২৬০ বছরে পা কলকাতার প্রথম জাঁকজমকের দুর্গাপুজোর

0
500
শৈবাল বিশ্বাস

সেটা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ। পলাশির আমবাগানে মোহনলালের কামানের গর্জন থেমে গিয়েছে। মির্জাফর-পুত্র মিরন ছুটছেন নবাবকে খুঁজে বের করতে। আমজনতার সামনেই তাঁকে কোতল করা হবে। এ দিকে যুদ্ধ-শিবিরের অদূরে ক্লাইভের খাস তাঁবুর ঠিক বাইরে বসে নিবিষ্ট মনে চিঠি লিখে যাচ্ছেন এক টিকিধারী পরম বৈষ্ণব। নামেই তিনি বৈষ্ণব, কাজে কিন্তু একেবারেই সাহেবদের তল্পিবাহক — খোদ ক্লাইভ সাহেবের মুনশি। মুর্শিদাবাদ ষড়যন্ত্রের অন্য‌তম যন্ত্রী তিনি। নাম তাঁর নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর। আর ক’দিন বাদেই তিনি অবশ্য‌ রাজা উপাধি পাবেন। পাবেন কলকাতার বেশ কিছুটা জমিদারি স্বত্ব।

সে দিন সেই আমবাগান থেকে ক্লাইভের মুনশি নবকৃষ্ণ কলকাতায় তাঁর দাদাকে চিঠি লিখলেন, আয়োজন করো। পলাশিতে আমাদের বড় জিৎ হয়েছে। রোজগারও মন্দ হয়নি। ক্লাইভ সাহেব খুশ। আমাদের ভাগ্য‌ একেবারে তুঙ্গে, কলকাতায় খুব বড়ো করে দুর্গোৎসব করতে হবে। ক্লাইভ সাহেব কথা দিয়েছেন, তিনিও আসবেন সেই উৎসবে।

পুরানো কলকাতার দুর্গাপুজো। সম্ভবত এটি শোভাবাজার রাজবাড়ির।

১৭৫৭-র সেই দিনটিতেই পত্তন হল কলকাতার সব চেয়ে জাঁকজমকের পুজোর। শোভাবাজারে রাজা নবকৃষ্ণের বাড়ির সেই দুর্গাপুজো এ বার পা দিল ২৬০ বছরে। সেই থেকে লাগাতর চলে আসছে পুজো।

রাজা নবকৃষ্ণের দীর্ঘদিন কোনো সন্তান হয়নি, তাই দত্তক নিয়েছিলেন বড়ো দাদা রামসুন্দরের পুত্র গোপীমোহনকে। পরে অবশ্য‌ তাঁর নিজের একটি সন্তান হয়। বড়ো ছেলে পেলেন আদি দুর্গোৎসবের ভার আর অধিকাংশ জমিজায়গা আর ছোটো ছেলে রাজকৃষ্ণ পেলেন কলকাতার জমিদারি, কুলদেবতা গোপীনাথ জিউ-র সেবার ভার আর রাজা নবকৃষ্ণের বাস্তুভিটে। এই বাড়িতে নতুন করে দুর্গাদালান বানিয়ে পুজো শুরু হল ১৭৯০ সালে। অর্থাৎ রাজা রাজকৃষ্ণের পুজোর মেয়াদও হল ২২৭ বছর। গোটা উনিশ শতকে পাল্লা দিয়ে দু’ বাড়িতে মোচ্ছব হয়েছে। সাহেবসুবোদের ওপর কোম্পানির এক সময় নির্দেশ এল, তোমরা নেটিভদের সঙ্গে বড্ডবেশি মেলামেশা করছ। নেটিভদের পুজোয় তোমাদের যাওয়া চলবে না। অতএব দুর্গোৎসবে বাই নাচানো আর মদের ফোয়ারার ওপর কিছুটা লাগাম পড়ল। কি্ন্তু পুজোর জাঁকজমকের কোনো খামতি হল না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সেই জাঁকজমকের একটা ইতিহাস পাই পক্ষীর দলের সূত্রে। বাগবাজারের বিখ্য‌াত পক্ষীর দলকে শোভাবাজার রাজবাড়ির দু’ তরফই নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যেতেন। কিন্তু এক বার টাকাপয়সা, খাবারদাবার নিয়ে কিছু গণ্ডগোল হওয়ায় পক্ষীরা আর তাঁদের খাঁচা তথা পালকি থেকে বের হলেন না।

আরও পড়ুন : ৮৪ বছরে পা, দু’ বছর হল সাবেকি ছেড়ে থিমে এসেছে গৌরীবেড়িয়ার পুজো

বিংশ শতাব্দীতে আর গোপাল উড়ের পালা, কবির গান, পক্ষীর দলের কীর্তিনিশান থাকল না, তার জায়গা নিল যাত্রা, থিয়েটার। রাজা-রাজরাড়রা পাবলিক স্টেজে গিয়ে থিয়েটার দেখুন না দেখুন, পুজোর ক’দিন তাঁদের বাড়ির পালায় থাকা চাই-ই চাই।

শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো।

কী হত তখন?

রাজা রাজকৃষ্ণের বংশধর অলককৃষ্ণ দেব শোনালেন সেই মজার গল্প।

রাজারা বসে আছেন। থিয়েটার শুরু হল। একটা- দু’টো সিন যেতে না যেতেই শুরু হল নায়িকার নাচ। সেই নাচ দেখে রাজারা তো মহা খুশি। বললেন, ‘এনকোর এনকোর’। তখন ‘এনকোর’ মানে বুঝতে হত এত ভালো হয়েছে যে আবার সেটা করে দেখাতে হবে। তাই সই। আবার শুরু হল সেই নাচ। যত বার নাচ শেষ হয় তত বারই রাজাবাবুরা বলে ওঠেন, ‘এনকোর’, ‘এনকোর’। ব্য‌াস, নায়িকা বাধ্য‌ হন আবার নাচতে, হাজার হোক রাজা-মহারাজা বলে কথা। এই করতে করতে যখন রাতভোর হয়ে এল, তখন অধিকারীমশাই স্টেজে উঠে বললেন, “রাজাবাবুরা কিছু মনে করবেন না, আজ আর পালা দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। আজ এই নাচ অবধি থাক। বাকি পালা কাল হবে এখন।”

রাজবাড়ির প্রবেশ দ্বার

এই দুই বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব হচ্ছে, একচালা প্রতিমা, সামনে অভ্র দিয়ে সাজানো। মাতৃপ্রতিমার কাঠামোপুজোর সূত্রপাত হয় উলটোরথের দিন। সে দিন থেকেই কার্যত উৎসব শুরু। মাঝে আছে মহালয়ার দিন পণ্ডিত-বিদায়। দেশদেশান্তর থেকে পণ্ডিতরা আসতেন মোহর এবং উপহার নিতে। এখন আর মোহর পান না, সামান্য‌ কিছু টাকা পান। কিন্তু রীতি তো আর বিসর্জন দেওয়া যায় না, তাই বংশপরম্পরায় দূরদূরান্ত থেকে তাঁরা আসেন রাজপরিবারের আনুকূল্য‌ গ্রহণ করতে। আগে নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে কৈলাশে শিবকে আগাম মায়ের আগমনী বার্তা জানিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হত। কিন্তু এখন আর নীলকন্ঠ পাখি ওড়ে না। তবে দু’টো নৌকার মধ্য‌ে মাকে বসিয়ে মাঝ-গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দেওয়ার প্রথা এখনও বজায় আছে। যেমন বজায় আছে রাজা রাজকৃষ্ণের বাড়ি বলিদানের প্রথা, সন্ধিপুজোর সময় ব্ল্য‌াঙ্ক ফায়ার করা ইত্য‌াদি। আবহমানকালের এই পুজো বন্য‌ার জন্য‌ এক বারই নমো নমো করে সারতে হয়েছিল। সে বার ছাড়া প্রতি বারই লক্ষ মানুষের ভিড় আছড়ে পড়েছে রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিটের রাস্তার দু’ ধারের দুই বাড়িতে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here