agameshwari kalipuja
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

এ-ও এক সহিষ্ণুতার কাহিনি। বৈষ্ণব আর শাক্তের বিরোধ মেটানোর এক ঐকান্তিক প্রয়াস জড়িয়ে আছে অদ্বৈতভূমির বুকে চার শতক আগে শুরু হওয়া কালীপুজোর সঙ্গে। এক দিকে বৈষ্ণব সাধনা, অন্য দিকে তন্ত্রসাধনা – এই দুই বিপরীতধর্মী সাধনাই কার্যত এখানে মিলিত হয়েছে। এই ইতিহাসকে সঙ্গী করেই শান্তিপুরের আগমেশ্বরী কালীপুজো আজও মানুষের কাছে এক অমোঘ আকর্ষণ, যার টানে ছুটে আসেন আট থেকে আশি।

আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে সার্বভৌম আগমবাগীশের হাত ধরে শুরু হয় শান্তিপুরের আগমেশ্বরী কালীপুজার। আগমবাগীশের আরাধ্যা বলেই দেবী এখানে আগমেশ্বরী নামেই পরিচিত বলে দাবি। নানা বারোয়ারির জাঁকজমকের মাঝেও মানুষ এই পুজার ঐতিহ্যের টানে ছুটে আসেন। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই সময়কার বৈষ্ণব ও শাক্তদের বিরোধ।

পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের প্রপৌত্র ছিলেন সার্বভৌম আগমবাগীশ। তিনি তন্ত্রসাধনা করতেন বলে কথিত আছে। সেই সময়ে শাক্ত এবং বৈষ্ণবদের মধ্যে বিরোধ চলছিল বলে কথিত। সেই বিরোধ মেটাতে শান্তিপুরের অদ্বৈতাচার্যের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী নিজ কন্যার বিবাহ দেন নবদ্বীপের সার্বভৌম আগমবাগীশের সঙ্গে। তাঁর আশা ছিল এর ফলে বৈষ্ণব-শাক্তে বিরোধ মিটবে, যদিও এর পরও সেই বিরোধ মেটেনি। বরং তা আরো জটিল আকার নেয়। ফলে এক সময় বাধ্য হয়েই মথুরেশ গোস্বামী তাঁর মেয়ে ও জামাইকে নবদ্বীপ থেকে নিয়ে আসেন শান্তিপুরে।

শান্তিপুরের গোস্বামীরা যে হেতু প্রত্যক্ষভাবে শক্তির উপাসনা করেন না তাই মথুরেশ গোস্বামী তাঁর বাড়ির পুর্ব দিকে একটি পঞ্চমুণ্ডির আসন স্থাপন করেন জামাতার জন্য। আর এ ভাবেই বৈষ্ণব সাধনার প্রাণপুরুষ অদ্বৈতাচার্যের বংশের সঙ্গে সংযোগ হয় সেই সময়কার তন্ত্রসাধনার প্রাণপুরুষ সার্বভৌম আগমবাগীশের। আর তখন থেকেই দুই বিপরীতধর্মী সাধনার এক সঙ্গে পথ চলা শুরু।

crowd at agameshwari puja
আগমেশ্বরীর পুজোয় ভিড়।

চারশো বছর আগের সেই ঘটনার সুত্র ধরে আজও সেই পথ চলা ধারাবাহিকতায় প্রবহমান। শান্তিপুরের মতো বৈষ্ণবধামেও তাই একই সঙ্গে এগিয়ে যায় আগমবাগীশের শক্তি-আরাধনা। বড়ো গোস্বামীবাড়ির অদূরেই স্থাপন করে দেওয়া পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন সার্বভৌম আগমবাগীশ। কথিত আছে, এক রাতে তিনি স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, সকালে উঠে তিনি যাঁকে দেখবেন তিনিই তাঁর আরাধ্যা দেবী। পরের দিন ভোরে আগমবাগীশ ঘুম থেকে উঠে একটি কৃষ্ণবর্ণের মেয়েকে ঘুঁটে দিতে দেখেন। এর পর স্বপ্নাদেশের কথা মাথায় রেখে গঙ্গামাটি এনে সেই মেয়ের আদলে মূর্তি তৈরি করেন। মূর্তি তৈরির শেষে আগমবাগীশ সেই মূর্তিই পুজো করেন এবং পুজো শেষে সেই রাতেই বিসর্জন দেন। সেই প্রথা মেনে আজও পুজোর দিন ভোর থেকে এখানে প্রতিমা তৈরি হয়।

মথুরেশ গোস্বামীর উত্তরপুরুষ শান্তিপুরের বড়ো গোস্বামীপরিবারই এই পুজো পরিচালনা করেন। তবে পুজোর উপদেষ্টামণ্ডলীতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তারা রয়েছেন। শান্তিপুরের বড়ো গোস্বামীপরিবারের সদস্য সত্যনারায়ণ গোস্বামী বলেন, “সেই সময়ে বৈষ্ণব এবং শাক্তদের বিরোধ মেটানোর উদ্দেশ্য নিয়ে মথুরেশ গোস্বামী নিজের মেয়ের বিবাহ দেন সার্বভৌম আগমবাগীশের সঙ্গে। যদিও এতে সেই বিরোধ মেটেনি। পরে মথুরেশ গোস্বামী মেয়ে এবং জামাইকে নিয়ে আসেন শান্তিপুরে। সেখানেই সার্বভৌম আগমবাগীশের হাত ধরে এখানে কালীপুজোর সুচনা। যা আগমেশ্বরী নামে পরিচিত।”

তবে শুধু এই ইতিহাসই নয় এই পুজোর কিছু আচারও তাকে স্বকীয়তা দান করেছে। এই কালীপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই পুজায় সুরা ব্যবহার করা হয় না। তার পরিবর্তে কাঁসার পাত্রে নারকেল জল ব্যবহৃত হয়। আগমেশ্বরী কালীপুজোয় বলিপ্রথা নেই। এক সময় প্রচুর মশাল জ্বালিয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা হত। প্রচুর মশাল সহকারে সেই সুদৃশ্য শোভাযাত্রা মানুষের কাছে ছিল এক অন্যতম আকর্ষণ। তবে বর্তমানে তা বন্ধ। কয়েক বছর আগে প্রশাসনের অনুরোধক্রমে তা বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিকী হিসাবে দু’টি মশাল জ্বালানো হয় শোভাযাত্রা শুরুর আগে।

বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরি করে আসছেন সুধীর পাল। চাঁদা তোলার প্রথা নেই এই পুজোর। দুরদুরান্ত থেকে কয়েক হাজার মানুষ এই সময়ে ভিড় করেন এখানে। প্রত্যেকে এখান থেকেই ভোগ নিয়ে যান। আগমেশ্বরীপুজোর ভোগ রান্নার কাজটিও দেখার মতো। বিপুল পরিমাণ মানুষের জন্য ভোগ রান্না করা হয়। তার আয়োজনও হয় বিপুল। প্রায় ৩০ কেজি গোবিন্দভোগ চাল, ১ মণ কাজু, ৩৫ কেজি কিসমিস, প্রায় ১ কুইন্টাল ঘি দিয়ে তৈরি হয় এখানকার ভোগের পোলাও।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here