md ali park after correction
payel samanta
পায়েল সামন্ত

ছিল বেড়াল, হয়ে গেল রুমাল! হযবরল নয়, এ সব হচ্ছে খাস কলকাতার মণ্ডপে। পরিষ্কার করে বললে, ছিল ডাক্তার, হয়ে গেল শিশুপাচারকারী!

বাঙালির হুজুগাস্ত্রে শান দিতে এ বার আর দুর্গা নয়, খোদ অসুরই নেমে এসেছে মঞ্চে। বলা ভালো, অসুররূপী ডাক্তার, থুড়ি, শিশুপাচারকারী!

মহম্মদ আলি পার্কের পুজো ঘিরে শহরের বৈঠকখানা আর সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে দেদার হইচইয়ের কারণেই পালটে গেল কি অসুরের মূর্তি? পুজোকে কেন্দ্র করে কোনো মন কষাকষির জায়গা রাখতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই তাঁরই নির্দেশে গলায় স্টেথো ঝোলানো অ্যাপ্রন পরা ডাক্তার চিহ্নিত অসুরটি হয়ে গেল শিশু-কোলে চেকশার্ট পরা শিশুপাচারকারী। সরে গেল আসল বা নকল ডাক্তার নিয়ে লেখা যাবতীয় বোর্ড।

মহম্মদ আলি পার্ক পুজো কমিটির তরফে প্রেসিডেন্ট নরেশ জৈন জানালেন, “মুখ্যমন্ত্রী বললেন বলেই এ ভাবে পালটে ফেলা হল। কাল বিকেলে তাঁর নির্দেশ পেয়ে গভীর রাতে আমরা অসুর পালটানোর কাজ শুরু করি। তিনি চাইলেন, মানুষ খুশি খুশি পুজো দেখুন। এতে বিবাদ বা অসন্তোষ রেখে তো লাভ নেই।”

মানুষ কি এতে খুশি? “মানুষের তো কোনো প্রবলেম নেই। আমরা নকল ডাক্তারই দেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অন্য ডাক্তাররা সেটা নিয়ে প্রবলেম করেছেন! তাই…”

মণ্ডপে সবার হাতে মোবাইল। অসুরের ফটোসেশন চলছে। সোনার কেল্লার মুকুলের ঢঙে দুষ্টু লোক(ডাক্তার) ভ্যানিশ হয়েছে।

md ali park before correction
বিতর্ক সৃষ্টির পর যে ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

এ দিকে ভিড়ের মাঝে অসুরচর্চা চলছে জোরকদমে। “কসাই, কসাই! সব ডাক্তার হি কসাই! কোই গলত নেহি ইস মে। যো থা একদম ঠিক থা” – এমন নানা মন্তব্য ভেসে আসছে।

জনতার মধ্যে আবার অনেকেই বিরক্ত এ সব ঘটনায়। পুজোতে চমক দেওয়ার ছিল বলে যাঁরা রাত জেগে প্রাণ বাঁচান, তাঁরা অসুর আখ্যা পাবেন? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কলেজ পড়ুয়া ইতিমধ্যে ফেসবুকে প্রচুর মন্তব্য করেছেন। তিনি জানালেন, “কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়…। এ তো আগেই শুনেছেন। সোনার ফসল যে ফলায় সে খেতে পায় না। তেমনি মানুষকে প্রাণে বাঁচালে আপনাকে অসুর হতে হবে।”

এত উৎসাহ কেন এই মণ্ডপে ঠাকুর দেখার জন্য? ভিড়ের মধ্যেই বছর পঁচিশের কলাকৃতি সাহা বললেন, “এক দিকে পাকিস্তান টেরোরিস্তান। আর হিন্দুস্থান অসুরোস্থান। এখানে সবাই অসুর। বেসরকারি হাসপাতালে চড়া বিল, সারদা, রোজ ভ্যালিতে আমানতকারীর টাকা চোট। সবখানে অসুরের জন্ম। আবার অসুর পালনও হচ্ছে নারদায়। তা হলে স্রেফ ডাক্তার বা শিশুপাচারকারী কেন? বাকিরা কোথায়?”

ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে ডাক্তররা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে শুরু করে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল, ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরর্স ফোরাম, সবাই তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু মানুষ তাতেও মজা করতে ছাড়েনি। প্রশ্ন জাগছে, সত্যিই ডাক্তাররা কি সমাজ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন? মানুষের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি কি নেই তাঁদের জন্য। ডাক্তার পেটানোর নীতি তো রয়েইছে, তাতে যুক্ত হল অসুর-তকমা!

এই সমস্ত কাণ্ডের রূপকার পূর্ব মেদিনীপুরের মৃৎশিল্পী কুশধ্বজ বেরার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “ডাক্তাররা ভগবান। মানুষকে প্রাণে বাঁচিয়ে তাঁরা যা কাজ করেন, তার তুলনা নেই। অসৎ আর নকল ডাক্তাররা বরং ডাক্তারদের সুনাম নষ্ট করেন।”

বটে! তবে মণ্ডপে অসুরের লাইনে নকল ডাক্তাররাই বা ছিল কেন? “কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ আর মাৎসর্যের প্রভাব থেকে কেউ মুক্ত হতে পারে না। মায়ের কাছে তাই ষড়রিপুর প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার প্রার্থনা করা হয়। সবার ভালো হোক। সেটাই প্রাথর্না।” উত্তর দার্শনিক বটে! তাই, নো আর্গুমেন্ট।

আর ডাক্তাররা? তাঁরা কী বলছেন? ডাক্তার কৌশিক দাস শহরের অত্যন্ত নামী বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িয়ে। তিনি খবর অনলাইনকে জানালেন, “বাস্তবিকই সমাজের অবক্ষয় হচ্ছে। এতে সন্দেহ নেই। সমগ্র ডাক্তারসমাজকে এ ভাবে অসুর সাজানো আদতে নিন্দনীয়।”

নেহাতই শিল্পীর কল্পনা নাকি ডাক্তারদের এতে ভুল নেই কোনও? “আসলে ইনফাস্ট্রাকচারের ভুলত্রুটি এড়াতে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। সরকারি হাসপাতালে মানুষ না গিয়ে কেন বেসরকারি হাসপাতালে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতে ছোটে? এ সব দিক থেকে নজর ঘুরিয়ে এখন ডাক্তার অসুর সাজানোর মতো হাস্যকর এবং নিকৃষ্ট কাজ করা হচ্ছে।”

কিন্তু ডাক্তাররা মানুষের সহমর্মিতা কম পাচ্ছেন কেন? ডাক্তার দাস জানালেন, “কিছু অংশের ডাক্তাররা নিশ্চয়ই আর্থিক লাভক্ষতি দেখেন। অধিকাংশই নন। সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে নিশ্চয়ই তাঁরাও আছেন। আফটার অল, তাঁরা তো সমাজের বাইরে নন। আর সত্যি, এক জন ডাক্তার, তিনি আসল হোক বা নকল হোক, রোগীর প্রাণ বাঁচাতে সবাই আপ্রাণ এবং আন্তরিক চেষ্টা করেন। তাতে কোনো দ্বিমত নেই। রোগীকে ভালো না বাসলে চিকিৎসা করা যায় না। এটাই মানুষ বুঝতে চায় না। সেই ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক আর নেই এখন। এটাই দুঃখজনক। বাড়ির কাউকে আর ডাক্তারি পড়াতেও ভয় পাবেন অভিভাবকেরা। যা যুগ আসতে চলেছে, এটাই হবে।”

মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে যে যা-ই বলুন না কেন, অসুর আছে এবং থাকবে। ঘরে-বাইরে এবং পুজোমণ্ডপেও। রগড় জমে উঠেছে। জমে উঠেছে পুজোও। বাঙালি উল্লাসে বলছে, অসুর থাকবে কতক্ষণ, অসুর যাবে বিসর্জন!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here