মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

আজ সপ্তমী। সকালেই নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে নিয়ে এসে স্থাপন করা হয়েছে রাজবাড়িতে। সে এক বেশ জমজমাট শোভাযাত্রা। তাতে শামিল হয়েছিলেন পরিবারের সব সদস্য এবং গ্রামবাসীরা। সে এক এলাহি ব্যাপার। এই দৃশ্য দেখিনি, তবে এমনটাই যে হয়েছে তা অনুমান করতে পারি। কারণ, এমনটাই যে হয় তা বলেছিলেন, রাজবাড়ির সদস্য শরদিন্দু সরকার। তবে শরদিন্দুবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছিল পরে। তার আগে আলাপ হয়েছিল অদিতি আর পর্নার সঙ্গে। একটু খুলেই বলা যাক।

রাঙামাটির দেশ বোলপুর। তারই এক গ্রাম সুরুল। শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে চারপাশ আলো করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুরুল রাজবাড়ি। চতুর্থীর দুপুরে পৌঁছে গিয়েছিলাম সেখানে। না, শরৎকালের পুজো-পুজো নরম রোদ ছিল না। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্যাচপ্যাচে গরম। বাতাসের আর্দ্রতা মন ভেজাতে না পারলেও সেই কাজটা করল সরকারবাড়ির মেজাজটা।

পুজোর প্রস্তুতি তখন তুঙ্গে। নাটমন্দিরে চলছে প্রতিমা সাজানোর কাজ। বছরের এই ক’টা দিন ঝলমল করবে রাজবাড়ি। আশেপাশে যে যার কাজে ব্যস্ত। এরই মধ্যে আলাপ হল দুই স্কুল পড়ুয়া সহপাঠীর সঙ্গে। অদিতি আর পর্না। সুরুলের সরকার বাড়িরই (রাজবাড়ি) মেয়ে অদিতি। বিশ্বভারতী থেকে আগামী বছর উচ্চ মাধ্যমিক দেবে ওরা। বন্ধু পর্নাকে নিয়ে টিউশন ফেরত আড্ডা মারছিল রাজবাড়ির দালানে। কলকাতা থেকে এসেছি শুনে দুই বন্ধু মিলে ঘুরে দেখাল গোটা রাজবাড়ি। এক লহমায় মনের ভেতর গেঁথে যাওয়া স্মৃতি থেকে উঠে এল শুকতারার পাতারা। হাফইয়ার্লি  শেষের দিনগুলো শারদীয়া সংখ্যা হাতে উঠলেই নিমেষে চলে যেতাম এ রকমই এক রাজবাড়িতে, মেঠো সুর আর কাশফুলে ভরা পুজোর আমেজে। আমি, আপনি, সব্বাই, তাই না?

যে কোনো রাজবাড়ির মূল কাঠামো যে রকম হয়, সরকারবাড়ি তার থেকে খুব কিছু আলাদা নয়। মাঝখানে নাটমন্দিরকে রেখে চতুষ্কোণ রাজবাড়ি। কিন্তু শহুরে রাজবাড়ির তুলনায় মাটির গন্ধ যেন কিছু বেশি। সদ্য কৈশোর পেরোনো দুই মেয়ের হাত ধরে শুরু হল অতীতকে ছুঁয়ে দেখা।

বোলপুরের সরকারবাড়ির ইতিহাসটা একটু বলে নিই ছোটো করে? সরকার কিন্তু এদের আসল পদবি নয়, ইংরেজদের থেকে পাওয়া। আসল পদবি ঘোষ। আর বোলপুর এদের আদি নিবাসও নয়। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে ভরতচন্দ্র সরকার বর্ধমানের বাঁকা নদীর ধারে নীলপুর থেকে সুরুলে আসেন গুরুর বাড়িতে থাকতে। গুরু বাসুদেব ভট্টাচার্যের বাড়িতে দীর্ঘসময় সস্ত্রীক থাকেন ভরতচন্দ্র। সেখানে তাঁদের একটি পুত্রসন্তান হয় – কৃষ্ণহরি। এ ভাবে ধীরে ধীরে সুরুলেই পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেন সরকার পরিবার।

কৃষ্ণহরির ছেলে শ্রীনিবাস ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসা করে রীতিমতো নাম করেছিলেন সে যুগে। মূলত ছিল জাহাজের পাল তৈরির কাপড়ের ব্যবসা আর নীল চাষের ব্যবসা। ভরতচন্দ্রের আমল থেকেই শুরু হয়েছিল সরকারবাড়ির দুর্গাপুজো। পরে তার ছেলেদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগাভাগি হলে ছোটো তরফের বাড়িতেও আলাদা করে শুরু হয় অকালবোধন। বড়ো তরফের (বড়োবাড়ির) পুজো এ বার পা দিল ২৮৩ বছরে।

পরে যোগাযোগ হল শরদিন্দুবাবুর সঙ্গে। পুজোর নিয়মকানুন আচার সব গুছিয়ে বললেন শরদিন্দুবাবু। রথের দিন শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। একচালার ডাকের সাজের প্রতিমা। মৃৎশিল্পীরা পাঁচ পুরুষ ধরে প্রতিমা বানিয়ে আসছেন সুরুলের সরকারবাড়ির। পুজোর ক’টা দিন মা দুগ্‌গাকে সাজানো হয় রাজবাড়ির সোনার অলংকারে। অস্ত্রশস্ত্র যা থাকে দেবীর হাতে, সবই প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো। পঞ্চমী থেকেই নাটমন্দির আর ঠাকুরদালান সেজে ওঠে বেলজিয়াম থেকে আনা রঙিন বাতি আর ঝাড়লন্ঠনে। সব মিলিয়ে প্রায় দশবারোটা বনেদি বাড়ির পুজো হয় সুরুলে। তবে বড়োবাড়ি তার সাবেকিয়ানা আর আভিজাত্য নিয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে এখনও।

ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে সুরুলের রাজপরিবারের সম্পর্ক বরাবর ভালোই ছিল। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের জমির বেশ অনেকটা পেয়েছিলেন রাজ পরিবারের কাছ থেকেই। রবীন্দ্রনাথ আর রথীন্দ্রনাথের নিয়মিত যাতায়াত ছিল সরকারবাড়িতে। মহাত্মাকে নিয়ে কবিগুরু রাজবাড়ির যে ঘরটিতে রাত কাটিয়েছিলেন, অদিতি আর পর্না মিলে ঘুরে দেখাল সেই ঘরও।

টুনি বালব্‌ নয়, পুজোর দিনগুলোতে রাজবাড়ি সাজে রেড়ির তেলের প্রদীপে। অন্নভোগের রেওয়াজ নেই বড়োবাড়ির পুজোয়। চিড়ে, নাড়ু, মিষ্টি, ফল দিয়েই তৈরি হয় ভোগ। পুজো হয় বৈষ্ণবমতে। পুজোর নির্ঘণ্ট তৈরি হয়ে যায় এক মাস আগে থেকে। সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নান করে শোভাযাত্রা করে ফেরে পরিবারের সদস্য সমেত গ্রামবাসী। সে এক দেখার মতো ব্যাপার। সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী তিন দিনই বলির প্রচলন রয়েছে সরকারবাড়িতে। সপ্তমীতে চালকুমড়ো, অষ্টমীতে পাঁঠা আর নবমীতে আখ। বলির সময়টুকু নারায়ণকে রেখে আসা হয় মন্দিরে। বাকি সময়টা তাঁর উপস্থিতিতেই হয় দেবীর আরাধনা। ওই তিন দিন রোজ সন্ধেতে নাটমন্দিরে বসে যাত্রার আসর। এই সে দিন পর্যন্ত বাড়ির মেয়েরা যাত্রা দেখতেন চিকের আড়াল থেকে।

এখন জমজমাট রাজবাড়ি। দেশের নানা প্রান্ত, এমনকি বিদেশ থেকেও এসেছেন রাজপরিবারের সদস্যরা। বছরভর বিদেশ বিভূঁইয়ে থেকে চারটে দিনের জন্য ঘরে ফেরা। এই ফেরার টানে রাজবাড়ি-টারি বলে আলাদা কিছু হয় না বোধ হয়। নাড়ির টানে ফিরে আসার সুরটা কোথায় যেন এক হয়ে যায় বাংলার সব ঘরেই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here