বাণীকুমার ও মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’

0

papya_mitraরাত পোহালেই শিউলি ফোটা শরতের সেই ভোর। বেজে উঠবে সেই সুর, যে সুরের মায়াজালে বাঙালি বন্দি ৮৪টা বছর। সেই সুর সৃষ্টির অন্যতম কারিগর বাণীকুমারকে স্মরণ করেছেন পাপিয়া মিত্র।

পরনে কোঁচানো ধুতি ও পাঞ্জাবি, গায়ের রং ফর্সা, ঝকঝকে কালো পাম্পশু, মুখে পান, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। মাথার সামনের দিকের অংশ কিছুটা ফাঁকা হলেও পেছনে ও কানের দু’পাশের চুলটি বড়ো সুন্দর। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। গায়ে মিষ্টি আতরের গন্ধ। গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারা। সব কিছুর মধ্যেই এক শিল্পীসুলভ ভাব। মুখে তাঁর জর্দা মেশানো পান। আতরও মাখতেন তিনি। জুঁইফুলের আতর ছিল তাঁর খুব প্রিয়। এ হেন মানুষটি যে এত কঠিন হতে পারেন কে বলবে?

বলতে পারে অতীত।

১৯৩২-এ বাণীকুমারের প্রযোজনায় সম্প্রচারিত হল শারদ-আগমনী গীতিআলেখ্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। তখন এটি ঘিরে তীব্র আপত্তি ওঠে। ধর্মকে যারা চিরদিন বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে চায়, সেই রক্ষণশীলদের পক্ষ থেকে। প্রতিবাদের মূল কারণ ছিল – এক অব্রাহ্মণ ব্যক্তির কন্ঠে কেন চণ্ডীপাঠ শোনা যাবে? রুখে দাঁড়ালেন বাণীকুমার। গ্রন্থনা ও চণ্ডীপাঠ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রই করবেন এই সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন তিনি। আর মায়ের এই আরাধনায় মুসলমান শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করবেন৷ সে-ও আটকাবে না কিছুতেই৷ মা শুধু হিন্দুর মা নন। এই লড়াকু মনোভাব লেখা ছিল যেন মজ্জায়৷ অন্য একটি আপত্তিও ছিল, মহালয়ার সকালে পিতৃতর্পণের আগেই কেন চণ্ডীপাঠ হবে? এ কারণে কয়েক বছর অনুষ্ঠানটি ষষ্ঠীর ভোরে সম্প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু শেষে বাণীকুমারের সিদ্ধান্ত মেনেই মহালয়ার ভোরেই প্রচারিত হয়ে আসছে ‘মহিষাসুরমর্দিনী।

একই রকম জেদি মনোভাব দেখিয়েছিলেন পঞ্চাশের দশকেও। যখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন বোম্বাই, রিহার্সাল করা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব নয়। বাণীকুমার বেঁকে বসলেন, সুতো ছেঁড়া যাবে না। হোক তারকা, তবু বাদ হেমন্ত। দুর্ভাগ্য শচীন গুপ্তের, সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও গাওয়া হল না হেমন্তের ‘জাগো দুর্গা’। বর পেলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, আর সেই থেকেই অমর হয়ে রইলেন দ্বিজেন।

কে এই বাণীকুমার?

baniবাণীকুমারের আসল নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। জন্ম ১৯০৭-এর ২৩ নভেম্বর। পিতা সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ বিধুভূষণ ভট্টাচার্য ও মা অপর্ণা ভট্টাচার্য। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। আদি নিবাস ছিল হুগলির আঁটপুর। জ্যেষ্ঠ পুত্র বৈদ্যনাথের জন্ম হয় হাওড়ার কানপুর গ্রামের মাতুলালয়ে। বৈদ্যনাথ হাওড়া জেলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ওই স্কুলের শিক্ষক-কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসাহে কাব্যরচনায় মন দেন বৈদ্যনাথ। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। পিতা, পিতামহ, সকলেরই সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তি ছিল এবং সম্ভবত সেই কারণেই বৈদ্যনাথও সংস্কৃত নিয়ে পড়াশোনা করে ‘কাব্যসরস্বতী’ উপাধি পান। এটা পরে তাঁর কর্মজীবনে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল। সংস্কৃত পঠন উপলক্ষেই বৈদ্যনাথ বাগবাজারে পণ্ডিত অশোকনাথ শাস্ত্রীর সংস্পর্শে আসেন। ইচ্ছে থাকলেও সংসারের চাপে পড়াশোনা আর বেশি দূর এগোয়নি। টাঁকশালে চাকরি নিলেন বৈদ্যনাথ। গৌরী ভাট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

সৃষ্টিশীল মন নিয়ে টাঁকশালের কলম পেশায় তাঁর মন ছিল না। সময় ১৯২৭। ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে স্থাপিত হয় কলকাতা বেতারকেন্দ্র। সেই সময় একটি বেতারনাটকের জন্য কলকাতা বেতারকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ হল বৈদ্যনাথের। ১৯২৮-এ একুশের যুবক টাঁকশালের চাকরি ছেড়ে যোগ দিলেন রেডিওতে। সরকারি চাকরি ছেড়ে যে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়িয়েছিলেন ওই যুবক, তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই সময় বেতারকেন্দ্রের ভারতীয় অনুষ্ঠান বিভাগের অধিকর্তা নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদারের আগ্রহে ওখানে যোগ দিয়েছিলেন রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজকুমার মল্লিক, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র প্রমুখ শিল্পী। রাইটার স্টাফ আর্টিস্ট হয়ে কাজে যোগ দেন বৈদ্যনাথ – নাম নেন ‘বাণীকুমার’।

