ইন্দ্রাণী সেন।

বাঁকুড়া: ইন্দাস। রাজা ইন্দ্রহাসের নাম অনুসারে নাম হয় ইন্দাস। দামোদর ও দ্বারকেশ্বর নদ দ্বারা পরিবেষ্টিত। বাঁকুড়া, বর্ধমান ও হুগলি জেলাকে সংযুক্ত করেছে ইন্দাস।

মা সারদা ও রামকৃষ্ণদেবের জন্মভূমি সংলগ্ন ইন্দাস থানার একেবারে পূর্বদিকে অবস্থিত দিঘলগ্রাম। গ্রামের মাটির চালায় গুরুমশাইয়ের কাছে টোলে পড়াশোনায় ব্যস্ত পড়ুযারা। কেউ গীতা, কেউ রামায়ণ আবার কেউ মহাভারতের পাঠ নিচ্ছে। দেখতে দেখতে বছর গড়ায়, টোলের পড়া শেষ করে পড়ুযারা কর্মজীবনে প্রবেশ করে। সাধ্যমতো গুরুদক্ষিণা দিয়ে একে একে বিদায় নেয় ছাত্ররা।

এদের মধ্যেই অন্যতম ছিলেন দ্বারকেশ্বর নদের তীরবর্তী গোঘাট থানার আসপুর গ্রামের মুখোপাধ্যায় পরিবারের এক ব্যক্তি, যিনি ইন্দাস থানার দিঘলগ্রামে ভট্টাচার্য বংশীয় টোলে শিক্ষা গ্রহণ করতে এসেছিলেন আজ থেকে প্রায় দু’-তিনশো বছর আগে।

আরও পড়ুন বৈষ্ণব আর শাক্তের বিরোধ মেটাতে শুরু শান্তিপুরের আগমেশ্বরী পূজার

পরে দিঘলগ্রামে কালী সাধনায় ত্রিমুণ্ডী আসনে সিদ্ধি লাভ করে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন ও নিজের বাড়িতে পঞ্চমুণ্ডীর আসনে সিদ্ধিলাভ করেন। দিঘলগ্রামে ত্রিমুণ্ডী আসনে পুজোর ভার দেন শিক্ষাগুরুকে। সেই সময় থেকেই বংশানুক্রমে দিঘলগ্রামের ভট্টাচার্য পরিবার এই পুজো করে আসছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই বর্তমান পরিস্থিতি বদলেছে। এখন পুজো দেখাশোনা করার জন্য তৈরি হয়েছে নির্দিষ্ট পুজো কমিটি।

স্থানীয় সূত্র অনুসারে, আনুমানিক দু’-তিনশো বছরের বেশি পুরনো এই পুজো। এই পুজোর নিয়মও ভিন্ন। গঙ্গাজলে দেবী অর্চনা হয় না। নিজের পুকুরের জল ও নিজস্ব ধ্যান ও পুজোর মন্ত্রে মা পূজিতা হন। পুজো ও বিসর্জন সম্পূর্ণ নিশব্দে হয়। মূর্তি তৈরিতে বিশেষ নিয়ম নীতি লক্ষণীয়।

দুর্গাপুজোর পরই শুরু হয় কালীপুজোর প্রস্তুতি। প্রথম থেকে এই মূর্তি তৈরি করে আসছেন আসপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবার। তাই সিদ্ধেশ্বরী মূর্তি তৈরির জন্য কাঠের অবয়ব আজও আসপুর গ্রামে পাঠানো হয়। মুখোপাধ্যায় বাড়িতে দু’টি মূর্তি তৈরি হয়। একটি নিজেদের পুজোর জন্য, অন্যটি দিঘলগ্রামে পুজোর জন্য। স্থানীয় তপনকুমার দে বলেন, “আগে পুজো সামগ্রী ওই পরিবার থেকেই আসত। বর্তমানে পুজো কমিটির তরফে সমস্ত কিছুর আয়োজন করা হয়। প্রচলিত পুজোর নিয়ম অনুসারে পুজোতে প্রথম সংকল্প ওই পরিবারের নামে করা হয়।”

আগে স্থানীয় জমিদারের সহায়তায় মাটির মন্দির তৈরি করেন ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যরা। মাটির মন্দির ভেঙে পড়ার পর স্থানীয় খড়শী গ্রামের অভয় সরকার ওই জায়গাতেই নতুন পাকা মন্দির তৈরি করে দেন।

আরও পড়ুন অপ্রতুল কলাগাছ, জলপাইগুড়িতে দীপাবলি উৎসব নিয়ে সংশয়

দ্বারকেশ্বরর তীরে মায়ের পুজোর পর বর্তমানে ভ্যানোতে করে দিঘলগ্রামে মায়ের মন্দিরে আনা হয়। সুদীর্ঘ ছয় কিলোমিটার রাস্তায় আমড়া, বাউড়ো, নেত্রখণ্ড, কেঁজরা গ্রামের মানুষ গ্রাম ষোলোআনা রাস্তাতেই মায়ের যাত্রাপথে পুজো দেন। ধুপ ধুনো বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে দেবীকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

স্থানীয় শিবপ্রসাদ চৌধুরী বলেন, “এই মা প্রথমে ছিলেন হুগলি জেলার আসপুর গ্রামের মুখোপাধ্যায় বাড়িতে। পরে দিঘলগ্রামের মা সিদ্ধেশ্বরী রূপে পূজিতা হন।” স্থানীয় মানুষের কাছে ‘সিধুমা’ বলেই পরিচিত। তিন-চারদিন ধরে মন্দির চত্বর সংলগ্ন এলাকায় মেলা বসে। যাত্রাপালা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন গ্রামের মানুষ। তার পর একটি শুভ দিন দেখে স্থানীয় পুকুরে মূর্তি বিসর্জন করা হয়।

1 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here