পায়েল সামন্ত

ইদানীংকালে শহর ও শহরতলিতে থিম পুজোর জয়জয়কার হয়েছে। বাঁশের বন, ধানের গোলা, ঢেঁকি থেকে শুরু করে মিশরীয় মমি, প্যাগোডা, আইসিস জঙ্গী — সবই সেখানে ঠাঁই পাচ্ছে। মা দুর্গাও ‘নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান’ মতাদর্শে সে সব জায়গায় আবির্ভূত হচ্ছেন। এ সব থেকে দূরে একটু অন্য রকম পুজোর সন্ধানে এ বার বেরিয়ে পড়তে পারেন হুগলির আঁটপুরে।

এক সময় হাওড়া ময়দান থেকে মার্টিন কোম্পানির রেলে আঁটপুর স্টেশনে নামা যেত। এখন আর সে সব নেই। এখন আপনাকে হাওড়া থেকে তারকেশ্বর লাইনে হরিপাল রেলস্টেশনে আসতে হবে। অতঃপর সেখান থেকে অটোতে আঁটপুর। খুব কষ্টসাধ্য নয় এই আসাটা। মাত্র ৪৫ কিলোমিটারের দূরত্ব তো।

বাংলা গল্প ছাড়া চণ্ডীমণ্ডপের হদিস বড়ো একটা মেলে না। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের প্রভাবে চণ্ডীমণ্ডপ কালক্রমে জমিদারবাড়ি বা বর্ধিষ্ণু বাড়ির মানচি্ত্র থেকে হারিয়ে গিয়েছে। সেই হারিয়ে যাওয়া স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে দুর্গাপুজোর স্বাদ নিতে আপনাকে আসতেই হবে আঁটপুরে।

আঠারো শতকের শেষের দিকে তৈরি হয়েছিল আঁটপুরের মিত্রবাড়ির বিশাল চণ্ডীমণ্ডপ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেরিটেজ হিসেবে গণ্য এই চণ্ডীমণ্ডপ কাঁঠালকাঠের তৈরি, দেখতে উলটোনো নৌকার মতো। কাঁঠালকাঠের উপর সেই কবেকার ভাস্কর্য আর প্রাচীন দোচালা খড়ের ছাদ আপনাকে বিস্ময়ে মূক করে দেবে। পুজোর কয়েকটা দিন এখানেই একচালার সাবেক দুর্গাপ্রতিমার উপস্থিতি টেনে আনে দূরদূরান্তের দর্শক।

শহুরে থিমের মতো মনে হলেও এই চণ্ডীমণ্ডপের কোনোটাই আজকের তৈরি নয়। বাংলার প্রাচীন কাঠ খোদাইয়ের অতুলনীয় নির্দশনটি আঠারো শতকের শেষের দিকে তৈরি। দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল অবশ্য তারও আগে, ১৬৮৩ সালে। তখন অন্যত্র এই পুজো হত।

এ বার এই পুজো ৩৩৫ বছরে পড়ল। প্রতি বছরের মতোই এ বারও জন্মাষ্টমীর দিনে প্রতিমা নির্মাণ শুরু হয়েছে। শোলার সাজে সজ্জিত দেবীর বোধন দিয়েই শুরু হবে এই পুজো। আজও এখানে কুমারীপুজোর রেওয়াজ চলে আসছে। পুজোর যাবতীয় ব্যয় বহন করে এই বাড়ির কৃতী পুরুষ কৃষ্ণরাম মিত্রের দেবোত্তর সম্পত্তি। কৃষ্ণরাম মিত্রের আমলে ছিল জমিদারি প্রথা। তাই সে অনুপাতেই ধুমধাম চলত। তখন গানবাজনার আসর থেকে এলাহি খাওয়াদাওয়া, সবই চলত। পরবর্তীকালে জমিদারি প্রথা লোপ পাওয়ার সময় থেকে এ সব আর কিছুই হয় না। তা-ও সাত-আট বছর গানবাজনার অনুষ্ঠান পালা করে চলেছে। মিত্রবাড়ির সদস্য মৃত্যুঞ্জয় মিত্র খবর অনলাইনকে জানালেন, অন্নভোগের রেওয়াজ এখানে নেই। দেবীকে চাল, ফলের নৈবেদ্যর পাশে লুচিভাজা ও মিষ্টান্ন ভোগ নিবেদন করা হয়। এখন দেবোত্তর এস্টেট ‘মিত্র সংঘ’-এর বাৎসরিক চাঁদা দিয়ে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হয়। বাড়ির লোকেরা ছাড়াও সেখানে সেবাইতরাও যোগ দেন।

জমিদারির সে প্রহর আর নেই। সে সময়ে কাঁঠালকাঠের চণ্ডীমণ্ডপের পাশেই ছিল কাঁঠালকাঠের নাটমন্দির। ঝড়ে সেটা নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে কাঠের নাটমন্দির তৈরি করা যায়নি। এখনকার নাটমন্দিরে বসেই খরচখরচার ব্যাপারে মৃত্যুঞ্জয় মিত্র বললেন, “দুর্গাপুজোটা সাধ্যমতো চালানোর চেষ্টা চলে। আগে জমিদারি আমলে তিরিশ-চল্লিশ হাজার টাকা খরচ হত। এখন সেটা লাখ ছুঁয়েছে।”

সময়ের প্রভাবে গ্রামবাংলার অনেক পুজো এখন আধুনিকতার খপ্পরে। তবুও এরই মধ্যে বংশ পরম্পরায় শিল্পী এসে মিত্রবাড়ির প্রতিমা গড়েন। বিসর্জনের রীতিতেও ষোলোয়ানা সাবেকিয়ানা বহাল রয়েছে। পুজোয় আজও মিশে আছে আভিজাত্য, বনেদিয়ানা আর ইতিহাস।

আরও পড়ুন: নাকতলা উদয়ন সংঘের এ বারের থিম ‘জীবন মৃত্যু’ 

অনেকেই হয়তো জানেন, স্বামী বিবেকানন্দের গুরুভাই স্বামী প্রেমানন্দ ওরফে বাবুরাম ঘোষের জন্মস্থান এই আঁটপুর। এই বাবুরাম ঘোষের দুর্গাবাড়ির দুর্গাপুজোও আপনি দেখে আসতে পারেন। এই বাড়িতেই স্বামী বিবেকানন্দ-সহ নয় গুরুভাই প্রজ্জ্বলিত ধুনির লেলিহান শিখায় সন্ন্যাসগ্রহণের সংকল্প নিয়েছিলেন। এখানে এলে ইতিহাস ছুঁয়ে দেখার পাশাপাশি রামকৃষ্ণ মিশনের আধ্যাত্মিক পরিবেশে পাবেন দুর্গাপুজোর অন্য স্বাদ।

আর মন্দিরময় আঁটপুরে এলে দেখতে ভুলবেন না মিত্রদের রাধাগোবিন্দের ১০০ ফুট উঁচু টেরাকোটার মন্দিরটি। শহরের কোনো দুর্দান্ত থিমের বদলে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রসিদ্ধ টেরাকোটার এমন অতুলনীয় নির্দশন দেখাটাই হয়তো আপনার কাছে এ বার পুজোর সেরা উপহার হতে পারে!

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here