সাধারণ মানুষের কাছে যে ভাবে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত পঙ্কজকুমার ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ, সেই তুলনায় একটু হয়তো আড়ালেই থেকে গিয়েছেন বাণীকুমার। অথচ মূল অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও রচনা বাণীকুমারেরই। অনুষ্ঠানটি সফল ও আকর্ষণীয় করে তুলতে বাণীকুমারের সঙ্গে পঙ্কজকুমার মল্লিক ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাম অবশ্যই স্মরণীয়। বাণীকুমার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও পঙ্কজকুমার মল্লিক ছিলেন একই বৃন্তের তিনটি কুসুম।

বাণীকুমার নিজের লেখাতেই জানিয়েছেন, “এ কথা বলা বাহুল্য যে আমাদের কয়জনের আন্তরিক সাধন দ্বারা এই মহিমাময় চণ্ডী-গাথা সকল শ্রেণীর জনবর্গের প্রার্থনীয় হয়েছে।… ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ কলিকাতা বেতারের তথা বাংলার একটা কীর্তি স্থাপন করেছে।”

পণ্ডিত অশোকনাথ শাস্ত্রী’র ঠাকুরঘরে বসে লেখা শুরু করেন বাণীকুমার৷ কিছুটা লেখেন, আর পড়ে শোনান বন্ধু অশোকনাথকে৷ অশোকনাথ শোনেন, আলোচনা করেন, তথ্য সহায়তায় এগিয়ে আসেন। বাণীকুমার লিখে চলেন৷ আর লিখেই বসে যান আর এক অক্লান্ত পথিকের সঙ্গে৷ রাজার রোয়াব যাঁর সঙ্গীতে, তিনি পঙ্কজকুমার মল্লিক৷ অহরহ বৈঠক৷ আর ঘরময় সুরের পরশ৷ এক লাইন এক লাইন করে কোরাস নির্মাণ, পর্দার আড়ালে হাজার রাগ৷ পিলু, খম্বাজ, আহির ভৈরব, মালকোষ…পঙ্কজকুমার তখন সে আবহে এমনই আশক্ত, যে রাতের রাগ মালকোষকে ব্যবহার করলেন ভোরের সে মুহূর্তে৷ কর্ণাটকী শৈলির রাগ অনায়াসেই মিশ খেল অন্য ঘরানায়৷ আর বাণীকুমার, বন্ধু পঙ্কজের কাছে নতুন আত্মজকে সমর্পণ করে আবার ঢুকে গেলেন ঘোর-মধ্যে৷ যে ঘোরে প্রতিনিয়ত ডুব দিয়ে বাণীকুমার তুলে আনছেন মুক্তো-হিরে-চুনি-পান্না। ভোর চারটেয় তরঙ্গে ভাসা শুরু ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র৷ আরম্ভে তিন বার শঙ্খধ্বনি, আর তার পরই বীরেন ভদ্রের অমর হয়ে যাওয়া স্বর৷

বাণীকুমার এই শঙ্খ বাড়ি থেকে বেতারকেন্দ্রে নিয়ে যেতেন। মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় তাতে ফুঁ দিতেন৷ শুরুর নির্দেশ৷ পরে গৌর গোস্বামী বাঁশি দিয়ে বা কখনও শৈলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ক্ল্যারিওনেটে তুলে দিতেন এই সুর। তখন তো লাইভ ব্রডকাস্টের যুগ৷ দীর্ঘ বিশ-বাইশ দিনের অবিরাম মহড়া চলত পঙ্কজ মল্লিকের নেতৃত্বে। সকলের উপস্থিতি চাই। এক দিকে সারেঙ্গি ধরতেন মুন্সি, চেলোয় ওঁরই ভাই আলি, হার্মোনিয়ামে খুশি মহম্মদ, বেহালায় তারকনাথ দে, ম্যান্ডোলিনে সুরেন পাল, গিটারে সুজিত নাথ, এসরাজে দক্ষিণামোহন ঠাকুর, পিয়ানোয় রাইচাঁদ বড়াল, নক্ষত্রের সমাহার৷ আর এ সবের অন্য পিঠে গায়কদের নিয়ে একা বাণীকুমার। প্রত্যেকের সংস্কৃত উচ্চারণ ঠিক চলছে কিনা। এমনকি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রেরও৷ তিনি শুরুর দিকে সংস্কৃত বেশ কিছু কথা অনেকটা বাংলার মতো উচ্চারণ করে বলতেন, যা অধ্যাবসায়ের জোরে শেষে এমন বসল ওঁর গলায়, যে একটা ভিন্ন ধারাই তৈরি হয়ে গেল। বাণীকুমারের কথা ছিল, আগে মানে বুঝতে হবে প্রতিটি শব্দের, সে তুমি কোরাসই গাও না কেন, উপলব্ধি করতে হবে ভাব, তার পর মিলবে ছাড়। সোজা পঙ্কজবাবুর সান্নিধ্যে এক বিস্তর মহাযজ্ঞ।

এবারেও বোধনের আগে আর এক বোধনের কথা ছড়িয়ে পড়ছে আশ্বিনের শারদ হাওয়ায়। কচুরি জিলিপির দোকানে অর্ডার চলে গিয়েছে পঙ্কজকুমারের। এরই মধ্যে বেতারকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে পড়েছেন বাণীকুমার গঙ্গার দিকে যাবেন বলে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.