‘বুড়িমা’র তুলির টানে জীবন্ত হয়ে উঠছে দশভুজা

0

titas_paulতিতাস পাল, জলপাইগুড়ি

এ এক অন্য ‘দুর্গার’ কাহিনি। ‘মৃন্ময়ী’ নয়, ‘চিন্ময়ী’ দশভুজার গল্প।

সুমতি পাল। বয়স ৬৬। নাতি-পুতি নিয়ে ভরা সংসার। একমাত্র ছেলে ব্যবসায়ী। চার মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আর্থিক অনটনও আর নেই এখন। তবুও শুধু নেশার টানে আজও কাজ করে চলেছেন তিনি।

তিনি একজন মৃৎশিল্পী। শুধু জলপাইগুড়ির নয়, সম্ভবত উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বয়স্ক মহিলা মৃৎশিল্পী তিনি। আজও তাঁর হাতের কারিকুরিতে একতাল কাদার মধ্যে ফুটে ওঠে মায়ের অপরূপ মুখচ্ছবি, তাঁর হাতের তুলির টানে জীবন্ত হয়ে ওঠে দশভুজার চোখ।

শুরুটা হয়ে ছিল মাত্র ১৬ বছর বয়সে। জলপাইগুড়ি শহরের ভাটিয়া বিল্ডিং এলাকার বাসিন্দা গোপাল পালের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। পেশায় মৃৎশিল্পী গোপাল পাল তার তরুণী স্ত্রীকেও হাতে ধরে কাজ শেখাতে শুরু করেন। এ ভাবেই একদিন শিখতে শিখতে নেশায় পরিণত হয়ে যায় প্রতিমা গড়া।

এর মধ্যেই একদিন দুর্যোগের ছায়া নেমে আসে। সময়টা ১৯৮২ সাল। ক্যান্সারে মৃত্যু হয় গোপালবাবুর। চার মেয়ে, এক ছেলেকে নিয়ে অকূলপাথারে পড়েন সুমতি দেবী। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। সংসার চালাতে স্বামীর শেখানো কাজকেই আঁকড়ে ধরেন তিনি। শুরু হয় পথ চলা। প্রথমে সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশের প্রতিমা গড়া। হাত একটু পরিণত হলে শুরু করেন দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করার কাজ। যা আজও নিরলস ভাবে করে চলেছেন তিনি। আগে ছেলেমেয়েরাও কাজে সাহায্য করত। এখন তারা নিজের কাজ, নিজের সংসার নিয়ে ব্যাস্ত। তাই দিদাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে নাতিরা। শুধু সাহায্য নয়, তারাও দিদার হাত ধরে কাজ শিখতে শিখতে ভালোবেসে ফেলেছে মৃৎশিল্পকে।

তবে কাজে যত পরিশ্রম, পারিশ্রমিক সেই অনুপাতে আর পাওয়া যায় না। এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রতিমা তৈরি খরচও। কিন্তু দাম পাওয়া যায় না ততটা। তাই কাজের শেষে হাতে লাভের কড়ি তেমন থাকে না। তবে তাতে আক্ষেপ নেই সবার পছন্দের ‘বুড়িমা’র। যেমন আক্ষেপ নেই কোনো সরকারি সাহায্য বা পুরস্কার না পাওয়ারও।

এবারও ৮টি বড় পুজোর প্রতিমা গড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। মৃৎশিল্পীদের সমবায় সমিতি থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিমা বিক্রি করে দেনা মিটিয়ে দেবেন। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত এই কাজ এক সময়ে তাঁর ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ের মুখে ভাত জুগিয়েছে। তাই লাভ না থাকলেও তাঁর দুখ নেই। যতদিন বেচে আছেন, নেশার ঝোঁকেই মায়ের প্রতিমা গড়ার কাজ করে যাবেন, ফোকলা মুখে হেসে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

বয়সের ভারে শীর্ণকায় হলেও কাজের নেশা তার সব ক্লান্তিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। তাঁর হাতের মসৃণ ধারায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে মায়ের অপরূপ মুখচ্ছবি। এক ‘চিন্ময়ী দশভুজার’ শীর্ণকায় আঙুলের তুলির টানে জীবন্ত হয়ে উঠছে আর এক ‘মৃণ্ময়ী দশভুজার’ মাতৃমুর্তি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here