দুর্গাপুজোয় দেবীর চক্ষুদানের সময় প্রতীকী বলিদান হয় চুঁচুড়ার মণ্ডল পরিবারে

0

শুভদীপ রায় চৌধুরী

কলকাতার বাইরেও এই বঙ্গে এমন বহু বনেদি পরিবার রয়েছে যাদের বাড়িতে বহু বছর ধরে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। তেমনই এক বনেদিবাড়ি হল চুঁচুড়ার মণ্ডল পরিবার। এই পরিবারের দুর্গাপুজো এ বছর ১৮০ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে।

মণ্ডল পরিবারের বর্তমান সদস্য কৌশিক দেবমণ্ডল জানালেন, এই বংশের পূর্বপুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল বঙ্গের সাতগাছিয়া অঞ্চলে আনুমানিক ১৭৭০ সালে। তখন এই পরিবারের পদবি ছিল ‘দে’ এবং তাদের পূর্বপুরুষ তুলোর ব্যবসা করতেন। তখন থেকে এই ‘দে’ পদবিটি অপভ্রংশ হয়ে ‘দেব’-এ রূপান্তরিত হয়। তার পর এই পরিবারের সদস্যরা ওড়িশার বালেশ্বর বা বালাসোর অঞ্চলে চলে আসেন ও নুনের ব্যবসায় নিয়োজিত হন। এই বালেশ্বর অঞ্চলের জমিদারি তাঁরা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে এবং পেয়েছিলেন ‘মোড়ল’ উপাধি। সেই ‘মোড়ল’ই পরবর্তী কালে ‘মণ্ডল’-এ রূপান্তরিত হয়। ওড়িশার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জমিদারি ছিল দেবমণ্ডল পরিবারের।

আরও পড়ুন: আজও ভিয়েন বসিয়ে হরেক রকম মিষ্টি তৈরি হয় চুঁচড়ার আঢ্যবাড়ির দুর্গাপুজোয়

কৌশিকবাবু আরও জানালেন, বেশ কিছু বছর ওড়িশায় অতিবাহিত করার পর এই বংশের পূর্বপুরুষরা চলে আসেন চুঁচুড়ায় আনুমানিক ১৮৩০ সাল নাগাদ। তখন চুঁচুড়ায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ছিল এবং চন্দননগরে ছিল ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সেই সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ডাচ কোম্পানির এক বিবাদ চলায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চুঁচুড়া অঞ্চল ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চুঁচুড়ায় থাকাকালীন ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি ভিলা তৈরি করে, বর্তমানে যার সামান্য কিছু ধ্বংসাবশেষ লক্ষ করা যায়। সেই ভিলাটি ডাচ কোম্পানির কাছ থেকে কিনেছিলেন মণ্ডল পরিবারের সদস্যরা বসতি স্থাপনের জন্য। এই স্বর্ণবণিক্‌ সম্প্রদায়ভুক্ত মণ্ডল পরিবারের পারিবারিক নুনের ব্যবসা ছিল। ওড়িশায় থাকাকালীন তাঁরা ব্রিটশ কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্য করতেন  এবং বঙ্গে এসেও সেই নুনের ব্যবসা অব্যাহত ছিল এই বণিক্‌ পরিবারের।

চুঁচুড়ায় বসতি নির্মাণের পর মণ্ডল পরিবারের সদস্যরা দুর্গাপুজো করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার আগে থেকে এই চুঁচুড়ায় আঢ্য পরিবার, শীল পরিবার পুজো করে আসছেন। এঁদের দেখেই উৎসাহিত হল মণ্ডল পরিবার। এই পরিবারের কুলদেবতা হলেন শ্রীশ্রীরঘুনাথ জীউ। তিনি এখনও ওড়িশাতেই পূজিত হন। তাই এই পরিবারের দুর্গাপুজো সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে হয়ে থাকে।

বলিদানের প্রস্তুতি।

এই পরিবারের আরও এক সদস্য অরূপ মণ্ডল জানালেন, এই পরিবারে অন্নভোগ নিবেদন করা হয় না এবং পশু বলিদানেরও কোনো প্রথাও নেই। এই পরিবারে দুর্গাপুজোর সময় চালকুমড়ো বলিদান হয় এবং চালের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। সঙ্গে থাকে নানান রকমের তরিতরকারি, তেল, নুন ইত্যাদি।

এই পরিবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন দেবীর চক্ষুদানের সময় বলিদান এবং আরও একটি বলিদান মহাষ্টমীর পুজোতে। রাত্রে দেবীকে নুন ছাড়া লুচিভোগ, বিভিন্ন রকমের ভাজা, মিষ্টান্ন ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। অতীতে মহালয়ার দিন দেবীর বোধন অনুষ্ঠিত হত। কিন্তু কালক্রমে সেই বোধনের পুজো এখন ষষ্ঠীর দিন হয় অর্থাৎ ষষ্ঠ্যাদিকল্পারম্ভ। দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীর সন্ধিপূজায় ১০৮ দীপদান ও ১০৮ পদ্ম নিবেদন করা হয় দেবীকে।

এই পরিবারে একটি প্রাচীন কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামোতেই ঠাকুর তৈরি হয় প্রতি বছর। পরিবারের সদস্যের কথানুযায়ী কাঠামোটি ১৮০বছরের প্রাচীন। এ ছাড়া মণ্ডলবাড়িতে একটি বিশেষ পট রয়েছে। সেই অনুযায়ী চালচিত্র আঁকা হয়। সেটি এই পরিবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই পরিবারে মা মহাদেবকে সঙ্গে নিয়ে আসেন অর্থাৎ সপরিবার দেবী মহাদেবের পাশে অধিষ্ঠান করেন। মহানবমীর দিন নবগ্রহের হোমযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয় এই পরিবারে।

মণ্ডলবাড়ির শিবদুর্গা।

বর্তমানে মণ্ডল পরিবারে পালা অনুযায়ী দুর্গাপুজো হয়। একটি হয় কামারপাড়ায় আর একটি হয় যেখানে ডাচ ভিলাটি যেখানে ছিল সেখানে একটি মন্দির তৈরি করে। অতীতে কাঁধে করেই দেবীকে বিসর্জন দেওয়া হত। বর্তমানে সেই প্রথা আজ বন্ধ। দশমীর দিন দেবীর বরণের পর কনকাঞ্জলি প্রথা পালন করা হয় চুঁচুড়ার মণ্ডল পরিবারে। এই ভাবেই আজও প্রাচীন প্রথা মেনেই পুজো পেয়ে আসছেন মণ্ডলবাড়ির শিবদুর্গা।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন