১০০ বছরের সত্যজিতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের এই গল্পটি কি জানেন?

0

ওয়েবডেস্ক: রায় পরিবার অর্থাৎ সত্যজিৎ রায়, সুকুমার রায়ের পরিবারের সাহিত্যচর্চার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ অনেক আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকাতে ছোটোদের জন্য দু’ একটি ছড়া কবিতাও যে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে কথা অনেকেই জানেন।

সত্যজিতের জন্ম হয়েছিল উত্তর কলকাতার গড়পার রোডের বাড়িতে। সে বাড়ি থেকেই সন্দেশ পত্রিকাটি প্রকাশিত ও ছাপানো হত। সত্যজিৎ রায়ের আড়াই বছর বয়সে বাবা সুকুমার রায় মারা যান। সুকুমারের অকাল মৃত্যুর পরে ‘সন্দেশ’ পত্রিকার ভবিষ্যতে এক অনিশ্চয়তা নেমে আসে। মাঝেমাঝেই বন্ধ হয়েছে, আবার নতুন উদ্যমে চালু হয়েছে। এ ভাবেই চলেছে ‘সন্দেশ’।

Loading videos...

সত্যজিত রায় তখন খুবই ছোটো। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে তাঁরা উত্তরায়ণে গিয়েছিলেন। সে সময় সত্যজিতের খুব ইচ্ছা ছিল, অটোগ্রাফ সংগ্রহের খাতায় রবীন্দ্রনাথের অটোগ্রাফ নেওয়ার।  বালক সত্যজিৎ রায়কে ‘মানিক’ নামেই চিনতেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বকবির সামনে কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গিতে অটোগ্রাফের খাতাটা নিয়ে দাঁড়াতেই কবিগুরু পরম স্নেহে কাছে টেনে নিয়ে তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, খাতা নিয়ে সে কেন এসেছে? ছোট্টো মানিক খাতাটা এগিয়ে দিয়ে তাঁর ইচ্ছার কথাটা জানিয়েছিলেন। কবি তাঁর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তারপর পরম স্নেহে বলেছিলেন, ‘এটা থাক আমার কাছে; কাল সকালে এসে নিয়ে যেও।’

কবিগুরুর আশীর্বাদ নিতে মানিক পরদিন গেলেন উত্তরায়ণ ভবনে। টেবিলের ওপর চিঠি-পত্র, খাতা-বইয়ের ডায়েরির পাহাড়। তার পেছনে বসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মানিককে দেখতে পেয়েই তাঁর ছোট্টো বেগুনি রঙের খাতাটি খুঁজতে লাগলেন। কিছুক্ষণ খোঁজার পর পাওয়া গেল খাতাটি। তার পর সেটি সত্যজিতকে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। মা সুপ্রভা রায়ের দিকে চেয়ে কবিগুরু বলছিলেন, ‘এটার মানে ও আরেকটু বড়ো হলে বুঝবে।’ খাতা খুলে বালক সত্যজিৎ আট লাইনের ভুবনজয় করা কবিতাটি দেখলন। বিশ্বকবির ঘর থেকে বের হয়ে উত্তরায়ণের সামনের যে বিশাল আমগাছ, তার নীচে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে আবৃত্তি করতে লাগলেন মানিক-

‘বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছে সিন্ধু।/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশিরবিন্দু।’

এক টানে আটটি লাইন আবৃত্তি করে কিছুক্ষণ থামল সে। তার পর দম নিয়ে লাইনগুলোর নীচের শব্দগুলো উচ্চারণ করল- ৭ই পৌষ ১৩৩৬ শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ততক্ষণ মা এসে পেছনে দাঁড়িয়েছেন। জানতে চাইলেন লাইনগুলোর মানে বুঝেছে কিনা! সত্যজিৎ তখন মাথা অল্প ঝাঁকিয়ে জানাল, ‘কিছুটা’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব সত্যজিতের সারা জীবনে নানা ক্ষেত্রে পড়েছে। শান্তিনিকেতন থেকে অর্জন করা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নানা ভাবে সত্যজিৎ রায়ের ‘কাজে’ ঘুরে ফিরে এসেছে।

সিনেমা তো বটেই, লেখক সত্যজিৎ-এর ওপরও রবীন্দ্রনাথ এবং শান্তিনিকেতন ঘুরে ফিরে প্রভাব ফেলেছে।

তাঁর বিভিন্ন কাজে, ছবিতে, বোলপুর বীরভূম রবীন্দ্র স্মৃতিভরা স্থানগুলি বার বার উঠে এসেছে। শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দু’টি বিষয় শিখিয়েছে, ছবি দেখা এবং বিশ্ব-প্রকৃতিকে চেনা। রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি গল্প উপন্যাস তিনি সিনেমা তৈরি করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে ‘ঘরেবাইরে’, ‘নষ্টনীড়’ এবং ‘পোস্টমাস্টার’, ‘মণিহারা’ ও ‘সমাপ্তি’ (তিনটি একত্রে ‘তিনকন্যা’)। রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করেছেন বহু ছবিতে।

তিনি শান্তিনিকেতন থেকে শিখেছিলেন সূর্যের আলোয় ছবি আঁকতে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তথ্যচিত্রও তৈরি করেছিলেন।

নোবেল ও অস্কার দুইটিই বিদেশি পুরস্কার। প্রথম বাঙালি হিসাবে প্রথমটি পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দ্বিতীয়টি পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। 

সূত্র – যখন ছোটো ছিলাম- সত্যজিৎ রায়, Rabindranath Tagore By Satyajit Roy, Our Films and Thier, Films By Satyajit Roy, উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন