black durga of beleghata bhattacharya family
বেলেঘাটার ভট্টাচার্য পরিবারের কালো দুর্গা। নিজস্ব চিত্র।
tapan-mallick-chowdhury
তপন মল্লিক চৌধুরী

দুর্গা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক রণংদেহী মূর্তি। সে রূপে যেমন থাকে তেজ, তেমনই থাকে সৌন্দর্য। আর দেবী দুর্গার গায়ের রঙ? সে-ও তো উজ্জ্বল বাসন্তী রং, না হলে গোলাপি। কিন্তু দেবী দুর্গার গায়ের রং কালো কি ভাবা যায়? আমার আপনার ভাবা দিয়ে কী আসে যায়। বিশ্বাস যদি না হয় তো চলে আসুন বেলেঘাটার ভট্টাচার্য বাড়িতে। ইএম বাইপাস থেকে বেলেঘাটার দিকে যেতে বাঁ হাতে পড়বে ধীরেন চারু স্মৃতি সংঘ-এর মাতৃ আরাধনা। তার থেকে আর একটু এগিয়ে গেলেই বাঁ দিকে – ১/২ পি/১বি, রামকৃষ্ণ নস্কর লেন, কলকাতা – ৭০০ ০১০; এই ঠিকানায় এখনকার ভট্টাচার্য পরিবার। সেখানেই মিলবে দেবীর এমন রূপের।

প্রায় ২৯০ বছরের পারিবারিক দুর্গাপুজো। তবে তা শুরু হয়েছিল অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলার স্থলবসন্তপুর অঞ্চলে। এখন সেই গ্রাম পদ্মার গ্রাসে চলে গিয়েছে। নাটোরের রানি ভবানীর আমলের হরিদেব ভট্টাচার্য প্রথম বার এই পারিবারিক দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। আদতে তিনি ছিলেন নদিয়া জেলার বাসিন্দা। নাটোরের রানিমা তাঁকে জমি প্রদান করেন। এবং হরিদেব হয়ে যান স্থলবসন্তপুরের জমিদার। প্রসঙ্গত, দুর্গাপুজো শুরুর অনেক আগে থেকেই এই ভট্টাচার্য পরিবারে মা কালীর পুজো হয়ে আসছিল। হরিদেব ভট্টাচার্য নিজেও ছিলেন কালীভক্ত। কিন্তু তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হন এবং দুর্গা আরাধনা শুরু করেন। মা দুর্গা নাকি স্বপ্নে আদেশ দিয়েছিলেন কালো দুর্গামূর্তির পুজো করতে। স্বপ্নাদেশ পেলেও পণ্ডিত হরিদেবের এই রূপ অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। অনেকে অনেক বিধান দেন। কোনোটিই তাঁর মনঃপুত হয়নি। বেনারসে গঙ্গার ঘাটে এক গ্রীষ্মের দুপুরে এক সাধুর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। কথায় কথায় সাধু তাঁকে বলেন, দুর্গার এই রূপের ব্যখ্যা রয়েছে চণ্ডীতে। সেখানে তিনি ভদ্রকালী।

সেই শুরু। তার পর এতগুলি বছর পেরিয়ে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে ভট্টাচার্যদের অভিনব রূপের দুর্গাপুজো। সপ্তসিন্ধু ছাড়া পুজোয় অন্য জল ব্যবহার করা হয় না। সাত নদীর আসল জল প্রত্যেক বছর সংগ্রহ করে রাখা হয়। সেই জলেই হয় পুজো। ও-পার বাংলার পুজো এ-পার বাংলায় এলেও নিয়ম নীতিতে কোনো ভাটা পড়েনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং পুজোও ছড়িয়ে গিয়েছে পরিবারের মধ্যে। বর্তমানে ভট্টাচার্য পরিবারের একটি শাখার পুজো এগিয়ে নিয়ে চলেছেন কৃষ্ণাদেবী। অন্য একটি পুজো হয় তাঁরই জ্যাঠামশাইয়ের বাড়িতে। কালীঘাটের পটুয়াপাড়া অঞ্চলে রয়েছে ভট্টাচার্য পরিবারের দয়াময়ী কালী মন্দির, যেখানে নিত্যপুজোর আয়োজন রয়েছে। এক সময় নিজেদের বাড়িতেই আয়োজন করা হত মাতৃবন্দনার। কিন্ত এখন তা হয় অ্যাপার্টমেন্টের নীচেই। পুজো হয় তন্ত্রমতে। দেবী দুর্গার গায়ের রং কালো হলেও চার ছেলেমেয়ের গায়ের রঙ স্বাভাবিক। মহিষাসুর সবুজ রঙের। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক আর গণেশের অবস্থানও আলাদা। মায়ের ডান পাশে থাকেন লক্ষ্মী ও কার্তিক। বাম পাশে থাকেন দেবী সরস্বতী এবং গণেশ। ভট্টাচার্যদের নিজেদের বাড়িতে যখন পুজো হত তখন মোষ বলি হত। জায়গার অভাব। তাই বছর কুড়ি হল তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে পুজোর চার দিনই চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। মাকে দেওয়া হয় অন্ন ভোগ।

আরও পড়ুন দুই বাংলার নানা পরিবারে লালদুর্গার আরাধনা

পাবনা থেকে ১৯৪৭ সালে আসানসোল চলে আসে ভট্টাচার্য পরিবার। সেখানেই পুজো হত। তার পর স্থান পরিবর্তন করে কখনও দুর্গাপুর, কখনও সল্টলেকে তাদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে পুজো হয়েছে। বছর পনেরো ধরে বেলেঘাটার রামকৃষ্ণ নস্কর লেনের ফ্ল্যাট বাড়ির নীচে ফাঁকা জায়গায় পুজো হচ্ছে। স্বাধীনতা, দেশ ভাগ বহু কাল আগেই হয়েছে। সমাজে বহু পরিবর্তনও হয়েছে। কিন্তু এই পুজোয় কোনো দিনই কোনো বাধা পড়েনি। হরিদেব ভট্টাচার্য কালো দুর্গা আরাধনা শুরু করেছিলেন, সেই ঐতিহ্য পদ্মা পেরিয়ে এখন বইছে গঙ্গা তীরেও।

ক্যানিং ভট্টাচার্য পরিবারে

black durga of canning bhattacharya family
ক্যানিং-এর ভট্টাচার্য পরিবারের কালো দুর্গা। নিজস্ব চিত্র।

কেবল কলকাতার বেলেঘাটা অঞ্চলের ভট্টাচার্য পরিবারেই নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং এলাকাতেও কালো দুর্গার পুজো হচ্ছে ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে, সে-ও আরেক ভট্টাচার্য পরিবারে। সে বাড়ির দুর্গার রূপও ভিন্ন এবং মুখের রং কালো। গোটা শরীর ঝলসানো তামাটে রঙের। দেবী দুর্গা নাকি এ বাড়িতে এমন পোড়া মুখেই পূজিত হতে চেয়েছিলেন। প্রায় ৪৩১ বছর আগে এই পুজো শুরু হয়েছিল ঢাকার বিক্রমপুরের বাইনখাঁড়া গ্রামে। এখন আর ওই পুজোয় সেই আড়ম্বর নেই ঠিকই তবে বনেদিয়ানাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। বাইনখাঁড়া গ্রামে পুজো শুরু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই অঘটন। পরিবারের বর্তমান সদস্যদের কথা অনুযায়ী, তখন দুর্গামন্দিরের পাশে ছিল মনসামন্দির। পুরোহিত মনসা পুজো সেরে দুর্গাপুজো করতে এলে একটি কাক সে সময় উড়ে এসে বসে। এর পরই কাকটি মনসামন্দিরের ঘিয়ের প্রদীপের সলতে নিয়ে উড়ে যায়। কিন্তু কোনো ভাবে সেটি দুর্গামন্দিরের শনের চালে পড়ে যায়। আর তাতেই পুড়ে যায় দুর্গামন্দির ও প্রতিমা। পুজোর মধ্যে এমন ঘটনায় বাড়ির প্রবীণরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। পরিবারের সদস্যরা মনে করেছিলেন দেবী হয়তো পুজো আর চাইছেন না। এই ভেবে বন্ধ রাখা হয় পুজো। এর পরই ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেয়। এক রাতে স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন পরিবারের তৎকালীন গৃহকর্তা রামকান্ত ভট্টাচার্য। জানা যায়, দেবী স্বপ্নাদেশে বলেছিলেন, তাঁর পুজো কোনো ভাবেই বন্ধ করা যাবে না। ওই পোড়া রূপেই যেন তিনি পুজো পান। দেবীর আদেশ পাওয়ার পর থেকে মহামায়ার পোড়া মুখ ও ঝলসানো শরীরের মূর্তিতেই চলে আসছে মাতৃ আরাধনা। দেবীর মূর্তির কারণেই অন্যান্য পুজোর তুলনায় এই বাড়ির পুজো স্বতন্ত্র। দেবীর সারা শরীর ঝলসানো, তাম্রবর্ণ।

আরও পড়ুন নীলদুর্গা পুজো হয় একমাত্র কৃষ্ণনগরের চট্টোপাধ্যায় পরিবারে

শুধু পোড়া রং নয়, দেবীর স্বপ্নাদেশে আরও বৈচিত্র্য রয়েছে এ বাড়ির মূর্তিতে। এখানে দেবী দুর্গার পাশাপাশি তাঁর ছেলেমেয়েদের অবস্থানও বেশ আলাদা। ভট্টাচার্যবাড়িতে গণেশ মায়ের ডান নয়, বাম দিকে থাকেন। আর ডান দিকে থাকেন কার্তিক। কার্তিকের ঠিক পাশেই থাকে নবপত্রিকা। এ ছাড়া এ বাড়ির দুর্গাপুজোয় যে ধ্যান হয় তা সাধারণত দুর্গাপুজোয় যে নিয়মে ধ্যান হয় তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পুড়ে যাওয়া মূর্তির মতো অনেক অলৌকিক ঘটনাও রয়েছে এই বাড়ি ঘিরে। বর্তমান সদস্যদের কথামতো, বেশ কয়েক বছর আগে পুজোর সময় প্রবল ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল। আঁধার নেমে এসেছিল মণ্ডপে। কিন্তু যে কোনো ভাবে হোক, ভট্টাচার্যবাড়িতে চলে এসেছিল বিদ্যুৎ। যার ব্যাখ্যা সরল ভাবে করা যায় না। এখন আর পাঁচটা বাড়ির পুজোর মতো আর্থিক কারণে কিছুটা আড়ম্বর কমেছে। সেই ঘাটতি নিষ্ঠা দিয়েই মেটান বর্তমান পরিবারের সদস্যরা। যে আন্তরিকতার টানে শুধু এলাকার বাসিন্দারা নন, দূরের মানুষ এই পুজোয় আসেন। ঢাকায় যে কাঠামোয় পুজো হত, এখনও সে ভাবে একচালা মূর্তিতে পুজো হচ্ছে। আগে মোষ বলি দেওয়া হত এখন আর সে সব হয় না। নিয়ম রক্ষার জন্য চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। মহানবমীতে হয় শত্রু বলি। আতপ চাল দিয়ে কাল্পনিক মানুষের মূর্তি বানিয়ে তাকে বধ করা হয়। এ ভাবেই ঐতিহ্য আর বনেদিয়ানা যেমন রক্ষা পাচ্ছে পাশপাশি সমান্তরালে চলছে নিয়মনীতি মেনে বাড়ির পুজো।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন