শহুরে জাঁকজমক নেই, আকুই পশ্চিমপাড়ার পুজোয় আছে আত্মিক টান

1
ইন্দ্রাণী সেন

-“ও বিষ্টুদা গণেশের জায়গায় তুমি বসে গেলেই তো পারো। বছর বছর তোমার ভুঁড়ি গণেশের মতো বেড়ে চলেছে। আর কার্তিক তো পুরো হিন্দি সিনেমার মিঠুন।”

-“তোমাদের নিয়ে আর পারি না বাপু। শান্তিতে ঠাকুর গড়তে দাও না।”

-“তা বিষ্টুদা তুমি কুড়িটা রুটি কী করে খাও? মেজমার তো হাত ব্যথা হয়ে যায়।”

স্কুলের শেষে দুর্গামেলায় ঠাকুর-মিস্ত্রিকে খানিক রাগিয়ে এ বার ঘোষপুকুরের পথ ধরল বছর পনেরো-ষোলোর নিমাই, নিতাই আর তপন। পাশ থেকে আবার যোগ দিল মানিক…।

বটতলায় বসে নারকেল নাড়ু, খই নাড়ু আর চালভাজার গল্পে ছেলেবেলা পেরিয়ে প্রবাসী বাঙালি নিমাই এখন বরিষ্ঠ নাগরিক। ইংল্যাণ্ডবাসী নাতনিকে ‘দুর্গাপুজো কার্নিভেলের’ গল্প শোনাচ্ছেন। হালের দুর্গাপুজোর এলাহি আয়োজন ছেড়ে নিজের গাঁয়ের ছেলেবেলার পুজোর স্মৃতিচারণাতেই বর্তমানের এই ষাটোর্ধ-সত্তোরার্ধরা বেশি সুখ পান।

লালমাটির রাস্তা ধরে কিছুটা পথ পেরিয়ে বট-অশ্বত্থের ছায়ানিবিড় কালো পুকুরের টলটলে জলে স্নান সেরে ষষ্ঠীর বোধনের দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত পুজো। বাড়ির কাজ করতে করতে পঁচাত্তর বছরের ‘যুবতী’ ঠাকুমা জয়াদেবী বাড়ির নাতনিদের গল্প বলছেন, “আকুইয়ের পশ্চিমপড়ার পুজো সবার সেরা। আমার বাপের দেশের পুজো টাকুকাকা আর মদনকাকা, কুমুদদার মন্ত্র উচ্চারণ আর চণ্ডীপাঠে হাটতলা গমগম করত।”

বছর পঁয়তাল্লিশের সুজাতা চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “বিয়ে হয়েছে বছর ছাব্বিশ। জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত আকুইয়ের পুজো বাদ যায়নি। ছেলে মেয়ে, সবাইয়ের গ্রামের পুজোই বেশি পছন্দ। শহর থেকেও এই পুজোর সময় মনটা এই গ্রামেই পড়ে থাকে”।

আবার কলকাতায় জন্ম এবং বেড়ে উঠলেও পুজোর সময় নিজের গ্রাম আকুই আসতেই হবে বছর আঠাশের শ্রয়ণকে। সে বলে, “গ্রামের বাড়িতে সব সময় আসতে ভালো লাগে। এখানকার পুজো দেখলে মনে শান্তি আসে, যে শান্তি কলকাতার কোলাহল-হট্টগোলের মধ্যে পাই না।”

আকুই পল্লিমঙ্গল সমিতির প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যরা এখন সবাই সত্তর পেরিয়েছেন। দেখতে দেখতে তাঁদের পুজো এ বার ৫৫-এ পা দিল। সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এককড়ি মুখোপাধ্যায় বলেন, “চেয়ে মেগে পাড়ার ছেলেরা এই পুজো শুরু করেছিল। নামেই বারোয়ারি পুজো আদতে এটা আমাদের প্রাণের পুজো।”

কুমুদবন্ধু মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “রাজ্য সরকার তো এ বার পুজোর কমিটিগুলোকে পঁচিশ হাজার টাকা করে দেবে বলেছে। পাড়ার নতুন প্রজন্মের ছেলেদের উৎসাহের অভাব, তাই আমরাই থানায় যাই। আমাদের সমিতির নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট না থাকায় আর টাকা পাওয়া হল না।”

(দুর্গাপুজো সংক্রান্ত যাবতীয় খবরাখবর পড়তে ক্লিক করুন এখানে)

তবে টাকা না পাওয়া গেলেও অনাড়ম্বর ভাবে নিষ্ঠা ভক্তি মেনেই পশ্চিমপাড়ার মানুষ পাঁচ দিন ধরে পুজোয় মাতেন। অষ্টমীর দিন দেবীকে একশো আট পদ্ম তুলসী দূর্বা ও বেলপাতার মালা দেওয়ার নিয়ম। নবমীর দিন আখ আর চালকুমড়ো দেবীকে নিবেদন করা হয়। দশমীর দিন ঠাকুর ভাসানের পর মন্দিরে ছোটোরা বড়োদের আশীর্বাদ নিয়ে মিষ্টিমুখ করলে তবে পুজো সম্পন্ন হয়। দশমীর ভাসানে আবার বিশেষ আকর্ষণ আতসবাজির খেলা।

দশমীতে আতসবাজির খেলা

সমিতির আরও এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রমাপ্রসাদ সেন বলেন, এ বার পুজোয় সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের প্রচার থাকবে। তিনি বলেন, “সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ, গাছ লাগাও প্রাণ বাঁচাও, জল ধরো জল ভরো, প্ল্যাস্টিক বর্জন – এই প্রকল্পগুলি তুলে ধরব। আমাদের পাড়ার ছেলেমেয়েরা ঘরে ঘরে ঘুরে এই গুলির প্রচার চালাবে আর সেই সঙ্গে পুজো মণ্ডপেও এর বার্তা থাকবে।”

হতে পারে এই পুজোয় শহুরে কোলাহল নেই, জাঁকজমক নেই, কিন্তু আত্মিক একটা টান রয়েছে। আর সেই টানেই বিদেশবিভুঁয়ে থাকলেও পুজোর ক’টা দিন গ্রামের বাড়িতে আসতেই হবে পাড়ার ছেলেমেয়েদের।

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.