কলকাতার পুজোয় এত যে থিমের রমরমা তার জন্ম কিন্তু আদতে বেহালা। এক সময়ে থিমের পুজো দেখার জন্য গোটা কলকাতা ও তার আশেপাশের অঞ্চল ভিড় জমাত বেহালায়। তার পর সেই থিমের পুজো ছড়িয়ে পড়ল খোদ কলকাতাতেও। তা বলে বেহালার গৌরব এতটুকু টাল খায়নি। চলুন আজ ষষ্ঠীর দিন কলকাতার একেবারে দক্ষিণ অংশে, বা আরও স্পষ্ট করে বললে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে চলে যাই।

উদয়ন পল্লী শীলপাড়া   

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে থিম করেছেণ শিল্পী শক্তি শর্মা। তা রুপায়ন করেছেন শিল্পী সমর হালদার। কাশফুল আর শিউলি ফুলের আবাহনে মা দুর্গার উপস্থিতি। মণ্ডপে ও বাইরে হাজার হাজার শিউলির বৃষ্টি ঝোরে পর্বে দর্শনার্থীদের সামনে। ফুলের ও আলোর খেলায় মেতে উঠবে উৎসবের মণ্ডপ। কাশফুলের সমারোহ আজকাল যে দেখা যায় না, তার উপস্থিতি থাকবে শীলপাড়ার উদয়ন পল্লীতে। পুজোটি এবারে ৪৯ বছরে পদার্পণ করল।

এই পুজো সখের বাজার ছাড়িয়ে বেহালা শীলপাড়ায়। বেহালা দমকলের সামনে।

বড়িশা ইউথ ক্লাব

৩৯ বছরে পা দিল এই পুজো। শিল্পী সুজিত পালের ভাবনায় ফুটে উঠেছে ‘খেলনাগাড়ি – আজ ভাব কাল আড়ি’ এই থিমটি। শৈশবের হারিয়ে যাওয়া মাটি-কাঠ-কাঠি-গাছের পাতায় তৈরি নানা খেলনার সরঞ্জাম মনে করিয়ে দেবে ফেলে আসা দিনগুলিকে। বিদেশি খেলনা শিশুমনে যে প্রভাব ফেলছে তাতে পরিবেষ বিঘ্নিত হচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া ওই সব খেলনার আদলে সেজে উঠেছে মণ্ডপ। তৈরি হয়েছে দেবী প্রতিমাও। টাট্টু ঘোড়া, তিন কাঠির টানা মাটির ঢাক, পাতার পুতুলের স্বাদ নেওয়ার জন্য একবার উঁকি দিতেই হবে বড়িশা ইউথ ক্লাবে।

youthশীলপাড়া থেকে সোজা পশ্চিমে এই পুজোর মণ্ডপ।  

ইউনিক পার্ক কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন

ঠিক ১১ বছর আগের শুরুটা কেমন ছিল? গালগল্প। চায়ের ধোঁয়ায় মনে হল একটা পুজো করলে কেমন হয়? সেই তো পুজো পুজো গন্ধে কলকাতা টেনে আনে নিজ ভূমে। অন্য পুজোর গল্প নিয়ে মেতে মেতে ক্লান্ত মিঠু, শুভাশিস, চিকিৎসক সুব্রত গুপ্ত, গোবিন্দ ঘোষেরা। সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাই চাঁদা তোলার কোনো প্রয়োজন হয় না। নিজস্ব বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপের সাহায্যে সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত এই পুজোটি ১১ বছরে পা দিল। ডাকের সাজের প্রতিমা। পুজোর যাবতীয় সজ্জা, আয়োজন, ভোগের রান্না, এমনকি যাঁরা দুবেলা মণ্ডপেই খান, সকলেরই রান্না কমিটির মহিলারা করে থাকেন।

unique-parkপঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত দুবেলা খাওয়াদাওয়া বিচিত্রানুষ্ঠান মণ্ডপেই হয়ে থাকে। পরদেশে যে সকল মানুষ সারা বছর থাকেন দুর্গাপুজোর সময় এই মণ্ডপই হয়ে ওঠে তাঁদের নিজের বাড়ি। অষ্টমী ও নবমীতে যারা মণ্ডপে অঞ্জলি দিতে আসেন পরে চা থেকে রাতের খাবার পর্যন্ত তাঁরা খান। প্রতিদিনের বিচিত্রানুষ্ঠানে এলাকার শিল্পী ছাড়াও প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা আসেন। অনুষ্ঠান শেষে সকলেই উপহার পান। সিঁদুর খেলার শেষেও সকলেই উপহার পেয়ে যান। পুরোহিত আসেন মেদিনীপুর থেকে।

বেহালা ১৪ নম্বর ছাড়িয়ে চৌরাস্তার দিকে যেতে ইউনিক পার্ক।

বেহালা দেবদারু ফটক

তিনটি স্তরে মূল মণ্ডপ সজ্জা। সমগ্র থিম ঘিরে রয়েছে মহাকাল, অসুর নিধন ও শান্তিময়ী দেবী। মণ্ডপের শুরুতেই ১০-১২ ফুটের তাণ্ডবনৃত্যে মহাদেব যার ৬ টি হাত ও একই দেহে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। ৫০ টি ডুগডুগির আবহগীত আপনাদের স্বাগত জানাবে। থিম পুরাণের আদি শক্তি। পরের পর্বে থাকছে মাটি থেকে শূন্যে অসুর নিধন। ত্রিশূল অসুরকে বধ করে ভূমি স্পর্শ করেছে। শেষ পর্বে যেখানে দর্শনার্থীরা প্রতিমার কাছে পৌচ্ছছেন, সেখানে তলতা বাঁশের কাঠি দিয়ে তৈরি হয়েছে পুরাণ বই। তাঁর মধ্যে আদি শক্তিকে পাচ্ছি। অসুর নিধনের রুদ্র মূর্তি দেবীকে শান্ত করানোর জন্য পরানো হয়েছে লালপাড় শাড়ি, শাঁখাপলা, রুদ্রাক্ষের মালা। চলবে তিন আঙ্গিকে আবহসংগীত। ব্যবহার করা হয়েছে তলতা বাঁশ। সেই বাঁশ জলে ভিজিয়ে কাঠির সাহায্য নিয়ে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ সজ্জার নানা উপকরণ, কিছুটা গুম্ফার পুণ্য অর্জনের জন্য নানা সরঞ্জাম। শীতলপাটির র‍্যাপারে আঁকা পুরাণের নানা দেবদেবীর মূর্তি ও দেবীমন্ত্র। থিম ও মণ্ডপ সজ্জার রূপায়ণ ও চিত্রণ শিল্পী তপন প্রামাণিক।

বেহালা ১৪ নম্বরের বিপরীতে এই পূজা ৪৪ বছরে পা দিল। 

বেহালা ফ্রেন্ডস

আলোর মূর্চ্ছনায় ভেসে যায় আনন্দের ধ্বনি। উদ্বেলিত হয়ে ওঠে দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি শব্দ ‘মা’। অন্তরে অন্তরে অক্ষরে অক্ষরে এই শব্দটি কখন যে আমাদের শিরা-উপশিরায় ঝড় তোলে নিজেরাই বুঝতে পারি না। সময়ের সঙ্গে ক্রমে ক্রমে তা ধরা পড়ে। মা তাঁর আঁচলটুকু দিয়েই বিঘ্ন বিনাশকারী ছাতা মেলে রেখেছেন। এটাই এক কথা। জন্ম-জন্মান্তরের এক অনুচ্চারিত অনুরণন তো মাতৃগর্ভ থেকেই টের পাওয়া যায়। এই শারদপ্রাতে বেহালা ফ্রেন্ডস আয়োজিত ‘মা – অন্তরে অন্তরে’ থিমের পুজোমণ্ডপে সকলকে উঁকি দিতেই হবে। পরিকল্পনা ও নির্দেশনা বিশ্বনাথ দে। সৃজনে অরুণ পাল, দিশারী চক্রবর্তী, বিকাশ বড়াল ও নিমাই মণ্ডল। পুজো ৫১ বছরে পড়ল।

এই পুজো বেহালা রায়বাহাদুর রোডে।

বেহালা নতুন সংঘ

‘উৎসব’ থিমেই দুর্গোৎসব পালন করছে বেহালা নতুন সংঘ। কেবল মাত্র কাপড়ের ব্যবহারে সাজিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপ। বিষয় ভাবনা প্রশান্ত পাল।

১৪ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে হাঁটা পথে রায়বাহাদুর রোডের বাঁ দিকে  পুজোমণ্ডপ।

বেহালা নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাব

‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে’ — এটাই থিম বেহালা নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাবের। ষড়রিপুর বন্ধনে মানুষ আবদ্ধ। সেই বন্ধন থেকে মুক্তির স্বাদ এনে দিতে পারে মহামায়া। এই ভাবনার রূপ দান করা হয়েছে মণ্ডপসজ্জায়। আলোকসজ্জায় মহম্মদ সেলিম, প্রতিমাশিল্পী তরুণ দে।

নিউ আলিপুর পেট্রোল পাম্প থেকে অটো করে জোড়া বটতলা স্টপেজ বা ১৪ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে হাঁটা পথে মণ্ডপ।    

পল্লি আসর স্পোর্টিং ক্লাব

শেষ তিন বছর মহিলাদের দ্বারা পূজিত এই পুজোটি ৮৫ বছরে পা দিল। ১৯৩২ –এ জমিদার সতীশ দাস কবিরাজ নিজের পরিবারে এই পুজো শুরু করেন। ১৯৪৩-এ এই পুজোর রূপান্তর ঘটে সর্বজনীনে। নাম হয় সাহাপুর সর্বজনীন। স্থানীয় একটি রেশন গোডাউনে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে এটি পল্লি আসর স্পোর্টিং ক্লাব নামে পরিচিত হয় এবং পুজোর পরিসর অনেক বাড়ে। এ বারে পুজোর থিম ‘ওরা কেমন আছে’। এই ‘ওরা’ কারা? তারা কারা, কোথায় কী ভাবে আছে, দেখতে গেলে আসতে হবে পুজো মণ্ডপে। শিল্পী লাল্টু পুরকায়েতের ভাবনায় গড়ে উঠেছে জঙ্গলে ঢাকা পোড়ো বাড়ি। আলোকসজ্জা এক অনবদ্য আবেদন রাখবে কথা দিতে পারি।

এই পূজামণ্ডপটি নিউ আলিপুরে।

গার্ডেনরিচ মিলন তীর্থ  

milanসংস্থার পুজো এ বার ৫০ বছরে পড়ল। তাই শিল্পী অসিত রঞ্জন জোয়ারদারের ভাবনায় পুজো কমিটি আয়োজন করেছে ৫০-এ ৫০ টি থিম। বিশ্বের ৫০ টি প্রতিমা দিয়ে মণ্ডপ সজ্জা হয়েছে। যেখানে যেখানে দেবী দুর্গার বিগ্রহ পাওয়া গিয়েছে, সেখানকার মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি মূর্তি ৬-৭ ফূট উচ্চতা। কেবলমাত্র পাকিস্তান থেকে কোন মূর্তি পাওয়া যায়নি। মণ্ডপে অস্ট্রেলিয়া,  দক্ষিণ আফ্রিকা ইরাক ইরান ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়া কানাডা জাপান সহ নানা দেশের ৫০ টী দেবীর দর্শন পাব। এ ছাড়াও থাকছে চিত্রণে আলোতে বাংলার শারদ উৎসবের ইতিবৃত্ত ও সারা পৃথিবীর (যেখানে যেখানে সম্ভব হয়েছে) দেবী দুর্গার প্রাতিষ্ঠানিক ও মন্দিরের প্রত্নতাত্ত্বিক রূপ।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন