়োজন করা হল। তিনদিনব্যাপী এই উৎসবের রবিবার ছিল শেষ দিন। সুষ্ঠু ভাবে এই উৎসবের আয়োজনের পুরো কৃতিত্ব কলকাতার ১১০ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপিতা অরূপ চক্রবর্তীর।

খোল বাজাচ্ছেন তিলক মহারাজ। নিজস্ব চিত্র।

প্রথমে ‘ভোরাই’ দিয়ে শুরু হল ‘সহজিয়া’র পরিবেশন। “রাই জাগো, জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই” – প্রথম গানেই কামাল। মজে গেলেন মাঠভর্তি দর্শককুল। এর পর লালন ফকিরের সেই বিখ্যাত গান – “মিলন হবে কত দিনে’ – কী জমজমাট পরিবেশনা। তার পরের গানটি সে রকম জনপ্রিয় লোকগীতি নয়, কিঞ্চিৎ কম শোনা যায় – “বাঁকা নদীর পিছল ঘাটে ওরে যাবি কী করে”। গানটি পরিবেশন করার আগে দেব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন এই গানের মাহাত্ম্য – কী ভাবে এই গানে মিশে আছে বৌদ্ধতত্ত্ব, সুফিবাদ আর শ্রীচৈতন্য-নিত্যানন্দ-অদ্বৈতানন্দের ভক্তিবাদ।

পরের গান – “তুমি জানো না সেই বন্ধুর বাড়ি কোন জাগায়”। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত লোকগীতির দরবেশী ধারার কিংবদন্তি শিল্পী কালাচাঁদ দরবেশের এই গান পরিবেশনার আগে দেব শুনিয়ে দিলেন সেই কাহিনি, কী ভাবে কালাচাঁদের সংস্পর্শে এলেন তিনি। এর পরের গানটি ছিল বহুল প্রচারিত বিপুল জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগীতি – “কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়” – আজকের দিনে এর চেয়ে বড়ো সত্যি আর কিছু নেই। গানটির পরিবেশনায় মুখ্য গায়ক ছিলেন তরুণ চৌধুরী। তাঁর ভরাট গলা এই গানটিকে একটা অন্য মাত্রা দিল। তাঁর কথার সূত্র ধরেই বলতে হয়, এই গান বোধহয় আগামী একশো বছর সত্যি থাকবে।

আরও পড়ুন ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮, অন্য ভাবে পালন করল বালার্ক থিয়েটার গ্রুপ

গান পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে ‘সহজিয়া’র অর্থ কী, কেন সহজিয়া ফাউন্ডেশনের জন্ম, ‘সহজিয়া’র কাজ ইত্যাদি বিষয়ে শ্রোতা-দর্শকদের অবহিত করলেন দেব। “কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়”-র পর গোয়ালপাড়া অঞ্চলের সেই বিখ্যাত গানের পরিবেশনা, যাকে অমর করে রেখেছেন প্রতিমা বড়ুয়া – “তোমরা গেইলে কি আসিবেন মোর মাহুত বন্ধুরে” – এই গানে যে ছবিটা ধরার চেষ্টা হয়েছে, ‘সহজিয়া’র পরিবেশনে তা যেন চোখের সামনে ভাসছিল। এর পরের পরিবেশনা শ’ দেড়েক বছর আগে রাধারমণ দত্ত পুরকায়েস্তর লেখা “ভ্রমর কইয়ো গিয়া” – এই গানে ‘সহজিয়া’র দেওয়া বহিরঙ্গের সাজটাও খুব মানানসই হয়েছে। আর রাধারমণের আর্তি যে ভাবে ফুটে উঠল এই গানে তা অতুলনীয়।

শ্রীরামপুর স্টেশনের মতো বেমানান জায়গায় মহুয়া গাছ দেখে কবি অরুণ চক্রবর্তীর কলমে যে গান এসেছিল, এ দিন ‘সহজিয়া’র শেষ পরিবেশনা ছিল সেই গান – “লাল পাহাড়ির দেশে যা”। ‘সহজিয়া’র শিল্পীদের সঙ্গে তখন শ্রোতা-দর্শকরাও আবেশে বিভোর।

felicitation to sahajiya
‘সহজিয়া’কে সংবর্ধনা। রয়েছেন পুরপিতা অরূপ চক্রবর্তী (বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয়)। নিজস্ব চিত্র।

সব কিছুর তো শেষ আছে। ‘সহজিয়া’র নানা কাজে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে দেব যখন অনুষ্ঠান শেষ করার কথা জানাচ্ছেন, তখন সমস্ত শ্রোতা-দর্শকের একটাই মনোবাসনা ছিল – ইস, আর খানিকক্ষণ যদি হত!

এ দিন দেব ছাড়া ‘সহজিয়া’র পক্ষে মঞ্চে ছিলেন তরুণ (বাঁশি), দীপ (কিবোর্ড), তিলক মহারাজ (খোল), ইন্দ্র (ড্রামস), অর্ণব (পারকাশন) এবং রাজদীপ (বেস গিটার)। আর যাঁর কথা না বললেই নয়, তিনি সংস্থার ম্যানেজার শিবু। এক জনের কথা আলাদা ভাবে না বললে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি তিলক মহারাজ। বর্ধমানের মোহনপুর গ্রামের শ্মশানচারী এই ৮৩ বছরের মানুষটি খোলে যে খেল দেখালেন, তা ভোলা যায় না। শুধু তা-ই নয়, লোকগানের তালে যে ভাবে নাচলেন, তাতে বলাই যায়, ৮৩ বছর বয়সেও তিনি টগবগে তরুণ।

গড়িয়ায় এমন একটি মনোগ্রাহী উৎসব উপহার দেওয়ার জন্য পুরপিতা অরূপ চক্রবর্তীর অবশ্যই অসংখ্য ধন্যবাদ প্রাপ্য।

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here