mother of lord ganesh
গণেশজননী।
tapan-mallick-chowdhury
তপন মল্লিক চৌধুরী

সরস্বতী রূপে তিনি বিদ্যা, লক্ষ্মী রূপে তিনি সৌভাগ্য, দুর্গা রূপে তিনি শক্তি। তাঁর অনেক রূপের মতো তাঁর নামের মধ্যেও রয়েছে অনেক গভীর অর্থ। দুর্গা শব্দটির ‘দ’-এর অর্থ অসুরনাশিনী, ‘উ’-এর অর্থ বিঘ্ননাশিনী, ‘রেফ’-এর অর্থ তিনি ব্যাধিনিবারণী, ‘গ’-এর অর্থ তিনি অশুভর নাশক এবং ‘আ’-এর অর্থ তিনি অভয়দাত্রী। এই বঙ্গের দুর্গাপুজোয় তিনি অনেক জায়গাতেই নানা রূপে পূজিতা হয়ে আসছেন বেশ কিছু কাল ধরে। তবে বিচিত্র রঙ ও রূপের দুর্গার অধিকাংশের দেখা মেলে প্রাচীন রাজবাড়ি থেকে শুরু করে জমিদার বা বনেদিবাড়ির পুজোগুলিতে। দুর্গা যেমন স্থূলা, ব্যক্তরূপা ও সাকারা তেমনই তিনি বিশ্বরক্ষার জন্য কখনও দশভুজা, কখনও চতুর্ভুজা, কখনও আবার দ্বিভুজা। লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিক-সহ ওই দ্বিভুজা দেবীর কোলে যখন গণেশ থাকেন তখন তিনি গণেশজননী।

দেবীমূর্তি এখানে রণচণ্ডী নয় বরং স্নেহশীলা মা। দেবী দুর্গা বড়ো ছেলে গণেশকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এক হাতে ধরে রয়েছেন গণেশকে অন্য হাতে বরাভয় মূদ্রা। দেবী যে হেতু শান্তির দূত, তাই এখানে দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র দেব-সেনাপতি কার্তিকের ঠাঁই হয়নি। ঠাঁই জোটেনি অসুরেরও। এমনই রূপে দেবী দুর্গার পুজো হয় উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের ধরবাড়িতে। লোকমুখে তাই এই পুজোর নাম গণেশজননী পুজো।

সাম্প্রতিক কালের কথা নয়, ধরবাড়ির পুজোর ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরের। কেবল তা-ই নয়, ধরবাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনাও এই বাংলায় নয়। এক সময় এই ধর পরিবারের বাস ছিল ও-পার বাংলায়। তখন তাঁদের পূর্বপুরুষরা এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ধর পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম।

mother of ganesh of dhar family
ধর পরিবারের গণেশজননী।

ধর পরিপারের প্রায় তিনশো বছরের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যে কোনো ভাটা পড়েনি। দেশভাগ থেকে শুরু করে বহু ঝড় বয়ে গিয়েছে সাবেক বাংলার ধর পরিবারের উপর দিয়ে। স্বাধীনতা, বিভাজন, দাঙ্গা, একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ধর পরিবারের আত্মীয় পরিজনেরা। তার ওপর বারবার বদল হয়েছে ঠাঁই। কত প্রিয়জন এ-দিক ও-দিক ছিটকে গিয়েছেন। কিন্তু একটি বারের জন্যও ভাটা পড়েনি পুজোয়। ধর পরিবারের দুর্গা শান্তির দেবী রূপে পূজিতা হন। পুজোর মুখে দেশের আকাশে যখন যুদ্ধের দামামা, তখন ধরবাড়ির দ্বিভুজা দেবী শান্তির আগমনবার্তা বয়ে আনেন বলে মনে করেন ধর পরিবারের সদস্যরা। তাই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েও পুজো সম্পন্ন করে ধর পরিবার।

আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর বা তারও আগে এই ধর পরিবারের পুর্বপুরুষদের বাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের চিত্রকোটে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, সেখানেই শুরু হয়েছিল এই পুজো। তাঁদের পরিবার সেখানে মুনশি পরিবার বলে পরিচিত ছিল। পরিবারের তৎকালীন কর্তা কাশীনাথ ধর এই পুজো শুরু করেছিলেন। তবে প্রথম দিককার পুজোয় রণরঙ্গিণী, অসুরনাশিণী দেবী দশভুজাই পূজিতা হতেন। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, ধর পরিবারকে বিক্রমপুরের বসবাস ছেড়ে নারায়ণগঞ্জে চলে যেতে হয়। দীর্ঘ দিনের চাষবাস এবং প্রতিষ্ঠা ছেড়ে যদি একটি বড়ো পরিবারকে আচমকা ঠাঁইনাড়া হতে হয়, তা হলে পরিবারের মূল ভিতে একটা ধাক্কা লাগে। আর তা সামাল দিতে সময় লাগে অনেক, মূল্যও দিতে হয়। ওই ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতে ফের সজোর আঘাত। সমস্ত কিছু টুকরো টুকরো করে দেয় দেশভাগ। ফের সাজানোগোছানো বসতি ছেড়ে, চেনাজানা হাটবাট ছেড়ে, আত্মীয়পরিজন ফেলে ধর পরিবারকে চলে আসতে হয়। এ বার একেবারে পদ্মাপার ছেড়ে কলকাতায়।

আরও পড়ুন শঙ্খচিল ওড়ে না, তোপ শুনে বলিও হয় না, তবু সোমসারের পালেদের জমিদারির স্মৃতি এই দুর্গাপুজোই

কলকাতায়ও তো ঠিকানা কখনও স্থায়ী হয়নি। কখনও ঢাকুরিয়া, কখনও হাজরা, কখনও আবার পার্ক সার্কাসের ঝাউতলা। কিন্তু ওই সব অস্থায়ী ঠিকানাতেও ধর পরিবারের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যে কোনো ছেদ পড়েনি। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন প্রতিবেশী পরিজন, সব ধরনের প্রতিকূলতা কাটিয়ে তাঁরা পারিবারিক পরম্পরা বজায় রেখেছিলেন। আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক কোনো অবস্থার সঙ্গেই আপস-বিবাদ না করে দীর্ঘকালের বাড়ির পুজো চালিয়ে গিয়েছেন। নিজের দেশ ছাড়তে হয়েছিল ১৯৪৯ সালে, সে বছরও তাঁরা পুজো করেছিলেন। তার পর থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত কলকাতায় ধর পরিবারের বিভিন্ন বাড়িতে পুজো হয়েছে। ১৯৭৬ সালে তাদের স্থায়ী ঠিকানা হয় উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে।

puja at chakdah
চাকদায় গণেশজননী।

শুরু থেকেই তো ধর পরিবারের দুর্গাপুজোর মূর্তি গণেশজননী ছিল না, কিন্তু কবে থেকে যে এই মুর্তির চল হল সেটা নিশ্চিত করে জানেন না বর্তমান প্রজন্ম। তবে পরিবারে বহুকাল ধরেই একটি ঘটনার কথা সবাই বলে থাকেন – দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার কাশীনাথ ধরের সময়েই এক বার পুজোয় ঘটে এক মহা বিপত্তি। তখন ধর পরিবারের পুজোয় ছাগবলি হত। সে বার বলির সময় একাধিক বার খড়্গ দিয়ে আঘাত করেও ছাগটির শরীর থেকে মুণ্ড আলাদা করা যাচ্ছিল না। এ রকম আশ্চর্য ঘটনা দেখে ধর্মভীরু কাশীনাথের মনে হয় বিপদ আসন্ন। তিনি তৎক্ষণাৎ ধ্যানে বসে মগ্ন হয়ে যান। সেই অবস্থায় তিনি নাকি দেবীর আদেশ শুনতে পান ছাগবলি বন্ধ করার। পুজো বন্ধ হয় না, কিন্তু দেবীর আদেশ আর কাশীনাথের নির্দেশে ধর পরিবারে বলি বন্ধ হয়।

দুর্ঘটনার সেই রাতেই কাশীনাথ নাকি দেবীর স্বপ্নাদেশও পেয়েছিলেন। স্বপ্নে তিনি বলেন, শক্তির দেবী রূপে তিনি আর ধরবাড়িতে পূজিতা হতে চান না। তাই রণচণ্ডী মূর্তির বদলে তাঁর মাতৃমূর্তির পুজো হোক। স্বপ্নাদেশের পর খুব চিন্তায় পড়ে যান কাশীনাথ। পুজার আচার-উপাচার যদিও স্বপ্নেই জেনেছিলেন তিনি, কিন্তু দেবীর মাতৃমূর্তির পুজোর যে কোনো চল নেই। তা ছাড়া মাতৃমূর্তির রূপই বা কেমন, তার মূর্তিই বা কেমন হবে, কোনো কিছুই জানা নেই কাশীনাথের। এ সব অজানা প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিত জানতে বুঝতে নিজের নায়েবকে কাশী পাঠান।

আরও পড়ুন যামিনী রায়ের বেলেতোড়ে দুর্গা আরাধনা

কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটে ধর পরিবারের নায়েব যখন বসেছিলেন, সেই সময় একটি ছোটো মেয়ে তাঁর হাত ধরে এক পূজারির কাছে নিয়ে যায়। তাঁর কাছ থেকে দেবীর মাতৃমূর্তির পুজোর বিষয়ে খুঁটিনাটি জেনে নেন নায়েব। সেই পূজারি কাশীনাথের নায়েবকে পূজাপাঠের জন্য একটি তালপাতার পুথিও উপহার দেন। সেই পুথি নিয়ে তিন মাস পর বাড়ি ফেরেন নায়েবমশাই। পরের বছর থেকেই ধরবাড়িতে শুরু হয় দেবীর মাতৃমূর্তির পুজো। তবে ঠিক কোন বছর থেকে ধর পরিবারে দেবীর মাতৃমূর্তির পুজোর প্রচলন, তা সঠিক ভাবে জানা যায় না। তবে কাশীনাথের আমলেই যে মাতৃমূর্তি পুজোর সুচনা হয়েছিল সেটা নিশ্চিত। আর সেই সময় থেকেই ধরবাড়ির দুর্গা দ্বিভূজা। সিংহের উপরই তাঁর অধিষ্ঠান। কোলে জ্যেষ্ঠ পুত্র গণেশ, এক পাশে লক্ষ্মী,  অন্য পাশে সরস্বতী এবং সামনে শিব ও তাঁর চেলা নন্দী – এই নিয়ে এক চালার মূর্তি। সেই ধারাই এখনও পর্যন্ত চলে আসছে।

ষষ্ঠী থেকে নিরামিষ আহার করেন ধর পরিবারের সদস্যরা তবে নবমীর দিন যজ্ঞের ফোঁটা নেওয়ার পর থেকে চলে আমিষ। দশমীর দিন বিসর্জনে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও প্রতিবেশীরা অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, দাবাড়ু, গ্র্যান্ডমাস্টার সহেলী ধর বড়ুয়া এই পরিবারের সদস্য। প্রতি বছরই স্বামী দিব্যেন্দু বড়ুয়াকে নিয়ে তিনি পুজোয় হাজির থাকেন অশোকনগরের বাড়িতে। পুজোকে কেন্দ্র করে প্রতি বারই পরিবারের সকলেই একত্রিত  হন। চার দিনই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

শুধু অশোকনগরের ধরবাড়ি কেন, এই বঙ্গের বেশ কিছু জায়গাতেই দুর্গাপুজোয় গণেশজননীর পুজো হয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন