pateshwari debi of bardhaman rajbari
rintu brahma
রিন্টু ব্রহ্ম

প্রায় ৩০০ বছর আগের কথা। বর্ধমান রাজপরিবারে তখন রাজা ত্রিলোকচন্দ্রের অধিষ্ঠান। এক দিকে মারাঠা বর্গীদের হানা ও অন্য দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আক্রমণ। একের পর এক যুদ্ধ লেগেই রয়েছে। দুয়ে মিলে এক সংকটজনক পরিস্থিতি। ঠিক সেই সময়েই ঘটে গেল এক বিপর্যয়। অকালমৃত্যু হল রাজা ত্রিলোকচন্দ্রের। একা হয়ে গেলেন রানি বিষণকুমারী।

পুত্র তেঁজচাদেরও রাজত্বের দিকে তেমন মন নেই। ফাঁপরে পড়লেন রানি। শেষ পর্যন্ত সংকট কাটাতে রানি শুরু করলেন পটেশ্বরী দেবীর পুজো। রাজবাড়ির লাগোয়া রানিস্কুলে এই পুজো শুরু হল। তার পর থেকেই রাজবাড়িতে বংশ পরম্পরায় এই পটেশ্বরী দেবীর পুজো হয়ে আসছে। তবে এখন আর এই পুজো রানিস্কুলে হয় না। সেই মন্দির এখন খণ্ডহর। এখন পুজো সরে এসেছে রাজবাড়ির ঠাকুরবাড়ি লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে।

pateshwari durga at lakhminarayan jiu temple
লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে পটেশ্বরী দুর্গা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫০-এ রাজত্ব চলে যায় বর্ধমান রাজপরিবারের। রাজপাট চলে যাওয়ার পর তৎকালীন শেষ রাজা উদয়চাঁদ বর্ধমান ছেড়ে চলে গেলে কয়েক বছরের জন্য পুজো বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত রাজা উদয়চাঁদের সম্মতিক্রমে ফের পটেশ্বরীর আরাধনা শুরু করেন রাজকুমার প্রণয়চাঁদ। এখনও রাজপরিবারের এই পুজোর ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন মহারাজ ড: প্রণয়চাঁদ মহতাব।

রীতিমতো তাকলাগানো জাঁকজমক, জৌলুসের পুজো হত রাজবাড়ির পটেশ্বরী দুর্গামায়ের। কিন্তু এখন সেই রাজত্ব নেই, নেই রাজকোষ। তাই পুজোর ঐতিহ্য চালু থাকলেও সেই জাঁক আর নেই। অর্থাভাব অনেক সংকুচিত করেছে রাজবাড়ির এই পুজোকে। প্রণয়চাঁদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকেই এই পুজোর খরচ সামাল দেওয়া হয়।

বর্তমান রাজা এখন বর্ধমানে থাকেন না। থাকেন বিদেশে। তবে প্রতি বছর এই সময় বর্ধমানে আসেন, এ বছরেও এসেছেন। তিনি আসতেই শুরু হয়ে গিয়েছে পটেশ্বরীর আরাধনার তোড়জোড়। রাজবাড়ির আবাসিকদের মধ্যে এখন ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।

এই পটেশ্বরী দুর্গা আদতে প্রায় সাড়ে সাত ফুট বাই সাড়ে পাঁচ ফুট ফ্রেমে আঁকা ছবি। দুর্গার গায়ের রঙ সোনার মতো। অসুরের রঙ গভীর সবুজ।পুজোর সমস্ত দায়িত্ব থাকে রাজবাড়ির বর্তমান প্রধান পুরোহিত উত্তম মিশ্রের উপর। উত্তমবাবু বলেন, এটি বর্ধমান রাজার নিজেস্ব পুজো। তাই পটেশ্বরী পুজোর প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশেষ বিশেষ নিয়মনীতি রয়েছে।

raja pranaychand at the puja held on pratipad tithi
প্রতিপদে পুজোর সূচনা। একেবারে বাঁ দিকে রাজা প্রণয়চাঁদ।

লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে এই পুজো হয় সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে। প্রতিপদে ঘট বসিয়ে শুরু হয় পুজোর সুচনা। অষ্টমী-নবমীতে লুচি, হালুয়া ভোগ দেওয়া হয়। আগে সুপারি বলির রীতি চালু ছিল। তবে এখন বলি একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চলে চণ্ডীপাঠ ও হোম। নবমীর রাত্রে ডান্ডিয়া নাচের আসর বসে রাজবাড়িতে।

এই পটেশ্বরী দুর্গার কোনো বিসর্জন হয় না, সারা বছরই রাখা থাকে রাজবাড়িতেই। বারো বছর পর পর নতুন করে রঙ করা হয়। যে কাজ বছরের পর বছর ধরে বংশানুক্রমে হয়ে আসছে। এখন এই কাজ করেন শিল্পী স্বপন দে।

পুরো বছরটা ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে থাকলেও শরৎ এলেই রাজবাড়ির চুনসুরকিতে লাগে আগমনীর হাওয়া। নতুন করে সেজে ওঠে রাজবাড়ি। রাজাও বলেন, “আমার এখানে আসতে খুবই ভালো লাগে।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here