durga idol of pach bari
পাঁচবাড়ির দুর্গা প্রতিমা।
dr. dipankar ghosh
দীপঙ্কর ঘোষ

দুর্গাপুর আর তার কয়লার খনি পার হলেই উঁচু নিচু নীলকালো রাস্তা তার দু’পাশে লাল মাটির পাড়। শাল-পিয়ালের জঙ্গলে মাঝে মাঝে নোটিশ দেওয়া “ধীরে চলুন হাতি পারাপারের স্থান”। বাস ড্রাইভার অবশ্য নিজের ছন্দে ছন্দে চলে এল – বিশেষ পাত্তা না দিয়েই। বরজোড়া এসে গিয়েছে। লোকজন ওঠানামা। আবার ঝকরঝকর করে হেই তিরতির করা শালী নদী আর চার পাশের শালজঙ্গল ফেলে রেখে বেলিয়াতোড় – স্থানীয় সবাই বলে বেলেতোড়। শিল্পী যামিনী রায়ের বাড়ি বাস রাস্তার ধারেই। তার পরের বাড়ি সকলের প্রাণপ্রিয় বিশ্বনাথ মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি। উনি আর নেই। ওখান থেকে সোজা গেলে গাজনতলা – ধর্মরাজের মন্দির। শ্রাবণে এখানে মহা ধুমধাম হয়। ওখানে বাঁ দিকের রাস্তায় ঘুরে গেলে পাঁচবাড়ির পুজো। তিনশো কুড়ি বছরের। এখন সব শরিক সময়ের স্রোতে দূরে দূরে থাকে বটে, তবে উমা মায়ের আগমনে সেজে ওঠে পুজোমণ্ডপ।

puja mandap of pach bari, beletore
বেলেতোড় পাঁচবাড়ির দুর্গামণ্ডপ।

পাঁচবাড়ির পুজোমণ্ডপ পাকা মানে বাঁধানো। মা আসেন সাবেকী বেশে। ভোরবেলা থেকে সনাতন বুড়ো অদ্ভুত এক সাঁওতালি সুর মিশিয়ে সানাই বাজায় – জন্মজন্মান্তর ওরা এই সুর‌ই বাজায়। ষষ্ঠীর ভোরে বয়োঃজ‍্যেষ্ঠ যিনি, নতুন কাপড় পরে কলাবৌ আর ঘট আনতে যান। মেয়েরা শাঁখ বাজিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে কলাবৌ বরণ করে। শুরু হয় পুজো। সময় ধরে পুজো আর আরতি। সন্ধিপুজো পার করে বিসর্জনের সুর এসে লাগে। আরতিতে ছোটো বড়ো সবাই মিলে দু’ হাত ওপরে তুলে নাচের স্মৃতি মিলিয়ে আসে। ঠাকুরমশাই অপরাজিতার বালা হাতে পরিয়ে দিয়ে বলে ওঠেন – মনে শান্তি আসুক, পৃথিবী শান্তিময় হোক, তুমি অপরাজিত হ‌ও।

only head is worshipped
বড়োমেলার মুণ্ডুপুজো।

এই গ্রামের দু’টো পুজোয় কেবলমাত্র মায়ের মাথা স্থাপন করে পূজার্চনা হয়। এই দুই পরিবারের আসল পুজো বিষ্ণপুরে। বিষ্ণপুরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের কিছু আত্মীয় বেলিয়াতোড়ে এসে বাসা বাঁধেন। কিন্তু মায়ের পুজোর টান বড় টান – এ দিকে স্বপ্নাদেশ আছে বিষ্ণপুরের রাজবাড়ির প্রতিমা বিসর্জন হবে না। এবং বাস্তবে আজও সেই সাড়ে তিনশো বছরের মৃন্ময়ী প্রতিমা এক‌ই আছে। স্বপ্নাদেশ আছে, আর অন্য কোথাও এই পরিবারের কেউ প্রতিমা তৈরি করে পুজো করতে পারবে না অথচ পরিবারের একটা অংশ বেলেতোড়ে এসে ঘট পুজো করে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতেন। এর পর মা দুগ্গার শুধুমাত্র মুখটি তৈরি করে ঘটের পেছনে বসিয়ে মাকে দেখার সাধ মেটান – কিন্তু প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয় না। বেশ কয়েক যুগ আগে পর্যন্ত বিষ্ণপুর রাজবাড়িতে কামান গর্জন করে উঠলে তবেই বেলিয়াতোড়ের সব পুজো আরম্ভ হত। আজ আর সেই প্রথা নেই। কিন্তু রায়বাড়ি যেটা বড়মেলা বলে পরিচিত সেখানে আর দেবানন্দ নিয়োগীবাবুদের বাড়িতে মায়ের মৃন্ময়ী মুখটাকে সামনে রেখে ঘটপুজো হয়।

আরও পড়ুন বেলেঘাটা থেকে ক্যানিং, কালোদুর্গার আরাধনা

এ ছাড়াও সাতবাড়ি এবং বিভিন্ন বাড়িতে শরিকরা মিলে পুজো করেন। পুরোনো সানাইওয়ালারা আসে। ঘরে ভিয়েন বসিয়ে ভোগ রান্না হয়। গোটা গ্রাম মেতে ওঠে উমা মায়ের আগমনে। মেয়েরা আলপনা দেয় – পাট ভাঙা শাড়ি পরে অঞ্জলি দেয়। সব প্রতিমা এক‌ই দিনে এক‌ই সময়ে সিঁদুরখেলার শেষে বিদায় নেয় সানাই এর সুরে – ঢাক বেজে ওঠে – ঠাকুর থাকবি কতক্ষণ ঠাকুর যাবি বিসর্জন। আবার এক বছরের জন্য প্রতীক্ষায় থাকা।

তথ‍্যসূত্র: স্বপন কুমার ঘোষ এবং সরস্বতী কর

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন