চিনে নিন পশ্চিমবঙ্গের তিন সুপ্রসিদ্ধ সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির

0

শুভদীপ রায় চৌধুরী

কালীপুজোর প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন মন্দিরে দীপান্বিতা অমাবস্যার দিন ভক্তদের ভিড় তেমন হবে না হয়তো, কিন্তু বিধি মেনে চলবে পুজো, দর্শনও হবে নানা বিধিনিষেধ মেনে। দীপান্বিতার প্রাক-পর্বে এই বঙ্গের তিন সুপ্রসিদ্ধ সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক।

শান্তিপুরের সিদ্ধেশ্বরী

শান্তিপুর বৈষ্ণব ও শাক্তদের মেলবন্ধনের পীঠস্থান। বহু প্রাচীন বিগ্রহ ও মন্দির রয়েছে এই শান্তিপুরে। এখানকার সব থেকে উল্লেখযোগ্য দেবী হলেন তন্ত্রসিদ্ধ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের আগমেশ্বরী, যাঁর পুজো দেখতে দূর দূর থেকে ছুটে আসে ভক্তকুল। তেমনই শান্তিপুরের প্রাচীন সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরও এক উল্লেখযোগ্য স্থান।

শান্তিপুরের সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের বয়স ৪০০ বছরের বেশি, প্রতিষ্ঠাকাল ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দ। কৃষ্ণনগরের তৎকালীন রাজা ভবানন্দ মজুমদার (বিখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঠাকুরদাদা) মন্দির প্রতিষ্ঠা করে এর দায়িত্ব তুলে দেন পার্বতীচরণ মুখোপাধ্যায়, মতান্তরে ফকিরচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের হাতে। এই মুখোপাধ্যায়দের আদি পদবি ওঝা, বাংলায় রামায়ণ রচয়িতা কৃত্তিবাস ওঝার বংশধর।

সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের সামনে পরবর্তী কালে নাটমন্দির তৈরি করা হয়। তৈরি করেছিলেন শান্তিপুরের সরকার পরিবার। আগে সিদ্ধেশ্বরী কালীমূর্তি ছিল মাটির, পরবর্তী কালে (১৩৮৭ বঙ্গাব্দে) তা হয় পাথরের। কাশী থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এই মূর্তি।  

শান্তিপুরের সিদ্ধেশ্বরী।

সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে মূল বার্ষিক পূজা হয় দীপান্বিতায়। ওই দিন এখানে পুজো শুরু হওয়ার পর শান্তিপুরের অন্যান্য কালীপুজো শুরু হয়। দীপান্বিতার রাতে  পুজো শুরু হয় রাত ১১.৪০ মিনিটে, শেষ হয় ভোর ৪টেয়। অতীতে বলিদানপ্রথা থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ। ৫০ কেজি বা তারও বেশি চালের ভোগ নিবেদন করা হয় দেবী সিদ্ধেশ্বরীকে। মাকে পোলাও, খিচুড়ি, সাদা ভাত, পায়েস, লুচি, সুজি, নানা রকমের ভাজা, তরকারি, মাছ, চাটনি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। দীপাবলিতে হোমও হয়ে থাকে। সেই দিন রাত্রে মাকে রাজবেশে সাজানো হয়। পরের দিন সকালে ভোগ বিতরণ করা হয় এবং এক হাজার ভক্ত মায়ের প্রসাদ পান। ঐতিহ্য ও আভিজাত্য আজও অটুট শান্তিপুরের সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির।

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের বাৎসরিক পূজা হয় রাখিপূর্ণিমার দিন।

একাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ১০৮২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বেদগর্ভের বংশধরগণ বর্ধমান জেলার কাটোয়া থানার প্রাচীন জনপদ আমাটিয়া বা আমাথিতে বসবাস শুরু করেন। এই বংশের নবম পুরুষ শৌরীই প্রথম আমাথিতে আসেন।

এক সময়ে বর্ধমানের আমাটিয়ার বাস ত্যাগ করে সাবর্ণ গোত্রীয় বংশধরগণ অধুনা হুগলি জেলার ত্রিবেণীর কাছে ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে গোহট্ট (বর্তমানে গোপালপুর) গ্রামে চলে আসেন। সাবর্ণ গোত্রীয় পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় সম্রাট হুমায়ুনের আমলে বঙ্গের এই অঞ্চলে মোঘল সেনাপতি ছিলেন। সম্রাট হুমায়ুন তাঁকে ‘সখত্ খাঁ’ বা ‘শক্তি খান’ উপাধি দেন এবং ভাগীরথীর পূর্ব তীরে ৪৫টি গ্রাম বিশিষ্ট হাভেলিশহর পরগণার জায়গির দেন। পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় ‘পাঁচুশক্তি খান’ নামে পরিচিত হন।  

সেনাবাহিনীর কাজ থেকে অবসরগ্রহণের পর পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় হাভেলিশহর পরগণায় বসবাস শুরু করে নতুন সমাজ গড়ে তুললেন। পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুর থেকে বৈদ্যদের এনে হাভেলিশহরে বসতি তৈরি করে দিলেন। হাভেলিশহরে প্রচুর চতুষ্পাঠী ছিল। আর সেই সব টোলে ছিল বহু কমবয়সি ছাত্র, দেখে মনে হত হাভেলিশহরে যেন কুমারদের হাট বসেছে। এই ভাবেই হাভেলিশহরের নাম হল কুমারহট্ট। আর সেই থেকে এই অঞ্চল পরিচিত হয়ে উঠল কুমারহট্ট হাভেলিশহর বা কুমারহট্ট হালিশহর নামে।

সাবর্ণ চৌধুরীদের ২১তম পুরুষ জীয়া গঙ্গোপাধ্যায় ১৫৩৫ থেকে ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো এক বছরে গোহট্ট-গোপালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী কালে শিক্ষালাভের জন্য তিনি হালিশহরে এসেছিলেন। এই জীয়া গঙ্গোপাধ্যায়ই পরে কামদেব ব্রহ্মচারী নামে প্রসিদ্ধ হন। পণ্ডিত জীয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র হলেন লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি ১৬০৮ সালে মানসিংহের কাছে থেকে ৮টি পরগণার বিশাল জায়গির পান এবং পাশাপাশি পান রায়, চৌধুরী উপাধিও। রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরীর জ্যেষ্ঠপুত্র রামকান্ত রায় চৌধুরী কুমারহট্ট হালিশহরে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র জগদীশ রায় চৌধুরী (১৬২০-১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ) ধার্মিক পুরুষ ছিলেন। জগদীশের জ্যেষ্ঠপুত্র তথা ২৫তম বংশপুরুষ বিদ্যাধর রায় চৌধুরী (১৬৪০-১৭২০ খ্রিস্টাব্দ) হালিশহরে বহু কর্মনিদর্শন রেখে গিয়েছেন।

কথিত আছে, বিদ্যাধর রায় চৌধুরী সকালে গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে একটি কষ্টিপাথর পেয়েছিলেন। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এক অন্ধ ভাস্করকে দিয়ে কষ্টিপাথর থেকে নির্মাণ করিয়ে ছিলেন কালী, শিব এবং শ্যামরায়। সেই মূর্তিত্রয় হালিশহরেই প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাজারপাড়ার গঙ্গাতীরে কালিকা, চৌধুরীপাড়ায় শ্যামরায় এবং শিবের গলিতে বুড়োশিব প্রতিষ্ঠিত হন। কালিকাদেবীর নামানুসারে বাজারপাড়া পরিচিত হয় কালিকাতলা হিসাবে।

ইংরেজ ও পর্তুগিজদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধে কালিকাতলার মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে যায়, যদিও তার চিহ্ন রয়েছে আজও। পরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে সাবর্ণ চৌধুরীদের আরও এক অধস্তন পুরুষ যোগেশচন্দ্র রায় চৌধুরী কালিকাদেবীর মূর্তিটিকে ‘দেবী সিদ্ধেশ্বরী’ নাম দিয়ে বলদেঘাটায় স্থানান্তরিত করেন। একটি দালানঘরে ওই মূর্তি স্থাপন করা হয় (আনুমানিক ১৮৫০-৫৫ খ্রিষ্টাব্দ)। পরবর্তী কালে ১৩২৩ বঙ্গাব্দে যোগেশচন্দ্রের সহধর্মিণী বসন্তকুমারী দেবী সিদ্ধেশ্বরী মন্দির ও তার সামনের নাটমন্দির সংস্কার করেন। বর্তমানে যে মন্দিরটি রয়েছে তা একেবারেই নতুন। এই মন্দিরের দ্বার খোলে ১৯৯৮ সালের ৮ আগস্ট। মন্দিরের সামনে দক্ষিণ দিকে নাটমন্দির।

পরবর্তীকালে বলদেঘাটার চট্টোপাধ্যায় পরিবারকে সাবর্ণরা দেবোত্তর সম্পত্তি দানপত্র করেছিলেন দেবীর সেবার জন্য এবং সব কিছু ব্যয়ভার বহনের জন্য। দেখভাল করার জন্য বর্তমানে কমিটি তৈরি হয়েছে। ১৯৬৪ সালে মায়ের মূর্তিটি চুরি হয়ে যায় এবং পায়ের পাতাটি ভেঙে যায়। এরপর ওই ভাঙা পায়ের নিত্যসেবা হয় এখনও। এর পর ১৯৯৮ সালে মায়ের বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।

মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে উন্নতমানের অমূল্য কষ্টিপাথরে তৈরি ছ’ ফুট উচ্চতার চতুর্ভূজা সিদ্ধেশ্বরীমাতার অপূর্ব বিগ্রহ। শ্বেতপাথরের শিবের ওপর মা দণ্ডায়মান। হাতে খড়গ নিয়ে নৃমুণ্ডমালিনী মা বরাভয় আর অভয়দান করছেন।

হালিশহরের সিদ্ধেশ্বরী

রাখিপূর্ণিমার দিন এই মন্দিরে বাৎসরিক উৎসব হয়। বাৎসরিক উৎসবে সকালে থেকে মায়ের বিশেষ পূজা হয়। বেনারসী শাড়ি এবং বিভিন্ন গহনা দিয়েই মাকে সাজানো হয়, সঙ্গে থাকে ফুলের সাজ (গোলাপের মালা, পদ্মের মালা ইত্যাদি)। এইভাবে আজও প্রাচীন মন্দিরে মা সিদ্ধেশ্বরীর নিত্যসেবা হয়, এবং হালিশহরের ঐতিহ্যপূর্ণ মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম এই সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির।

ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি

বহু বছর ধরেই পুজো হয়ে আসছে এই কালীবাড়িতে, পুজো হয় নিষ্ঠার সঙ্গে। ৩১৭ বছরেরও প্রাচীন এই মন্দির। আজও সেই প্রাচীন রীতিনীতি মেনেই পুজো হয় ঠনঠনিয়াতে। সকালবেলায় মায়ের মঙ্গলারতির মাধ্যমে পুজো শুরু হয়। তার পর মায়ের পুজো হয় নৈবেদ্য সহকারে। দুপুরবেলা অন্নভোগ দেওয়া হয় মাছ সহযোগে। সন্ধ্যায় সন্ধ্যারতি।

এই ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ফলহারিণী কালীপুজো ও কার্তিক মাসের অমাবস্যার কালীপুজো, এই দুই দিন রাত্রে মায়ের নিরামিষ ভোগ হয়। নিরামিষ ভোগের মধ্যে থাকে লুচি, কচুরি, পাঁচ রকমের ভাজা, ছানার তরকারি, পনিরের তরকারি, ধোঁকার তরকারি, মিষ্টান্ন ইত্যাদি। দীপাবলির অমাবস্যা তিথিতে রাতের বিশেষ পূজায় ফল, নতুন বাসন, কাপড়, সাজসজ্জা, সমস্ত কিছুই নিবেদন করা হয়। ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে অমাবস্যার পুজোয় দুটি নৈবেদ্য নিবেদন হয় যা সেই প্রাচীন কাল থেকেই হয়ে আসছে – একটি মায়ের নৈবেদ্য ও একটি অমাবস্যার নৈবেদ্য।

ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির দেবী মৃন্ময়ী। প্রত্যেক বছর পুজোর আগে মায়ের অঙ্গরাগ করা হয়। সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে আসতেন, পুজো করতেন। শুধুমাত্র রামকৃষ্ণদেবই নন, তাঁর পরিবারের বহু সদস্যই আসতেন মায়ের কাছে। এই ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শঙ্কর ঘোষ মহাশয় (১৭০৬ সাল), কিন্তু মৃন্ময়ীকে প্রতিষ্ঠা করেন উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী ১৭০৩ সালে। তখন এই ঠনঠনিয়া ছিল সুতানুটি মহাশ্মশান। সেই সময় উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী মায়ের যে মৃন্ময়ী প্রতিমা, যে ঘট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই মূর্তি ও দেবীঘট আজও বর্তমান ঠনঠনিয়াতে।

দেবীর আদেশে উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী মায়ের মন্দির ও সেবাকাজ দিয়ে গিয়েছিলেন শঙ্কর ঘোষ মহাশয়কে। সেই থেকে এই পরিবার মায়ের সেবাকাজ করে আসছেন বংশপরম্পরায়। বহু ভক্তের সমাগম হয় কালীপুজোর দিন।

কলকাতার প্রাচীন কালীমন্দিরের মধ্যে এই মন্দির অন্যতম। কালীপুজোর দিন এই মন্দিরে ষোড়শোপচারে দেবীর পুজো ও আরতি করা হয়। বলিদান হয়, ভোগ নিবেদন করা হয় প্রাচীন রীতি মেনেই। কালীপুজোর পরের দিন মায়ের মন্দির থেকে দেবীর ভোগপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। মহাসমারোহে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দেবী পূজিতা হয়ে আসছেন ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

মুর্শিদাবাদ ও বীরভুমে রাজা রামজীবন রায়ের উত্তরপুরুষদের এখন ১৯টি কালীপুজো

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন