শুভদীপ রায় চৌধুরী

আজ সপ্তমী, প্রতি বছর সপ্তমীর চেনা রাজপথ কি এ বার দেখা যাবে? নাকি বিগত তিন দিনের মতোই জনস্রোতহীন নগরী দেখা যাবে। এ বছর উৎসবের পার্বণ চললেও মানুষের মনে রয়েছে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক। নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো হলেও কেউ পুজো সামনে থেকে দেখতে পাচ্ছেন না, হচ্ছে না অঞ্জলিও।

তিলোত্তমার শ্রেষ্ঠ উৎসবের দিনগুলো এ বছর সকলকে ঘরে বসেই কাটাতে হচ্ছে। হাইকোর্টের নির্দেশমতো কেউ মণ্ডপে প্রবেশ করতে পারছেন না এবং শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে পুজোর সব কাজ করতে হচ্ছে। হাইকোর্টের রায়কে সম্মান জানিয়ে এ বার পুজোর উদ্যোক্তারাও সব কিছু করছেন।

উত্তর কলকাতার অন্যতম বারোয়ারি পুজো কাশীবোস লেন সর্বজনীন পুজো কমিটির সদস্য সোমেন দত্ত জানালেন, এ বছর তাঁদের থিম ‘দেবীঘট’। তিনি আরও জানান, এ বছর দর্শনার্থীদের দেবীপ্রতিমা দর্শন করতে হবে ভার্চুয়ালি।  তার জন্য রয়েছে এলইডির ব্যবস্থাও। মূল মণ্ডপের সামনে শুধুমাত্র কমিটির পঁচিশ জন সদস্যই যেতে পারবেন।

করোনার জন্য অনেক পুজোকমিটিই ভেবেছিল এ বছর প্রতিমার বদলে দেবীঘটেই পুজো করতে হবে। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই কাশীবোস লেন সর্বজনীনের পুজোর থিম হল ‘দেবীঘট’ বা ‘মঙ্গলঘট’। সমগ্র ভাবনাটি শিল্পী রিমল পাল মহাশয়ের।

এ বছর কাশীবোস লেনে সিঁদুরখেলা হচ্ছে না এবং যে সমস্ত মহিলা দেবীকে বরণ করতে আসবেন তাঁরা দূর থেকে মাকে বরণ করে চলে যাবেন। অর্থাৎ উত্তরের কাশীবোস লেন সর্বজনীনের পুজো এ বার নানান বিধিনিষেধের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

হাতিবাগান সর্বজনীন।

কথা হচ্ছিল হাতিবাগান সর্বজনীন পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, তাঁদের পুজোতেও রয়েছে নানা সুরক্ষাবিধি এবং তাঁরাও হাইকোর্টের নিয়ম মেনেই পুজো করছেন। মণ্ডপে প্রবেশের অধিকার নেই সাধারণের।

এ বছর হাতিবাগান সর্বজনীনের থিম ‘অসমাপ্ত’, অর্থাৎ সমস্ত পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো শুরু হলেও করোনাভাইরাসের প্রভাবে পরিকল্পনা অনেকটাই বাস্তবায়িত করা গেল না। তাই নাম ‘অসমাপ্ত’। এই পুজোমণ্ডপে গেলে আপনি দেখতে পাবেন কারিগররা কাজ করতে করতে ফেলে গিয়েছেন নানা যন্ত্রপাতি। এ বছর হাতিবাগানের দেবীপ্রতিমা কাগজের তৈরি। তাই আনুষ্ঠানিক বিসর্জনের কোনো ব্যবস্থাও নেই।

নলীন সরকার স্ট্রিট সর্বজনীন।

নলীন সরকার স্ট্রিট সর্বজনীন দুর্গোৎসব এ বছর ৮৮তম বর্ষে পদার্পণ করল। কথা হচ্ছিল কমিটির সভাপতি জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এ বছর তাঁদের পুজোর থিম ‘পুজো এবার কাঠামোতে’, অর্থাৎ মহামারির সঙ্কটের সময়ে বিগ্রহ সম্পূর্ণ করে উঠতে পারেননি শিল্পী। তাই আপনি মণ্ডপের সামনে গেলে দেখতে পাবেন নানা অসমাপ্ত প্রতিমা রয়েছে। এমনকি মণ্ডপের মূল প্রতিমার শুধুমাত্র চক্ষুদান করা সম্ভব হয়েছে। সমগ্র পরিকল্পনাটি শিল্পী মানস দাঁ মহাশয়ের এবং মূর্তি তৈরি করেছেন সৈকত বসু।

হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে নলীন সরকার স্ট্রিটের পুজো এ বছর পরিচালিত হচ্ছে। স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া দর্শনার্থীদের মাস্কও দেওয়া হচ্ছে। এ বছর দশমীতে কোনো শোভাযাত্রার আয়োজন করা হচ্ছে না এবং সিঁদুরখেলাও হবে না।

নর্থ ত্রিধারা সর্বজনীন।

উত্তর কলকাতার আরও একটি জনপ্রিয় বারোয়ারি পুজো হল ‘নর্থ ত্রিধারা সর্বজনীন’। এ বছর তাঁদের ভাবনা ‘শ্রদ্ধার্ঘ্য’। অর্থাৎ কোভিড থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা যাঁরা করছেন তাঁদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে নর্থ ত্রিধারা পুজো কমিটি। তার জন্য গোটা পুজোমণ্ডপে এক হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সমগ্র পরিকল্পনাটি শিল্পী সম্রাট ভট্টাচার্যের।

পুজো কমিটির সদস্য রহিত মণ্ডলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, মূল মণ্ডপে এ বছর প্রবেশ করতে পারবেন না দর্শনার্থীরা। তাঁদের দূর থেকেই দেবীকে দর্শন করতে হবে এবং অবশ্যই মাস্ক পরে। তা ছাড়া পুজো কমিটির উদ্যোগে স্যনিটাইজারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। অর্থাৎ হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই তারা এ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করছেন।

সিকদারবাগান সর্বজনীন।

কলকাতার তৃতীয় প্রাচীনতম বারোয়ারি পুজো হল সিকদারবাগান সর্বজনীন। পুজো কমিটির পক্ষ থেকে জয়দীপ সেন, এ বছর তাঁদের থিম ‘উৎসব’। এ বার সকলের মধ্যে প্রশ্ন হতেই পারে যে করোনাভাইরাসে উৎসব কি ভাবে সম্ভব? তাঁদের বক্তব্য, পরিস্থিতি যা-ই হোক, মানুষের মধ্যে আত্মিক যোগাযোগই বড়ো কথা। এই আত্মিক যোগাযোগই তো ‘উৎসব’।

এ বছর তাঁরা মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই পুজো করছেন। করোনাভাইরাসে যাঁরা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাঁদের সমস্ত রকম ভাবে সাহায্য করেছেন এবং যাঁরা করোনাকে জয় করে বাড়ি ফিরেছেন তাঁদের দিয়েছেন সম্মান। সাধারণ মানুষকে দূর থেকেই দেখতে হবে পুজো এবং এ বছর কোনো ভোগ বিতরণ হচ্ছে না সিকদার বাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপ থেকে।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন