dhanteras
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

ধনতেরস। মোদ্দা কথায় বাঙালি বুঝে গিয়েছে এই উৎসব ধনের উৎসব, লক্ষ্মীলাভের উৎসব। কয়েক বছর আগেও বাঙালির কাছে অপরিচিত ছিল এই উৎসব। কিন্তু উৎসবপ্রিয় বাঙালি ইদানীং এই উৎসবকে নিজের উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে নিচ্ছে।

আশ্বিনের শারদোৎসবের মতো কার্তিকে হেমন্তোৎসব তথা দীপাবলি। পাঁচ দিনব্যাপী এই দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয় ধনতেরস দিয়ে।

‘ধন’ শব্দের অর্থ সম্পদ এবং ‘তেরস’ শব্দের অর্থ তেরো। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী। তাই এই তিথির নাম ধনত্রয়োদশী বা ধনতেরস। তাই এই দিন শ্রী ও সম্পদের দেবী মহালক্ষ্মীর আরাধনা করার বিধান আছে। প্রচলিত বিশ্বাস, পাঁচ দিনের এই উৎসবে প্রথম দিন ধনতেরসে সোনা কিনলে লক্ষ্মীদেবীর কৃপালাভ হয়। ওই দিন সমুদ্রমন্থনে লক্ষ্মীর সঙ্গে উঠে এসেছিলেন দেব-চিকিৎসক ধন্বন্তরিও। তাই এই তিথিকে ধন্বন্তরি ত্রয়োদশীও বলা হয়। ধনলাভের জন্য এ দিন যেমন লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা করা হয়, তেমনই রোগমুক্ত থাকার জন্য ধন্বন্তরিরও পূজা করা হয়।

পশ্চিম ভারতের বছর শুরু হয় দিওয়ালি বা দীপাবলি থেকে। হালখাতা, বাণিজ্যের নতুন সূচনা। সেখানের বাণিজ্যের প্রসারও চোখে পড়ার মতো। তাই পূর্ব ভারতের তুলনায় লক্ষ্মীপুজোর আয়োজনেরও প্রাচুর্য দেখা যায়। কার্তিক মাসের অমাবস্যায় এই বাংলাও সাজে আলোকমালায়। কিন্তু এখানে দীপাবলির অন্য অর্থ। আনন্দের বহিঃপ্রকাশের থেকেও অন্ধকারের ওপর আলোর জয়। অর্থাৎ অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞানে উত্তরণের তত্ত্ব বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

দিওয়ালি বা দীপাবলির সূচনা পুরাকালে কোন সময়ে হয়েছিল, তা নানা ব্যাখ্যায় বর্ণিত। যেমন বলা হয়, রামচন্দ্র বনবাস শেষ করে অযোধ্যায় ফিরে এলে নগরবাসী সেই মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে দীপাবলি উদযাপন করেন। অন্য দিকে, এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ নরকাসুর বধ করেন। সেই জয় উপলক্ষে আলোকমালার আয়োজন। আরও একটি মতে, শিব-পার্বতীর পুনর্মিলন উৎসব। এ সবের আগে ধনতেরস কি তা জানাই প্রধান উদ্দেশ্য।

দুর্বাসার অভিশাপে অর্থ, সম্পদ হারিয়ে শ্রীহীন হলেন দেবরাজ ইন্দ্র। শেষ পর্যন্ত অসুরদের কাছে স্বর্গরাজ্যও হারালেন। সেই রাজ্য পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে বিষ্ণুর পরামর্শে করা হয় সমুদ্রমন্থন। এই সমুদ্রমন্থন থেকেই জাত ধনতেরস উৎসব।

সমুদ্রমন্থনের ফলে একে একে চন্দ্র, ঐরাবত হাতি, উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়া, বিভিন্ন রত্ন, পারিজাত পুষ্পবৃক্ষ উঠে এল। পরে অমৃতের ভাণ্ড নিয়ে সমুদ্র থেকে উঠে এলেন দেববৈদ্য ধন্বন্তরি। মন্থনের একবারে শেষে সহস্র ফণার ছাতার মাথায় উঠে এলেন দেবী লক্ষ্মী। তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর রূপে পৃথিবী মোহিত হল। যেন পদ্মফুল দিয়ে গড়া লক্ষ্মীর দেহ আর তাঁর সমগ্র অঙ্গ যেন বিদ্যুতের মতো অজস্র রত্ন দিয়ে সজ্জিত। তাই বিশ্বাস, ধনতেরসের সন্ধেবেলায় বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে হয়। একে ‘যমদিয়া’ বলে। এ প্রসঙ্গে পুরাকালের এক গল্প এখানে বলা যাক।

রাজা হিমের ছেলের জন্মের সময় কোষ্ঠীতে লেখা হয়েছিল বিবাহের চার দিনের মাথায় সাপের কামড়ে পুত্রের মৃত্যু হবে। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও ষোলো বছর পার হওয়ার পরে এক বুদ্ধিমতী মেয়ের সঙ্গে রাজপুত্রের বিবাহ হয়। সব জেনে শুনে মেয়েটি বধূ হয়ে এসেছে। বিয়ের চার রাতের মাথায় নিজের যত সোনা-রত্ন ছিল সব তাদের রাজগৃহের দ্বারে স্তূপ করে রাখল। আর সারা প্রাসাদ প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করে রাখল। স্বামীকে না ঘুমোতে দিয়ে রাত জেগে গান গেয়ে চলল। ঠিক মাঝ রাতে যমরাজ সাপের বেশ ধরে প্রাসাদের কাছে এসে হাজির। প্রদীপের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল তাঁর। অনেক কষ্টে ধনসম্পদের ওপরে উঠতেই কানে গেল সেই গান। মোহিত হয়ে গেলেন সর্পবেশী যমরাজ। নিজের কর্তব্যে ভুলে এক সময় দেখলেন পুব আকাশ আলো দিচ্ছে। রাজপুত্রের প্রাণ না নিয়ে তাঁকে ফিরে যেতে হল। নিজের বুদ্ধির জোরে প্রাণ রক্ষা পেলেন।

এই পৌরাণিক কাহিনি মেনেই আজও ধনতেরসের রাতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও রাত্রি জাগরণ হয়ে চলেছে। সেই কারণে ধনতেরসের রাতটিকে যমোদ্দীপন বলা হয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here