papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

দুর্গাদালান আজ বড় একাকিনী। কী শহরে, কী গ্রামে হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি ছাড়া প্রায় প্রতিটি বাড়ির পুজোদালানের এক ছবি। তেমনই একটি বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের মিত্রবাড়ি। বাড়ির লোকেরা জীবনের তাগিদে নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মহালয়ার প্রাক্কাল থেকে শুরু হয়ে যায় বাড়ি আলো করে ঘরে ফেরা। আত্মীয়স্বজনে ঠাকুরদালান ভরে ওঠার পাশাপাশি প্রতিমার চক্ষুদানও শুরু হয়ে যায়। সম্মিলিত কোলাহলে চার দিকের আবহ বদলিয়ে যায় এক লহমায়।

রামগোপাল মিত্রের তৃতীয় পুত্র মধুসূদন মিত্র ১১৪০ বঙ্গাব্দে মাটির চণ্ডীমণ্ডপে পুজো শুরু করেন জয়নগরের মিত্রবাড়িতে। ১২২৮ পর্যন্ত ঢাক-কাঁসরের বাদ্যে তা মুখর হয়ে উঠত। বিশাল মিত্রবাড়ির মাটির চণ্ডীমণ্ডপ ১২৪৬-এ কৃষ্ণমোহন মিত্র পাকা ঠাকুরদালানে পরিণত করেন। তিনি ছিলেন সমাজপতি। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি তিনি কালীপুজোও শুরু করেন। পারিবারিক বিপর্যয়ের ফলে পুজো বন্ধ হলেও ফের চালু হয় ১৩৯৮ থেকে হারানচন্দ্রের হাত ধরে। কিন্তু কালীপুজো একটানা হয়ে চলেছে। সমস্ত মিত্র-সমাজের আদিপুরুষ কালিদাস মিত্রকে রাজা বল্লাল সেন বাংলায় এনেছিলেন আরও চার জন কায়স্থ ও পাঁচ জন ব্রাহ্মণের সঙ্গে।

মিত্রবাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে

পুজো নয় নয় করেও দশম পুরুষে পা দিয়ে ফেলেছে। নবম পুরুষের পুজোর স্মৃতিকথা শোনাচ্ছিলেন ভৈরবচন্দ্র মিত্র। তিন চালায় বিভক্ত থাকলেও কাঠামো একটিই এবং এটিই মিত্রবাড়ির পুজোর বৈশিষ্ট্য, বলছিলেন ভৈরববাবু। এখানে দেবীদুর্গার পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। বলিদান হয় না। রথের দিন কাঠামোপুজো হয়। আগে গুপ্তপ্রেস মতে পুজো হলেও ২০০০ সাল থেকে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে পুজো হয়ে চলেছে।

চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে

বাড়ির ন’ পুরুষের বউমা সুনন্দা মিত্র শুনিয়েছিলেন পুজোবাড়ির নানা কথা। আজ থেকে প্রায় ৫৭ বছর আগের সেই নববধূটি দেখেছিলেন তিনচালার প্রতিমাকে। শাশুড়িমা কমলাদেবীর কাছে শুনেছেন মিষ্টি তৈরির জন্য বাড়িতে পাতা হত বড়ো বড়ো উনুন। সপ্তমী থেকে নবমীতে থাকত কয়েক পদ ভাজা, মুগের ডাল, মাছের কালিয়া, মাছের কাঁটা দিয়ে চচ্চড়ি, চাটনি, পায়েস। নানা পদের রান্নার গন্ধে পুজোবাড়ি ম ম করে উঠত। সে সব এক দিন ছিল। আরও এক বউমা অলকা মিত্র জানালেন, সন্ধ্যারতির সময় লুচির সঙ্গে ছানার মিষ্টি ছাড়াও খাজা-গজা দেওয়ার রীতি আছে এই বাড়িতে। মহালয়ার দিনে ঠাকুরকে ঠাকুরদালানে বসানো হয় ও চক্ষুদান করা হয়। একটা সময় ছিল যখন বাড়ির গিন্নিদের আলাদা করে একাধিক কুমারীপুজো হত। বর্তমানে একটি পুজো হয়। সাধারণত পুরোহিত পরিবার থেকে কুমারীকন্যা নিয়ে আসা হয়।

জয়নগর মিত্রবাড়ির প্রতিমা

পুজোয় তোপধ্বনি এই পরিবারের নিয়ম। আগে কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি থেকে বোধন শুরু হলেও বর্তমানে ষষ্ঠীর দিনে বোধন হয়।

আরও পড়ুন : চক্রবেড়িয়া সর্বজনীন দুর্গোৎসবে এই বার ‘বাবুয়ানি’

ছবি সুমন সাহা।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন