idol making going on in kheput
payel samanta
পায়েল সামন্ত

জোব চার্ণককে কলকাতা-সহ তিনটি গ্রাম ইজারা দেওয়ার পাশাপাশি বড়িশার জমিদার সাবর্ণদের কালীঘাটের কালী প্রতিষ্ঠার কথা আজ ইতিহাস। কলকাতার সাবেক জমিদার সাবর্ণদের দুর্গাপুজোতে প্রচারের আলো পড়ে প্রতি বছরই। কিন্তু অভিমানে মুখ ভার করেন এ বাড়ির রূপে আলো করা কালো মেয়েটি। তাঁকে খুঁজতেই খবর অনলাইন পৌঁছে গিয়েছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুর থানার অন্তর্গত খেপুত গ্রামে।

পঞ্চাননতলা থেকে খেপুত গ্রামের খেপুতেশ্বরী দেবীর মন্দির যাওয়ার আগেই সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বাড়ি পড়ে। এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে করতে মনে হল, এত দূরে সাবর্ণ জমিদাররা কী ভাবে এলেন? কী ভাবেই বা শুরু হল শতাব্দী প্রাচীন কালীপুজো? সাবর্ণদের আটচালাতে বসে এই বাড়ির বর্ষীয়ান সদস্য ভবানী রায়চৌধুরী শোনালেন সেই ঐতিহাসিক গল্প।

১৭৭২ সালে রামদুলাল রায়চৌধুরী মেদিনীপুর জেলার চেতুয়া পরগনায় জমিদারি লাভ করেছিলেন। বড়িশা এবং কালীঘাটে তাঁর যাতায়াত ছিল (তখন অবশ্য পরিবহনের জন্য রূপনারায়ণের যথেষ্ট নামডাক ছিল)। দুর্গাপুজোর সময় বড়িশাবাড়িতে উৎসব দেখে খেপুতে এমন ঘটা করে পুজো করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তবে দুর্গা নন, কালীঘাটের বৈষ্ণবীরূপী কালীই হয়ে উঠলেন খেপুত উত্তরবাড়ের সাবর্ণদের আরাধ্যা। সাবর্ণ জমিদারদের দেখাদেখি সমগ্র খেপুত গ্রাম পঞ্চায়েতেরই পরম আরাধ্যা হয়ে উঠলেন কালী।

সাবেকি নিয়ম মেনে আজও সাবর্ণদের বাড়িতে জলঘড়ি মেপে ঘট ডোবানোর সময় নির্ধারণ হয়। এমনকি কার্তিক মাসের শ্যামা লক্ষ্মীপুজোর রীতি মেনে অলক্ষ্মী বিদায়ের পালাও চলে ঘটা করে। আজও কালীঘাটের পুজোর নিয়ম অনুসরণ করে এই লক্ষ্মীপুজোয় কাঁসর ঘন্টা বাজানো চলে না এবং লক্ষ্মীর জন্য নিরামিষ ভোগ আর কালীর জন্য ছাগবলির ব্যবস্থা করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সাবর্ণদের মন্দিরে একই সঙ্গে বিষ্ণু, শিব এবং শক্তির আরাধনা চলে। ছাগবলির পাশাপাশি অতীতে মহিষ ও মেষ বলিরও রেওয়াজ ছিল বলে জানা যায়। চক্ষুদানের সময় এখনও চালকুমড়ো বলির রেওয়াজ আছে।

bhabani roychowdhury
ভবানী রায়চৌধুরী।

আঞ্চলিক গবেষক ভবানী রায়চৌধুরীই জানালেন, “শ্যামাপুজার দিন শ্রীরঘুনাথের অন্নভোগ অন্যান্য দিনের মতো মধ্যাহ্নে উৎসর্গ করা হয় না। কালীঘাটে বাসুদেব যেমন বৈষ্ণবরূপিণী শ্যামাকালীর জন্য অপেক্ষায় থাকেন, সেই রকম রঘুনাথ জীউও সারা দিন অপেক্ষা করে রাত্রে শ্যামাকালীর ভোগ উৎসর্গ করার আগে তাঁর নিরামিষ ভোগ দর্শন করেন। তার পর শিব ও শ্যামাকালীর ভোগ দর্শন।”

প্রাচীন রীতি অনুযায়ী বংশানুক্রমিকভাবে ছুতোর, নাপিত, কামার, গয়লা, মালাকার আজও সাবর্ণদের পুজোয় অংশগ্রহণ করে থাকেন। সেই কবেকার ১০০ বিঘে জমির মালিক সাবর্ণরা এঁদের বসতের ব্যবস্থা করেছিলেন নিজেদের বাড়ির চৌহদ্দিতে। সেই ধারা বজায় রেখেই এই বংশের কালীপুজোতে আরও এঁদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চলে। ছুতোর (কুমোর) আজও সাবর্ণদের ঠাকুর তৈরি করে অন্য কালীঠাকুর তৈরিতে হাত দেন। বিজয়া দশমীতেই বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠর হাত ধরে কালীঠাকুরের পায়ে মাটি দেওয়া হয়। ডাকের গয়নায় সজ্জিত এই বৈষ্ণবী কালী আজও এলাকার মানুষের কাছে জনপ্রিয় অন্য কারণেও। পাগলা কুকুর বা শেয়াল কামড়ালে এখানে চলে মানত করার পদ্ধতি।

sabarna residence at kheput
খেপুত গ্রামে সাবর্নদের বাড়ি।

খেপুত উত্তরবাড় ও দক্ষিণবাড় গ্রামে রয়েছে অন্যান্য প্রাচীন পুজোও। ছোটো রায়বাড়ি, চট্টোপাধ্যায়, নাগবাড়ির কালীপুজোও বেশ পুরোনো। গ্রামের দেবী খেপুতেশ্বরীর কাছে কালীপুজোর দিন জমায়েত হয় সমগ্র গ্রামের কালীপুজোর ডালা। খেপুতেশ্বরীকে পুজো জানিয়েই শুরু হয় গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ির পুজো। সাবর্ণরা অবশ্য তাঁদের ভিটে থেকেই দেবী খেপুতেশ্বরীকে পুজো দেয়।

সব মিলিয়ে ব্যাপারটা বেশ আকর্ষণীয় যে তাতে সন্দেহ নেই। কলকাতার জাঁকজমক থেকে এত দূরে দু’দিন কাটিয়ে গেলে কালীপুজো মন্দ কাটবে না! সাবর্ণদের চারশো বছরের পুরোনো এই কালীপুজোর ব্যয়ভার বহন করেন মূলত ‘সাবর্ণ রায়চৌধুরী গোষ্ঠী সংসদ’। পারিবারিক চাঁদার পাশাপাশি দেবোত্তর সম্পত্তি থেকেও চলে পুজোর খরচ খরচা। সংসদের যুগ্ম সেক্রেটারি কমলেশ রায়চৌধুরী জানালেন, “এ বাড়ির অধীনস্থ ইশারা পুকুরের মাছ দিয়েই দেবীকে ভোগ দেওয়া হয়। পুজোর তহবিলের পাশাপাশি অনুদানও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। মানতের জন্য প্রচুর সংখ্যায় বলিও পড়ে। জমিদারীর সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত বেশ জমজমাট। ইদানীং অবশ্য সে ধারা বয়ে চললেও কমে গিয়েছে তার ব্যাপ্তি। তবে  ভোগ রান্না থেকে শুরু করে ঠাকুরের সাজ পরানো, সব কিছুই বাড়ির সদস্যরা আয়োজন করেন বলে এর আনন্দটাই আলাদা।”

এই বাড়ির সদস্য শৈলজানন্দ রায়চৌধুরী খবর অনলাইনকে জানালেন, “জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এই বাড়ির থেকেই দারগ্রহণ করেছিলেন। এই গ্রামেই কমিউনিস্ট নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায়ের পৈতৃক ভিটে। তবুও প্রচারের আলো থেকে এই গ্রাম অনেক দূরে। সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পুজো উপলক্ষে গ্রামের পাশাপাশি শহরের লোকজনও ইদানীং আসছেন। তবে দরকার আরও প্রচার এবং ঐতিহ্য সচেতনতা।” দেবীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলতে গিয়ে তিনি জানালেন, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে দেবীর গায়ের রঙ করা হয়।

kalibari of sabarna
সাবর্নদের কালীবাড়ি।

খেপুত গ্রামপঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান তপন দত্ত জানান, “এখানে গোটা পঞ্চাশেক পুজো হয়। প্রায় প্রতি বাড়িতেই। তার মধ্যে অবশ্যই সাবর্ণদের পুজো আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। ভবিষ্যতে এই পুজোর প্রচার যাতে আরও বেশি হয়, সে জন্য কিছু করা দরকার। আমাদেরই প্রচার করতে হবে।”

প্রচারকে ফাঁকি দিয়েও বেশ বহাল তবিয়তে রয়েছে এখানকার কালী-সংস্কৃতি। রয়েছে নানা মিথও। সব মিলিয়ে অন্তরালে এ এক অন্যরকম উদ্‌যাপন।

ছবি- সন্নিধ রায়চৌধুরী 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here