titas_paulতিতাস পাল, জলপাইগুড়ি

শুধু পুজোর প্রাচীনত্ব নয়, সেই সঙ্গে নিজস্ব শারদপত্রিকার গৌরব ধরে রেখে ২০৯ বছরে পড়ল জলপাইগুড়ির নিয়োগী বাড়ির দুর্গাপুজো। 

পূর্বপুরুষের হাত ধরে শুরুটা হয়েছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের পাটগ্রামে। সেটা ১৮০৮ সাল। জমিদার পরিবার না হলেও স্বচ্ছলতার অভাব ছিল না। বেশ ধুমধামের সঙ্গেই হত দশভুজার আরাধনা। পুজোর পাঁচ দিন সেই বাড়িতেই দু’বেলা পাত পড়ত পাড়াপড়শিদের। এরই মাঝে দেশ ভাগ। ১৯৫২ সালে গোটা নিয়োগী পরিবার চলে আসে কলকাতায়। কিন্তু দেবীর আরাধনায় ভাটা পড়েনি। ভবানীপুরে প্রিয়নাথ মল্লিক লেনের বাড়িতে শুরু হয় দুর্গোৎসব। যদিও ফের স্থানান্তর ১৯৬৭ সালে। এবার জলপাইগুড়ি শহরের কামারপাড়ায় পাকাপাকি বসবাস শুরু করে নিয়োগী পরিবার। আত্মীয়-শরিক মিলিয়ে ৫২ জনের বিশাল যৌথ পরিবার, যা আজকাল প্রায় বিলুপ্তির পথে। জলপাইগুড়িতে বসবাস শুরু করার পর বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন বাড়ির পুরুষেরা। এরপরই হয় পট পরিবর্তন। বাড়ির পুজোর সমস্ত দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন বাড়ির মহিলারা। তারপর থেকে ধারাবাহিক ভাবে বাড়ির দশভুজাদের হাত ধরেই হয়ে চলেছে নিয়োগীবাড়ির ‘দশভুজা’র আরাধনা। কর্মসূত্রে পরিবার নিয়ে প্রবাসী। তবে পুজোর সময় অন্তত একবার পৈতৃক ভিটেতে আসার চেষ্টা করেন তারা। 

বনেদি পরিবার তাই পুজোর নিয়ম-কানুনেও যথেষ্ট কড়াকড়ি। শুরু থেকে যে নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গে শুরু হয়েছিল পুজো, সে সব নিয়ম এখনও একই রকম ভাবে চলে আসছে। দেবীপ্রতিমার রঙ অতসী ফুলের মতো। মায়ের বাঁ দিকে গণেশ ও সরস্বতী, ডান দিকে লক্ষ্মী ও কার্তিক অবস্থান করে। এ বাড়ির পুজোয় দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। তার বদলে লুচি-পায়েস, ফল-মিষ্টি ভোগে থাকে। রয়েছে শত্রুবলির প্রথা। কলা গাছের থোড় কেটে চালের গুঁড়ো দিয়ে মানুষের প্রতিকৃতি বানানো হয়। তার গালে চুন-হলুদ, কালি মাখিয়ে বলি দিয়ে বাড়ির বাইরে ছুড়ে ফেলেন নিয়োগী পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য। মহালয়ার পরদিন নাটমণ্ডপে ঘট বসে। পঞ্চমীর দিন হয় মনসাপুজো, সপ্তমী ও অষ্টমীর অর্ধরাতে হয় কালীপুজো। নবমীর দিন পাড়ার সকলে একসঙ্গে পাত পেড়ে ভূরিভোজ। দশমীর দিন বাড়ির এবং পাড়ার মেয়ে-বউদের সিঁদুরখেলায় রেঙে ওঠে গোটা বাড়ি। 

niyogi-1এই পরিবারের বনেদিয়ানার সবচেয়ে বড় প্রমাণ নিজস্ব  শারদপত্রিকা। বাংলাদেশে পুজোর সময়ই কোনো এক পুর্বপুরুষের হাত শুরু হয়েছিল ‘ঘরোয়া’ নামের পত্রিকা। সেই সময় পরিবারের সদস্যদের হাতেই লেখা হত পত্রিকার জন্য ছড়া, গল্প, কবিতা। দেশত্যাগের পর দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল পত্রিকা প্রকাশ। জলপাইগুড়ির বাড়িতে পুজো শুরু হওয়ার পর ফের পত্রিকা প্রকাশ শুরু হয়। নাম পালটে রাখা হয় ‘জ্যোতি’। হাতে লেখার বদলে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হতে থাকে পারিবারিক এই শারদ-পত্রিকা। এখন এই পত্রিকা সম্পাদনার  দায়িত্ব বর্তেছে প্রবীণ প্রজন্মের শ্যামশ্রী নিয়োগী ও এই প্রজন্মের সেমন্তী নিয়োগীর ওপর। এবছরও নবমীর দিন প্রকাশিত হবে পত্রিকা। প্রবাসী যাঁরা আসতে পারছেন না পুজোয়, তাঁরাও লেখা পাঠিয়েছেন। পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার পর পরিবারের প্রবাসী সদস্যদের কাছেও পৌঁছে যাবে তা। 

যৌথ পরিবারের বনেদিয়ানা, নিজস্ব শারদপত্রিকার ঐতিহ্য, পুজোর নজরকাড়া নিয়মনিষ্ঠা — সব মিলিয়ে পুজোর আনন্দে মাতোয়ারা জলপাইগুড়ির নিয়োগী পরিবার।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here