হরপ্রসাদ সেন

ঐতিহাসিক এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেষ হতে চলেছে রাজধানীর দুর্গাপুজো। দেশের অন্যত্র বাঙালিরা একই অভিজ্ঞতা লাভ করলেও দিল্লিবাসী বাঙালিদের মতো পুজোর আনন্দ থেকে এতটা বঞ্চিত বোধহয় কেউ নয়, বিশেষ করে মাতৃ-আরাধনা থেকে। অল্প কয়েকটি পুজো সংগঠন প্রতিমার ব্যবস্থা করলেও বেশির ভাগই ঘটপুজোর মাধ্যমেই মায়ের আরাধনা সাঙ্গ করতে বাধ্য হচ্ছে। মাঠ বা পার্ক না পাওয়ার ফলে কোনো এক সদস্যের বাড়ির ছাদেই আয়োজিত হয়েছে ঘটপুজো।

Loading videos...

ভক্তদের গৃহবন্দি অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিয়েছে কিছু কিছু কালীবাড়ি কর্তৃপক্ষ। আকারে ছোটো হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাবেকি ধাঁচের মাতৃমূর্তি – কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার মাধ্যমে, কোভিড ১৯-এর সমস্ত রকম বিধি মেনেই হয়ে চলেছে অনুষ্ঠান। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘরে বসেই প্রতিমা দর্শন, পুজো দেখা বা অঞ্জলি দেওয়ার সব ব্যবস্থাই করেছে মন্দির কর্তৃপক্ষগুলো। চিত্তরঞ্জন পার্ক কালীবাড়ি বা দ্বারকা কালীবাড়ি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

চিত্তরঞ্জন পার্ক কালীবাড়িতে চলছে পুজো।

কালীবাড়িগুলো শুধু পুজো দেখা বা অঞ্জলি দেওয়ারই ব্যবস্থা করেনি, এ ক’ দিন মায়ের ভোগ বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে চলেছে। শুধু স্থানীয় ভক্তরাই নন, বিদেশ থেকেও বহু বাঙালি সরাসরি এই পুজোর লাভ উঠিয়েছেন, বাড়িতে বসেই অঞ্জলি দিয়ে।

দিল্লির আদি কালীবাড়ি, নিউ দিল্লি কালীবাড়িও একই রকম বিধিনিষেধের মধ্যে পুজোর আয়োজন করেছে। ভক্তবৃন্দ যাতে ভোগপ্রসাদ থেকে বঞ্চিত না হন, তার জন্য প্রতি দিনই মাত্র ১৫০ টাকার বিনিময়ে প্যাকেটজাত করে ভোগ বিতরণ করে চলেছেন।

চিত্তরঞ্জন পার্ক এলাকায় যে সব পুজো মাঠে বা পার্কে হয়, তারা যেমন পুজোর আয়োজন করতে পারেনি, তেমনই পারেনি সরোজিনী নগর বা লোধি কলোনির মতো বহু পুরোনো পুজোও। এর মধ্যে ব্যতিক্রম লক্ষ করা গেল মোতিবাগের পুজো। ছোট্ট এক ফালি পার্কে শুধু মায়ের সপরিবার মূর্তির উপস্থিতিই নয়, প্রতি দিন তারা সদস্যদের ভোগপ্রসাদ বিতরণ করে চলেছেন। সদস্যরা নিভৃতে একরকম দর্শক বা ভক্তবিহীন পরিবেশে ধুনুচি নাচ ও ভক্তিগীতির আয়োজন করে চলেছেন।

দ্বারকা কালীবাড়ির পুজো।

দিল্লির পুজোর মূল আকর্ষণ হল মণ্ডপে মণ্ডপে ভোগপ্রসাদ খাওয়া এবং বিভিন্ন রকমের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া। এ বার ক্রীড়ানুষ্ঠান না হলেও কয়েকটি কালীবাড়ি অনলাইনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছে।

ভয়াবহ কোভিডের আবহে রাজধানীতে এ বার দুর্গাপুজো স্পন্দনহীন। এ বছরের জন্য হলেও দেখা গেল না মণ্ডপে প্রবেশ করার দীর্ঘ লাইন – মিনি কলকাতায় গরহাজির থাকল গরিব বাঙালিদের বিভিন্ন খাবারের স্টল – রাস্তার ধারে বসে থাকা মশলামুড়ি ও ফুচকাওয়ালাদের দর্শন মিলল না।

শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে পুজোয় উপস্থিতি।

রাজধানীর ইতিহাসে লেখা থাকবে প্রতিমাবিহীন দুর্গাপুজো। দেশের অন্যত্র বোধহয় বাঙালিরা এতটা জৌলুসহীন পুজো দেখছে না। মা দুর্গা ফিরে যাবেন তাঁর শ্বশুরবাড়ি, নিশ্চয়ই আগামী বছর আবার আসবেন। তবে রাজধানীবাসীর কাছে মায়ের এই আগমন ও নির্মগন পুজোর আনন্দের নিরিখে একটা বড়ো ঐতিহাসিক ক্ষত রেখে গেল।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

দিল্লির দুর্গাপুজোয় এ বার ‘উৎসব’ নেই, নেই জৌলুস     

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.