chitteshwari tample
payel samanta
পায়েল সামন্ত

‘দোষ কারও নয় গো মা…।’ কাশীপুর চিৎপুর রোড ধরে ঘুরতে ঘুরতে প্রথমেই কানে এল পান্নালাল ভট্টাচার্যের এই গানটা। তার পরেই তো স্থানীয় লোকজনের মুখে শুনলাম ডাকাতে দুর্গা চিত্তেশ্বরীর কথা। শহর কলকাতায় ডাকাতে দুর্গা? স্ট্রেঞ্জ!

ভিড়ে থিকথিক করছে তখন রাস্তাটা। পুজোর হোর্ডিঙে ছেয়ে গিয়েছে শহরের মুখ। রাস্তার ধারে এগরোল-চাউমিনের ঠেলাগাড়িতে চোখ আর মনের যৌথ অবরোধ। এমন পরিস্থিতিতে কী করে কল্পনা করব, ঘনজঙ্গলে ডাকাতের হাতে পুজো পাচ্ছেন দেবী দুর্গা! তাই, দোষ আমারও নয় মা!

chitteshwari durga
চিতে ডাকাতের দুর্গা।

কাশীপুর পোস্ট অফিসকে বাঁ হাতে রেখে এগোতেই সন্ধান পেলাম সেই মন্দিরের। কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরির মূল ফটকের কাছেই চিত্তেশ্বরীর মন্দির। ডাকাত সর্দার চিত্তেশ্বর রায় ওরফে চিতে ডাকাতের আরাধ্যা দেবী বলেই তিনি চিত্তেশ্বরী। মহালয়ার দিন থেকে শুরু হয়ে গিয়েছে তাঁর পুজো। প্রথা মেনে অঙ্গরাগ, প্রাণপ্রতিষ্ঠা এবং চক্ষুদানের পর ষষ্ঠীতে মূল পুজোর অনুষ্ঠান শুরু হবে।

সে বহুকাল আগের কথা, লোকশ্রুতি। মা দুর্গার স্বপ্নাদেশ পেয়ে গঙ্গার জলে ভেসে আসা নিম কাঠ থেকে মা চণ্ডীর বিগ্রহ তৈরি করেন ডাকাত সর্দার। তখন কলকাতা তো আর আজকের কলকাতাতে ছিল না! কাশীপুরে গঙ্গার নির্জন পাড়ে বড়োজোর গুটিকয় মৎসজীবী-ধীবরের বাস। চব্বিশ পরগনা আর কলকাতার এই অঞ্চল তখন সুন্দরবনেরই বর্ধিষ্ণু অঞ্চল ছিল। জলাজঙ্গলের রাজত্বে বাঘেরও উৎপাত নেহাত কম ছিল না। তাই চিত্তেশ্বরীর মন্দিরে বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়ের মূর্তি চোখে পড়ল। দেবী দুর্গার পুজোর আগে এখনও তিনিই পুজো পান। প্রতিমা খুঁটিয়ে দেখুন, পায়ের কাছে একটি বাঘ দেখতে পাবেন। চিতে ডাকাতের মৃত্যুর পর অনেক বছর দেবী জঙ্গলে নিভৃতিতে ছিলেন। তাঁকে উদ্ধার করেন তান্ত্রিক সাধক নৃসিংহ ব্রহ্মচারী। মন্দিরের ভেতরেই একটি বোর্ডে এ সমস্ত ইতিহাস লেখা আছে।

সত্যিই কতটা ইতিহাস? কলকাতা বিশেষজ্ঞ হরিপদ ভৌমিক বলেন, “ওখানে চিতে ডাকাতের ডেরা ছিল। শোনা যায়, এক সময় সেখানে নরবলিও হত। তবে সময়ের বিচারে ওটাই যে খুবই প্রাচীন, সেটা বলা যায়।” চিত্তেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা ১৬১০ সালে। তখন থেকে ধরলেও এই পুজো আদতে কলকাতা নগরী পত্তনের আগেকার।

থিমের ঘনঘটার থেকে অনেকটা আড়ালে কলকাতার এই আদি দেবী। পায়ের কাছে সবুজ রঙা অসুরকে দলন করলেও দেবীর চেহারা অসুরদলনীসুলভ রুদ্রমূর্তি নয়। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর এই দারুকাঠের মূর্তি বাংলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তির বিষয়। জমিদার মনোহর ঘোষ তৈরি করেন চিত্তেশ্বরীর আজকের মন্দিরটি। অনুমান করা যেতে পারে, মন্দির তৈরির আগে দেবীর অধিষ্ঠান ছিল গাছতলা বা পাতার কুটিরে। হালিশহরের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের উত্তরপুরুষ কাশীশ্বর রায়চৌধুরী ও ইন্দ্রা রায়চৌধুরী এই মন্দিরের এখনকার সেবাইত।

frontal view of chitteshwari temple
চিত্তেশ্বরী মন্দির।

মন্দিরের ভেতরের লেখা দেখেই জানতে পারলাম এই চিৎপুর রোড দেবীর নাম অনুসারেই হয়েছে। ঘন জঙ্গলে ঠাসা সেই আদি চিৎপুর এলাকা আর নেই। তবে চিত্তেশ্বরী মন্দিরের ভেতরে চিতে ডাকাতের নরবলি দেওয়ার জায়গাটা এখনও আছে। মন্দিরের চাতালে পা রাখলে বেশ একটা গা ছমছমে অনুভূতি হয়। পুজোর দিন অতিথি সমাগমে মন্দির গমগম করে। অতীতে বেশ কয়েক বার রামকৃষ্ণদেব এখানে এসেছেন। এসেছেন আরও বিশিষ্টজনেরা। তবু শহরের জাঁকজমক থেকে দূরে চিত্তেশ্বরী পুজোর এই ক’টা দিনও একা থাকেন যেন!

সারা বছরের নিত্যপুজোর ভোগ, আরতির মাঝেও নিজেকে এই উৎসবের শহরে ব্রাত্য মনে হয় কি তাঁর? কর্পোরেটধন্য উৎসবের আশীর্বাদে এলাকার অন্যান্য পুজোর মতো জৌলুস এই মন্দিরে নেই। তবে রীতি মেনে আয়োজনে নিষ্ঠার অভাব নেই – মোষ বা ছাগবলির প্রথা এখন আর নেই। বদলে চালকুমড়ো, শসা, বাতাবি ইত্যাদি ফল বলি দেওয়া হয়। এমনকি ভোগে রয়েছে যথেষ্ট অভিনবত্ব। সপ্তমীতে ভোগে থাকে সাত ভাজা, অষ্টমীতে আটভাজা এবং নবমীতে একই রকম ভাবে থাকে নয়ভাজা। মা মাছের ভোগ পান নবমীতে। পেঁয়াজ–রসুন ছাড়া ধনে-জিরে দেওয়া এই মাছের ভোগে থাকে রুইমাছ। এ ছাড়া তিন দিনে খিচুড়ি, পোলাও, আলু-পটলের ডালনা, ছ্যাঁচড়া, আলুর দম, চাটনি, পরমান্ন, মিষ্টির লম্বা তালিকা তো আছেই।

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন