‘শহরে নাকি টাকা ওড়ে’! সত্যিই কি তাই? বলবে টালাপল্লী সাধারণ দুর্গোৎসব

0
714
স্মিতা দাস

‘শহরে নাকি টাকা ওড়ে’! এই হল ৭০তম বর্ষে টালাপল্লী সাধারণ দুর্গোৎসব সমিতির এ বছরের ট্যাগ লাইন।

৭০-এ থিম ‘সুখের চাবিকাঠি’। মানুষ অনবরত ছুটে চলেছে টাকার পেছনে। যা কিছু শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে চাও, তার জন্য একটাই জিনিস দরকার, টাকা। আর সেই টাকা রোজগারের জন্য যত ব্যস্ততা। তাকে ঘিরে অশান্তি। মানুষের ব্যস্ততাময় জীবন, অসুস্থতা, ধৈর্যহীনতা, এই সব থেকে মানুষ কী ভাবে নিস্তার পাবে, একটু হালকা হওয়ার সুযোগ পাবে, সেটাই তুলে ধরা হবে থিমে। মূলত শহরের লোককে উদ্দেশ করেই এই থিম-ভাবনা।

কথা হচ্ছিল পুজো কমিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অনুভব দত্তর সঙ্গে।

অনুভববাবু বলেন, “অনেকে তো অনেক কিছু নিয়ে কাজ করে। গ্রামের শিল্প, হারানো শিল্প, বা অনেক কিছুই থাকে থিমে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য ঠিক যে জায়গায় পুজোটা করছি, ঠিক সেই জায়গার মানুষের অবস্থা কী, সেটা তুলে ধরা। আর সেই ভাবনা থেকেই এই থিম বাছা হয়েছে”। তাই এই ধরনের ট্যাগ লাইন।

থিম-পরিকল্পনায় শিল্পী নিজেই। এ বারেও শিল্পী অনির্বাণ বিশ্বাস। অনির্বাণবাবু এই নিয়ে তিন বার এই পুজোর সঙ্গে কাজ করছেন। আর প্রতিমাশিল্পী কৌশিক পাল। গত দু’ বছর ধরেই কৌশিকবাবু প্রতিমা গড়ার দায়িত্বে আছেন।

কী কী ব্যবহার করা হবে? অনুভববাবু জানান, এমন কিছু জিনিস ব্যবহার করা হবে যেগুলো অল্প কিছু দিন হল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে অথচ খুবই আকর্ষনীয়। তিনি আশা করছেন গোটা ব্যাপারটা দর্শকদের খুবই পছন্দ হবে। তা ছাড়া থিম তুলে ধরতে থাকছে মানুষের অবয়ব। আর সেই মানুষের অবয়ব হিসেবে অনেক কাকতাড়ুয়া ব্যবহার করা হবে। তা ছাড়া প্রচুর পরিমাণে আর্টিফিসিয়াল মেক ব্যবহার করা হবে। থাকবে পদ্ম, বুদ্ধমূর্তি ইত্যাদি। কংক্রিট বেস মেটিরিয়াল দিয়েও এ বছরের থিম দাঁড় করানো হবে।

গত বছরের থিমের প্রসঙ্গে অনুভববাবু বলেন, ৬৯তম বছরে থিম ছিল ‘যোগাসনে যোগমায়া’। বিষয়বস্তু ছিল মানুষকে ‘রিলিফ দেওয়া’। যোগের মাধ্যমে মানুষ কী ভাবে সুস্থ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে সেই ব্যাপারটা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। তার আগের বছর তিনি ‘হীরকরাজা’কে নিয়ে কাজ করেছিলেন।

গত বছরে টালাপল্লীর ঝুলিতে এসেছিল কর্পোরেশনের পুরস্কার ছাড়াও ছোটো বড়ো অনেক পুরস্কার।

গত বছরের মণ্ডপ

গত বছরে থিমের কাজে ‘আর্টিফিসিয়াল’ পাতা, গাছের ডালপালা অনেক কিছু ব্যবহার করা হয়েছিল। ছিল ৪৫০ থেকে ৫০০টা টিনের ড্রাম। এক একটা ড্রামে এক এক রকমের যোগের পদ্ধতি দেখানো হয়েছিল। আসন দেখানো হয়েছিল। একটা ১৪-১৫ ফুটের হাত ব্যবহার করা হয়েছিল। তাতে সব ক’টা মুদ্রাকে তুলে ধরা হয়েছিল। তাতে খুব ন্যাচারাল ভাবে বিষয়টা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। দেখানো হয়েছিল প্রকৃতিতে যে গাছগুলো গজিয়ে উঠেছে তারা কী ভাবে মানুষকে যোগে উদ্বুদ্ধ করছে। প্রত্যেকটা গাছকেই যোগের ফর্মে দেখানো হয়েছিল। এমন যেন তারা সৃষ্টিই হচ্ছে যোগের ফর্মে। তারা যেন মানুষকে বলছে, যে শুধু অক্সিজেন নিয়েই সুস্থ থাকা যাবে না, দরকার যোগাভ্যাসও।

গত বছরের বাজেট ছিল ১৩ লক্ষ টাকা। এ বছরের বাজেট রাখা হয়েছে ১৫ লক্ষ টাকার মতো।

সারা বছর ধরেই কমিটি নানা ধরনের কর্মকাণ্ড করে থাকে। ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, তাদের চোখের চিকিৎসা, বিনামূল্যে ৫০০ জনকে চশমা দেওয়া, রক্তে থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়। তা ছাড়া মহালয়া থেকে চতুর্থী অবধি নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়।

এ বছরে রাজ্যপালকে দিয়ে মণ্ডপ উদ্বোধনের পরিকল্পনা করেছে টালাপল্লীর কর্তৃপক্ষ। অনুভববাবু বলেন, প্রতি বছরই কোনো না কোনো খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বকে দিয়ে উদ্বোধন করা হয়। এসেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, সুজিত বোস,অর্জুন চক্রবর্তী এমন অনেকেই।

এ বছরে উদ্বোধনের দিন এখনও ঠিক হয়নি। তবে প্রতি বছর একাদশীতে ঠাকুর বিসর্জন দেওয়া হয়।

অনুভববাবু বলেন, এখানে শুরু থেকেই সাবেকি পুজো হয়ে আসছিল। তবে গত চার বছর ধরে থিমে এসেছেন তাঁরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও যে উলটো পারের পুজো কমিটির সঙ্গে যে একটা হাড্ডাহাড্ডি রেষারেষি আছে তা স্বীকার করে নিয়েছেন অনুভববাবু। তিনি বলেন, লড়াইটা বছরের হিসেবে অসম লড়াই হলেও, চেষ্টায় মানুষ কী না পারে। তাই তাঁদের আশা থিমপুজোয় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে শুধু নয় ছাপিয়ে চলে যেতে পারবেন তাঁরা। তবে দু’টো পাড়া মিলে পুজোকে এই ‘জোনে’ একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে। আরও জমজমাট করে তুলেছে। আগে পুজোর চমকে কলকাতার মধ্যে শেষ সীমা ছিল বাগবাজার। কিন্তু গত ৫-৬ বছর ধরে সীমানাটা পেরিয়ে গিয়ে টালাতে ঢুকে পড়েছে।

অনুভববাবুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম ৭০ বছরের ইতিহাসের টুকরো কিছু স্মৃতির কথা। তিনি বলেন, এই পুজো বিখ্যাত ছিল ‘লাইটিং-এর ঠাকুরের’ জন্য। তখন থরে থরে লোক আসত সারা কলকাতা থেকে সেই ঠাকুর দেখবে বলে। সেই সময় লাইটিঙের মাধ্যমে দেখানো হত দুর্গাঠাকুর লাফিয়ে গিয়ে ত্রিশূল ছুড়ে অসুর বধ করছেন।

শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় থেকে উত্তরে গেলে টালা ব্রিজের আগে ব্রিজের গা দিয়ে বাঁ দিকে যে রাস্তা চলে গিয়েছে সেই রাস্তায় টালাপল্লী সাধারণ দুর্গোৎসবের পুজোমণ্ডপ।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here