durga pratima at basubari, khalisani
payel samanta
পায়েল সামন্ত

জগদ্ধাত্রীর দেশ চন্দননগর, আলোর ঠিকানা চন্দননগর। হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল লোকাল ধরলেই পাওয়া যায় চন্দননগরের সন্ধান। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির খ্যাতি বিজড়িত এই সাবেক ফরাসডাঙা এখন বিশ্ব মানচিত্রে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য বেশ নাম কুড়িয়েছে। অথচ জগদ্ধাত্রীর থেকেও প্রাচীন দুর্গা রয়ে গিয়েছে এই শহরেরই অন্তরালে। ৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো, বাংলার অন্যতম প্রাচীন সেই দুর্গার সন্ধানে খবর অনলাইন পৌঁছে গিয়েছিল খলিসানির বসুবাড়িতে।

সে বহু দিন আগের কথা — যখন ১৭৬১-তে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন, তার পরে চন্দননগরে শুরু হল জগদ্ধাত্রীর আরাধনা। আরও ২৫০ বছর আগে এই সমৃদ্ধ জনপদে সূচনা হয়েছিল দুর্গাপুজোর। বসুদের প্রতিমা এবং তার চালচিত্রেই রয়েছে সেই প্রাচীনত্বেরই নিদর্শন। তিনকাঠার এমন চালচিত্র সচরাচর চোখে পড়ে না। ৫১০ বছরে পড়ল বসুদের এ বারের পুজো।

thakurdalan of basu family
বসুবাড়ির ঠাকুরদালান।

এক সময় যখন গমগম করত সপ্তগ্রাম, তখন এই পুজো উপলক্ষে বসত কবিগান, যাত্রার আসর। নাটমণ্ডপ থেকে সরাসরি চোখ চলে যায় সেই দোতলায়। অন্দরমহলের পুরবাসিনীরা এখান থেকেই কবিগান বা যাত্রার অভিনয় দেখতেন। তখন কোথায় জগদ্ধাত্রী নিয়ে এলাকার এত হুল্লোড়! তখন দুর্গাকে ঘিরেই এলাকার হইহই চলত। নতুন শাড়ি, নতুন সিঁদুরের বায়না তোলা থাকত এই দুর্গাপুজোর জন্যই।

ডাকের সাজে সজ্জিত এই মাতৃময়ী মা দুর্গার প্রাচীন বেদিতে বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলি। কারণটা কী? গল্পটা শুনতে পেলাম বসুদের ঠাকুরদালানে বসেই। প্রশস্ত সিঁড়িযুক্ত এই ঠাকুরদালান এমনিতেই চোখ টানে। পুজোর জৌলুসে তা যে মন কাড়বে, এ তো বলাই বাহুল্য। বসু পরিবারের তরফে হীরেন বসু বললেন, “আগে কালীপুজোও হত। সেই কালী এখন বাড়ির বাইরে পুজো হয়। ঠাকুর স্বপ্নে নরবলি চেয়েছিলেন বলে তাঁকে বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছিল।”

বেশ লাগে এ সব প্রাচীন প্রথা আর সাবেকি রীতিনীতির গল্প শুনতে। রীতি মেনে দুর্গামণ্ডপের কাছে বেলতলায় বিল্ববোধন হয় এবং দেবীকে দেওয়া হয় কামিনী আতপচালের ভোগ, ফুলকপির তরকারি আর পায়েস। ভোগের কথায় জানলাম, নবমীর দুপুরে ভোগ খাওয়ার রীতি চলছে আজও। বছর কুড়ি ধরে চলছে এই ভোগ খাওয়ার রেওয়াজ, মাঝখানে অবশ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খিচুড়ি, আলুর দম, পাঁচ রকম ভাজা, পেঁপের চাটনি, পায়েস — সব মিলিয়ে কম এলাহি নয়! একবার ১৮০০ লোকও নাকি ভোগ পেয়েছিল।

idol making is going on
চলছে মূর্তি গড়ার কাজ।

চন্দননগর ফরাসি হাত ঘুরে আজ ভারতের অন্তর্ভুক্ত। এখানকার সরস্বতী নদীর ওপর দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। তার নাব্যতাও কমে গিয়েছে অনেক। তাই সরস্বতীতে বসুদের কলাবউ স্নান আর ঘট বিসর্জনটুকুই হয়। প্রতিমা বিসর্জনের জন্য আজ দ্বারস্থ হতে হয় গঙ্গার।

বাড়ির তরুণ প্রজন্ম সৌরভ বসু জানালেন বসুদের ‘আটবাড়ি’র কাহিনি। আগে এই সরস্বতী নদী যখন কলকলিয়ে বইত, তখন তাম্রলিপ্ত থেকে করুণাময় বসু আসেন এখানে। তাঁর হাতেই এই পুজো শুরু। ১৮ শতকের শেষে সহস্ররাম বসু আট পুত্রের জন্য তৈরি করেছিলেন আটবাড়ি। আজ এই আটবাড়ির সেই গরিমা নেই বললেই চলে। এখন এক বিঘের মতো জায়গা জুড়ে আটবাড়ির ভগ্ন সাম্রাজ্য, চোখে পড়বে তিনটে শিব মন্দির, মদনমোহন মন্দির। মন খারাপের এমন ইতিহাস বসুদের আটবাড়ির সর্বত্র জুড়ে। শহর আর শহুরে সভ্যতার আগ্রাসনে এমন কত কী হারিয়ে যাচ্ছে, সবটা কি কলমের ডগায় তুলে আনা সম্ভব?

lighting of earthen pots
দুর্গাপূজায় প্রদীপ-সাজ।

জগদ্ধাত্রীর দেশে এসে তাঁর কোনও প্রভাব পাব না, তা কি হয়? প্রচারের সব রকম আলো থেকে অনেক দূরে, বড় নিঃসঙ্গ এই দুর্গা। এঁকে দেখে এক ঝলকে মনে পড়বে জগদ্ধাত্রীর কথা। এই প্রতিমার সাবেকি মুখশ্রীতে জগদ্ধাত্রীর মুখের বড় মিল। সেই একই গাম্ভীর্য এবং আভিজাত্য। বিবর্তনের ফলে আজ এই দুর্গার রূপই হয়তো জগদ্ধাত্রী পেয়েছে, অস্বাভাবিক নয়। ঝাঁ চকচকে শহুরে ভিড় এবং ক্রমশ বাণিজ্যিক তকমায় আটকে যাওয়া জগদ্ধাত্রীতে যে দু’দন্ড শান্তি মেলে না, বসু বাড়ির দুর্গা তাঁর নিভৃত ঠাকুরদালানে সেই শান্তি দেবেন আপনাকে! এ কথা হলফ করে বলা যায়!

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন