pal house at somsar
সোমসার জমিদারবাড়ি। নিজস্ব চিত্র।
ইন্দ্রাণী সেন

বাঁকুড়া: রত্নগর্ভা ইন্দাসের দামোদর আর শালী নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত সোমসার। চাঁদ পাল ও নফর পাল নামে সোমসারের দুই যুবক জীবিকার সন্ধানে হাজির হয়েছিলেন কলকাতায়। ভাগ্যলক্ষ্মীর সুপ্রসন্নতায় অসীম কৃপাধন্য হয়েছিল এই দুই ব্যাক্তি। শুরু করেছিলেন কাপড়ের ব্যবসা। সুদূর ইংল্যান্ডের ম্যাঞ্চেষ্টারের সঙ্গে জাহাজে কাপড় আমদানি রফতানি হত। যার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে গঙ্গায় নির্মিত চাঁদ পাল ঘাট।

ভাগ্যলক্ষ্মীর কৃপা লাভ করে চাঁদ ও নফর নিজভূম সোমসার গ্রামে কিনেছিলেন কয়েকশো বিঘার সম্পত্তি। একই সঙ্গে ত্রিশ বিঘা জমির উপর তৈরি করেছিলেন রাজপ্রাসাদ সম জমিদারবাড়ি, যা ইন্দাসের অন্যতম দর্শনীয়। ঐতিহ্য, আভিজাত্য, সম্পদের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধিতে তাঁরা সূচনা করেন দুর্গাপুজোর। পুজো শুরুর পুরো তথ্য ওই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যদের অজানা। তবে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেল, ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে যখন পাল পরিবারের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল তখন থেকেই দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়।

আরও পড়ুন দারাপুরের রায়বাড়ির সাড়ে তিনশো বছরের পুজোর বিশেষত্ব চালতার চাটনি

জমিদারি প্রথার বিলোপের সঙ্গে সঙ্গেই বহু জমিদার পরিবারের মতোই পাল পরিবারের সেই গৌরবও অস্ত গেল। টিকে থাকল শুধু  বনেদিয়ানা। সেই বনেদিয়ানাতে ভর করেই দুর্গাপূজার সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্য কোনো রকমে বহন করে চলেছেন বর্তমান বংশধরেরা।

this years durga idol
এ বারের দুর্গা প্রতিমা। নিজস্ব চিত্র।

উল্লেখ্য, সোমেশ্বর শিবের নাম থেকে গ্রামের নাম সোমসার। এই সোমসারেরই ভূমিপুত্র রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দ্বাদশ সংঘাধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী ভূতেশানন্দজি। এই সোমসার জমিদারবাড়ির নোনাধরা খসে পড়া চুনসুরকির দেওয়ালে কান পাতলে আজও ভেসে ওঠে জমিদারবাড়ির অন্দর মহলের বৈচিত্র্যময় জীবনের নানা দৃশ্য। আলোর রোশনাই, নহবতের সুর, শৌখিন যাত্রা, পুতুলনাচ আর কবিগানের আসরে জমজমাট পুজোমণ্ডপ। পুজোর ঠিক আগে এখানকার প্রজাদের জন্য সরাসরি কলকাতা থেকে জলপথে কাপড় বোঝাই বজরা এসে থামল সোমসার ঘাটে। এলাকার জমিদারবাবু দু’ হাত ভরে প্রজাদের মধ্যে বিলি করছেন নতুন জামাকাপড়। হিন্দু, মুসলিম, জাতি-ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে পাতপেড়ে পুজোর প্রসাদ খাচ্ছেন।

কথাগুলো বলতে বলতে চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল জমিদারবাড়ির বর্তমান প্রজন্মের সদস্য উদয় পাল, শ্যামসুন্দর দে-র। ওঁদের কথায়, “আমাদের ছোটো বয়সেও পুজোর যে জাঁকজমক দেখেছি এখন তা অনেকটাই কমে গিয়েছে। তবুও কষ্টের মধ্যেও নানান প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে এখনও আমরা পুজো চালিয়ে যাচ্ছি”, বলেন উদয়বাবু। তিনি বলেন, আজ তো সব ইতিহাস। নেই কাপড়ের সেই ব্যবসা, নেই জমিদারিও। অতীতের সেই জমিদারির সাক্ষ্য বহন করছে এই পুরোনো ভাঙা জমিদারবাড়ি।

আরও পড়ুন যামিনী রায়ের বেলেতোড়ে দুর্গা আরাধনা

এত সবের পরেও পারিবারিক ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছেন সোমসারের জমিদারবাড়ির সদস্যরা। তখনও ব্যবসার প্রয়োজনে যে যেখানেই থাকুন না কেন, দুর্গাপুজোর সময় সবাই সোমসারে ঠিক পৌঁছে যেতেন। পুজোর চার দিন সবাই এই বাড়িতে জড়ো হতেন। সেই ধারাবাহিকতা মেনে বর্তমান প্রজন্মও কর্মসূত্রে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, পুজোর দিনগুলিতে ঠিক বাড়িতে উপস্থিত হন। অষ্টমী ও নবমীর দিন নিয়ম মেনে মাসকলাই বলি দেওয়া হয়। তবে শঙ্খচিল ওড়ানোর প্রথা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বর্ধমান রাজবাড়ির সর্বমঙ্গলা মন্দিরের তোপধ্বনি শুনে যে বলিদান হত, সেই প্রথাও কালের গর্ভে বিলীন। তবে জমিদারি রক্তের ফল্গুধারা চির প্রবহমান জমিদারবাড়ির অন্দরমহলে।

2 মন্তব্য

  1. বেশ মরশুমউপযোগী প্রতিবেদন। তবে কিছুক্ষেত্রে তথ্যসূত্র যোগ করা বাঞ্ছনীয় পাঠাকমনে ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

  2. আসলে প্রতিবেদনটি পাল পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের উদয় পাল এবং তাদের আত্মীয় শ্যামসুন্দর দে-র সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত। অন্য কোনো গ্রন্থ বা নিবন্ধ থেকে আহৃত নয়। খবর অনলাইন পড়ার জন্য ধন্যবাদ। পাশে থাকুন, পরামর্শ দিন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন