puja is going on
পূজা চলছে।
ডঃ অশোক কুমার ঘোষ

হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুর থানার অন্তর্গত রাজাপুর চাউলীপাড়া গ্রামে ঘোষবাড়ির দুর্গাপূজার দ্বিতীয় ইনিংস চলছে। এই বছর ৯৩তম বৎসর। প্রথম ইনিংসের হিসাব পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয় ইনিংসের প্রারম্ভিক জুটি, ভ্রাতৃদ্বয় নগেন্দ্রনাথ ঘোষ এবং কানাইলাল ঘোষ। দুই ভাই উচ্চাশা নিয়ে কলকাতায় ব্যবসা শুরু করেন এবং সাফল্যলাভের কামনায় মনস্থির করেন মহামায়ার পূজা করবেন। উৎসাহ জোগান গ্রামের তৎকালীন গুরুমশাই। পূজার সামগ্রী বোঝাই করা হল নৌকায়, যাত্রা শুরু হল জগন্নাথ ঘাট থেকে, শেষ হল দামোদর নদের জয়নগর ঘাটে। সেই সময় ভাড়া ছিল ১৫ টাকা। বাংলা ১৩৩৩ সালে (১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ) দুর্গাপূজার দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হল।

আরও পড়ুন বাঁকুড়ার দিগতোড়ের ক্ষত্রিয় ষোলোআনা দুর্গাপুজোর এ বার ১২৫ বছর

প্রারম্ভিক পূজার পুরোহিত ছিলেন তৎকালীন পারিবারিক পুরোহিতের ভ্রাতুষ্পুত্র, শ্যামবাজার নিবাসী অধ্যাপক তারাপদ ভট্টাচার্য, ডবল এমএ। ঠাকুরদালান ছিল মাটির দেওয়াল এবং খড়ের ছাউনি। পূজার জন্য সামগ্রিক ভাবে খরচ হয়েছিল ৩০০ টাকা। পরবর্তী কালে পাথুরিয়াঘাটের রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম এবং বেলুড় মঠের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগের কারণে পূজার নির্ঘণ্ট বদল করে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে পূজা শুরু করা হয়। তবে কুমারীপূজা নবমী তিথিতেই হয়।

puja of structure
এ বছরের কাঠামো পূজা।

শুধুমাত্র ব্যবহারিক অবক্ষয়ের কারণে অনিবার্য ভাবে কিছু মেরামতি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিমার কাঠামো প্রথম থেকে একই আছে। একচালা প্রতিমা, দেবদেবী চিত্রিত চালচিত্র, সবুজ বর্ণের মহিষাসুর। প্রতিমাশিল্পী বংশপরম্পরায় বহমান। জন্মাষ্টমীর দিন প্রতিমার কাঠামোপূজার শেষে দেবীর (কাঠামো) পদযুগলে মৃত্তিকা লেপন করেন প্রতিমাশিল্পী। ওই মৃত্তিকা আহরণ করা হয় আমাদের গ্রামে ঢোকার মুখের রাস্তা থেকে। এই প্রথায় এটাই বোঝাতে চাওয়া হয় যে, গ্রামের প্রবেশপথের মৃত্তিকা চরণে মেখেই দেবী তাঁর আগমন সূচনা করেন।

puja ritual going on
পুষ্পাঞ্জলি প্রদান।

বর্তমানের পূজামণ্ডপ মার্বেল নির্মিত এবং জমি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু। মূল পূজাবেদির দুই প্রান্তে গ্রিনরুমের আদলে ঘর আছে। ওই ঘর দু’টিতে পূজার সামগ্রী রাখা হয়। বেদির সামনের দালানে দর্শনার্থীরা সমবেত হন পুষ্পাঞ্জলির সময়। পূজামণ্ডপের সামনে আটচালায় বসে দর্শনার্থীরা পূজা–আরতি দর্শন করেন। সাত্ত্বিক আচার মেনে উপবাসে থেকে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা এবং পুরোহিতমশাইরা পূজা সম্পন্ন করেন। পূজার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কাজ পরিবারের সদস্যরা সম্পন্ন করেন।

puja ritual in ghosh family
ধুনোপোড়া অনুষ্ঠান।

পুরোহিতমশাইদের সাহায্যে কুমারীপূজা করেন পরিবারের বধুরাই। ধুনোপোড়া অনুষ্ঠানের পর ধুম লেগে যায় কোলে বসে পুণ্য লাভ করার জন্য। হাসির রোল ওঠে যখন যুবক-যুবতী পুত্র-কন্যারাও এতে শামিল হয়। দেবীর স্নানসামগ্রীর মধ্যে তীর্থ-মৃত্তিকা এবং পুণ্য বারি সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন তীর্থস্থান থেকে। এ বছর তীর্থ-মৃত্তিকা এসেছে কেদারনাথ ও মণিমহেশ থেকে, নদীর জল এসেছে রুদ্রপ্রয়াগ (অলকানন্দা ও মন্দাকিনীর সঙ্গমস্থল) ও হরিদ্বার থেকে এবং সরোবরের জল এসেছে মানস সরোবর থেকে।

another puja ritual
কুমারী পূজা।

বছর চল্লিশেক আগে পর্যন্ত পূজার শেষে দু’ দিনব্যাপী মনসামঙ্গল পালাগানের আসর বসত আটচালায়। সন্ধ্যা থেকে চলত ওই আসর। আটচালার মধ্যবর্তী খুঁটি বরাবর দড়ির বেড়া করা হত। মধ্যের আয়তক্ষেত্র অংশে কুশীলবরা বসতেন হারমোনিয়াম, তবলা, খোল করতাল ইত্যাদি নিয়ে।দড়ির বেড়ার বাইরে বসতাম, আমরা দর্শকরা। মূল কুশীলব ক্ষেত্রঠাকুরের প্রয়াণের পর আর পালাগান হয় না। ১৯৭৬ সাল থেকে পালাগান বন্ধ।

পূজার প্রত্যেক দিন দূরদূরান্ত থেকে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বালক বালিকারা আসত, দুর্গামণ্ডপের সামনে সমবেত হয়ে সমস্বরে সামগানের সুরে ‘দুটি মুড়ি মুড়কি দাওনা গা’ বলে যে আহ্বান জানাত, তা আর শোনা যায় না। অন্য অনেক আচ্ছন্ন করা জিনিষের মতো এটাও এখন অবলুপ্ত। যে যেখানেই থাকুন, পূজার ক’টা দিন তাঁরা উপস্থিত হন এই মিলনমেলায়। পরিবারের সকলেরই মনে এই ইচ্ছা আজও বর্তমান।

ছবি: অনীশ ঘোষ ও লেখক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন