পশ্চিমবঙ্গের ৪টি জেলার বিখ্যাত কালীমন্দিরের ইতিহাস

0
bollakali
বোল্লা কালী

ওয়েবডেস্ক : শুধু কলকাতা নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গেই ছড়িয়ে রয়েছে কালী-মহিমা। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে সেই মহিমান্বিত কালী মন্দিরগুলি।

বোল্লা কালীমন্দির –

বোল্লা মা কালী দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার একটি বিখ্যাত কালী মন্দির। বালুরঘাট-মালদহ মহাসড়কের বালুরঘাট শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে বোল্লা গ্রামে অবস্থিত। ৪০০ বছর আগে এই এলাকার জমিদার ছিলেন বল্লভ চৌধুরী। তাঁর নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয়েছে বোল্লা। সে সময় এক মহিলা স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী একটি কালো পাথরখণ্ড কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেই পাথরখণ্ডটিকেই তিনি প্রথম মাতৃরূপে পুজো শুরু করেছিলেন। এর পর জমিদার মুরারীমোহন চৌধুরী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মামলায় জড়িয়ে যান। তার পর তিনি বোল্লা মায়ের কাছে মানত করে মামলায় জয় লাভ করেন। দেবী কালী তাঁকে উদ্ধারের জন্য এসেছিলেন এবং পরবর্তী দিনই জমিদার মুক্তি পেয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসাবে তিনি দেবী কালীর একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই বছর থেকে রাস পূর্ণিমার পরের শুক্রবার ঘটা করে পুজোর আয়োজন শুরু হয়।

সিঙ্গুরের ডাকাতকালী মন্দির –

সিঙ্গুরে ডাকাতকালীর মন্দির খুবই বিখ্যাত একটি মন্দির।  তবে এর প্রতিষ্ঠাকাল সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। সঙ্গে সঙ্গে কোন ডাকাত সর্দার এই মন্দির করেছিলেন, তা নিয়েও মতবিরোধ আছে। অনেকের মতে এই মন্দির ডাকাত সনাতন বাগদি, আবার কেউ বলেন গগন সর্দার, কারো মতে রঘু ডাকাত নির্মাণ করেছিলেন। এই মন্দির আটচালা। মন্দিরের দেওয়ালে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি আছে। বিষ্ণুর দশাবতারের মূর্তি ও পোড়ামাটির লতাপাতা। মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রায় নয় ফুট উঁচু বিগ্রহ অবস্থিত। এই মন্দিরের কালী ‘সিদ্ধেশ্বরী’ নামে বিখ্যাত। এই প্রাচীন কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে বহু গল্প ছড়িয়ে আছে। প্রথম দিকে ঘট পুজোই হতো, মন্দির ছিল না। সেই সময়ে এখানে গভীর জঙ্গল ছিল। অসুস্থ রামকৃষ্ণদেবকে দেখতে যাওয়ার পথে সারদা মা-কে এই স্থানেই দুই ডাকাত আটক করেছিল। তখনই স্বয়ং কালীমা দেখা দেন ও দুই ডাকাতকে নিবারণ করেন। কথিত আছে, এই অলৌকিক ঘটনায় ভীত হয়ে রঘু ও গগন ডাকাত এই স্থানে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ধমানের মহারাজা মা কালীর স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরে প্রতিমা ও মন্দির নির্মিত হয়। জনশ্রুতি আছে অতীতে এখানে নরবলি হতো।

সোনামুখী মাই-তো-কালী –

প্রাচীন শহর বাঁকুড়ার সোনামুখী। এখানে কালী পুজোর রমরমা। মাই-তো-কালী, রক্ষা কালী,ডাকাত কালী , ঘুঘু কালী, সার্ভিস কালী, জামাই কালী-সহ কত কী।  সব নামকরণের পেছনেই কোনো না কোনো ইতিহাস আছে। তেমনই মাই- তো – কালী নামের পেছনেও ইতিহাস আছে।

প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন এই পুজো। ১৭৪২ সালে মারাঠা সেনাপতি ভাস্করপণ্ডিত বর্গীদের একটি দল-সহ বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর থেকে সোনামুখীতে যান। লুঠপাট করার জন্য বাদ্যভাণ্ডসহ ‘হর হর বোম বোম’ শব্দ করতে থাকেন। সোনামুখীর রানিরবাজার এলাকায় মা কালীর মন্দিরের সামনে বর্গিদস্যু দল সমবেত হয় লুঠতরাজের জন্য। এই এলাকার চার দিক তখন গাছপালায় ভরা ছিল। তারই মধ্যে ছিল কালীর মন্দির। শোনা যায়, দিনের বেলাতেই অনেকে ভয়ে মন্দিরের সামনে আসতে সাহস করত না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধের মুখ। শুনশান চারপাশ। হঠাৎ বর্গিদস্যু দল বাজনা বাজাতে বাজাতে নাচতে শুরু করল। ঠিক তখনই এক বৃদ্ধ সাহস করে সন্ধ্যায় দেবীমন্দিরে আলো দেওয়ার জন্য উপস্থিত হন। একটি প্রদীপ নিয়ে মন্দিরে ঘটের সামনে রেখে বলিস্থানে হাড়িকাঠের সামনে প্রণাম করছিলেন তিনি। এমন সময় বর্গীদলের সর্দার একটি খাঁড়া উঠিয়ে প্রণামরত বৃদ্ধকে বলি দিতে উদ্যত হয়। কিন্তু জানা যায়, কোনও ভাবেই বৃদ্ধকে বলি দিতে পারেনি বর্গির দল। কথিত আছে খাঁড়া নাকি নামানো যায়নি। উপরন্তু বর্গিদের সর্দার অন্ধও হয়ে যান। পরে ওই বৃদ্ধের চেষ্টাতেই সর্দার দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান। এই সময় বর্গিদল বলে, তারা আর লুঠপাট করবে না। এর পরেই বাজনা বাজাতে বাজাতে ” মাঈ-ত কালী হ্যায়, মাঈ-ত কালী হ্যায়” বলতে বলতে সোনামুখী ছেড়ে চলে যায় বর্গিদল। তখন থেকেই এই কালীর নাম হয় ” মাই- তো- কালী “।

মুর্শিদাবাদের কিরীটেশ্বরী মন্দির –

কিরীটেশ্বরী মন্দির হল হিন্দুধর্মের শাক্তমতে পবিত্র তীর্থ। এটি একটি শক্তিপীঠ। এটি অবস্থিত মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগ এলাকায় অবস্থিত একটি গ্রামে। যদিও বর্তমান মন্দিরটি বেশি পুরানো নয়। তান্ত্রিক মতে, এখানে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর ‘কিরীট’ অর্থাৎ মুকুটের কণা পতিত হয়েছিল। এটি যেহেতু  দেবীর কোনও অঙ্গ নয়, তাই এই স্থানকে অনেক তন্ত্রবিদ্ ‘পূর্ণ পীঠস্থান’ না বলে ‘উপপীঠ’ বলে থাকেন। এই পীঠে দেবী ‘বিমলা’ এবং তাঁর ভৈরব ‘সম্বর্ত’ নামে পূজিত হন। পাঠান-মুঘল শাসনকালেও এই স্থানের খ্যাতি ছিল। ‘রিয়াজুস সালতিন’ গ্রন্থে ও রেনেলের কাশিমবাজার দ্বীপের মানচিত্রে কিরীটকোণাকে ‘তীরতকোণা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মন্দিরে দেবীর কোনও প্রতিমূর্তি নেই, একটি উঁচু পাথরের উপর বেদি আছে; এই বেদির উপর আরেকটি ছোট বেদি আছে যা দেবীর কিরীট বলে পুজো করা হয়। কথিত আছে, মুর্শিদাবাদের নবাব মিরজাফর আলি খান কুষ্ঠরোগগ্রস্ত হওয়ার পর শেষ জীবনে হিন্দু দেওয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী কিরীটেশ্বরী দেবীর চরণামৃত পান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। রামকৃষ্ণদেবও এই মন্দিরে যেতেন।   

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.