সেই কালী মন্দির। নিজস্ব চিত্র
ইন্দ্রাণী সেন।

বাঁকুড়া: গ্রামের পথে চিঁড়ে বিক্রি করে ফেরার পথে একটি শ্যামাঙ্গী মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় সোনামুখীর তারিণী সূত্রধরের। সোনামুখী থেকে বড়জোড়ার নিরাশা গ্রাম, এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মাথায় করে চিঁড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় একটি খালের ধারে বিশ্রাম নিতেন ওই বৃদ্ধা। প্রতি দিনই লাল পাড় শাড়ি পরা ওই ছোট্ট শ্যামাঙ্গী মেয়ে তাঁর সঙ্গে সোনামুখী যাওয়ার জন্য বায়না করত। বৃদ্ধা প্রতি দিনই কিছু না কিছু বলে ওই ছোটো কন্যাশিশুটিকে বিরত করতেন। এক দিন সে জেদ ধরে বসল বৃদ্ধার সঙ্গে সোনামুখী যাবেই যাবে। তখন নিরুপায় তারিণী সূত্রধর তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। কিছু দূর আসার পর তাঁর কোলে চাপার বায়না ধরে ওই মেয়ে। মাথায় চিঁড়ে বিক্রি করে পাওয়া ধান আর কোলে ধানের ঝুড়ি থাকায় তাঁর অসহায়তার কথা বললে, ওই মেয়েটি মাথার ঝুড়িতে চাপার কথা বলে। নিরুপায় তারিণী সূত্রধর তাই করেন। পরে বাড়ি ফিরে ঝুড়ি নামিয়ে রাখেন। পরে দেখেন মেয়ের বদলে ওই জায়গাতেই দু’টি পাথর। ভয় পেয়ে তিনি সেই পাথর দু’টিকে তুলসীতলায় রেখে দেন। সে দিন রাতেই বৃদ্ধা মায়ের পুজোর স্বপ্নাদেশ পান। একই সঙ্গে সেই শ্যামাঙ্গী ছোট্ট মেয়েটি যে আদতে মা কালী, তা-ও জানতে পারেন। তাঁর ভার লাঘবের জন্য তিনি পাথরের রূপ ধারণ করেছেন, তা-ও জানান দেবী। স্বপ্নে পুজোর নির্দেশ পেয়ে পর দিন সকালে ওই বৃদ্ধা লালবাজার এলাকার মানুষকে সব কথা জানান।

আরও পড়ুন কলকাতার সবরীমালা! এই কালীপুজোয় প্রবেশাধিকার নেই মহিলাদের

সেই সময় ছোঁয়াছুঁয়ি আর জাতপাতের ঘটনা এতটাই তীব্র ছিল যে পুরোহিত পুজো করতে অস্বীকার করেন। ফলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তারিণী। পরে অবশ্য পুরোহিতও স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পুজো করতে রাজি হন। স্থানীয় জমিদারগিন্নী কাদম্বরী দেবী এক সিদ্ধপুরুষের স্বপ্নাদেশ পেয়ে মন্দির নির্মাণের জন্য এক খণ্ড জমি দেন। ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগের। আজও সেই গাছতলায় পুজিত হয় ওই দুটি পাথরের খণ্ড।

hatnagar kali
হট্‌নগর কালী। নিজস্ব চিত্র।

‘হট্‌নগর’ কালীর নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন লোককথা প্রচলিত। কেউ বলেন, হট্ নামে এক যোগী পুরুষ এই কালীর পুজো করতেন বলে এ রকম নামকরণ। আবার অনেকে বলেন, মা কালী হঠাৎ এসেছিলেন। তাই ‘হট্ নগর’ কালী নামকরণ হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা অঙ্কিত ঘর বলেন, “মা কালীর নির্দেশে যে গাছের নীচে পাথর দু’টি রাখা হয়েছিল সেই গাছ আজও বর্তমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাথরের রং পরিবর্তন হয়।”

বর্তমানে বর্ধমানের এক সমাজসেবী অজিত সিংহ নতুন মন্দির তৈরি করে দেন। এই মন্দিরের গঠনশৈলী অদ্ভুত। মন্দিরের সামনে রাখা রয়েছে তারিণী সূত্রধরের একটি মূর্তি। সেখানে দেখা যায়, মাথায় ধানের ঝুড়িতে চেপে মা আসছেন। অন্য দিকে সিদ্ধপুরুষ হট্ যোগীর মূর্তি। সবার উপরে শিব। এ ছাড়াও মূল মন্দিরের কুড়ি-পঁচিশ ফুট উপরে রয়েছে একটি পদ্মফুল। যা অনেক দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। বর্তমানে প্রাচীন পরম্পরা মেনে সূত্রধর পরিবারের সদস্য বিপত্তারণ সূত্রধরের ছেলে সুকুমার সূত্রধর যেমন মূর্তি তৈরি করেন, তেমনি এই পুজোর দায়িত্বে রয়েছেন ভক্তিভূষণ ভট্টাচার্য ও গোপাল ভট্টাচার্য । প্রাচীন সেই প্রথা মেনে আজও সূত্রধররাই কেবল ঘট আনার অধিকারী। এই ঘট সারা বছর মন্দিরে রেখে পুজো করা হয়। পরে বছর বাৎসরিক পুজোর সময় সেই ঘট বিসর্জন দিয়ে নতুন ঘট আনা হয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here