payel samanta
পায়েল সামন্ত

এই শহরের ভিতরেই আছে আরেকটা শহর। বহু ব্যবহারে এই বাক্যবন্ধটা ক্লিশে হয়ে গেলেও এর তাৎপর্য মোটেই কমেনি। প্রতিবার দুর্গাপুজো এলে সেটা দিব্যি অনুভব করা যায়।

৩০০ বছরের থেকেও প্রাচীন এই মহানগরের অলিগলিতে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস। সারি সারি পুরোনো দেওয়াল ভেঙে পড়া খিলান, নোনা ধরা ইঁটে সে সব ইতিহাস লেখা আছে। কলকাতার পুজোয় যখন থিম নিয়ে মাতামাতি তখন কিছুটা আড়ালেই থেকে যায় ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বনেদি বাড়িগুলো। কলকাতার এই সব ঠাকুরদালানে চলুন ঘুরে আসি, যেখানে অধিষ্ঠাত্রী ব্যতিক্রমী দশভূজা।

প্রথমেই যাব এমন এক বাড়িতে যেখানে দুর্গা আদতে দশভুজা হলেও তিনি দ্বিভুজা রূপে দৃশ্যমান। নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশনে নেমে যদুবাবুর বাজারের পাশ দিয়ে সোজা হেঁটে যান মিনিট পাঁচ-ছয়েক। পদ্মপুকুর রোড ধরে সোজা গেলে একটা তেমাথা পাবেন। তার ঠিক বাঁ হাতে একটা বাড়ি আপনার নজর কাড়বে। মস্ত বড় কাঠের দরজা ষষ্ঠী থেকে চারদিন অবারিত থাকে সকলের জন্য। ১২৫ বছরে পড়ল ভবানীপুরের এই মিত্রবাড়ির দুর্গোৎসব। কলকাতা শহরে এমন ব্যতিক্রমী প্রতিমা খুঁজে পাবেন না। আগেই বলেছি, দেবীর দুটি হাত দৃশ্যমান। বাকি আটটা হাত রয়েছে, কিন্তু দেখা যায় না। এই ছোট আটটি হাত রয়েছে কাঁধের উপরে। দেবীর চুলের আড়ালেই সেটা ঢাকা পড়ে যায়। তাই মিত্রবাড়ির সোঁদা গন্ধ মাখা দালানে এসে দাঁড়ালে এই প্রতিমা আপনাকে চমকে দেবে। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবেন লক্ষ্মী ও সরস্বতীর কোনও বাহন নেই। উমার দুই কন্যাই পদ্মাসনা। সিংহের মুখ ঘোড়ার মতো। এমন ঘোটকমুখী সিংহ বাংলার অনেক বাড়িতেই দেখা যায়। মনে করা হয়, ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক এই ঘোড়া। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতীককেই দেবীর বাহন করা হয়েছে।

ভবানীপুরের মিত্র বাড়ির দুর্গা প্রতিমা

কলকাতার বনেদি বাড়ির প্রতিমার বিশিষ্টতা গণেশ ও কার্তিকের স্থান পরিবর্তনে। এর নমুনা আপনি পেতে পারেন কুমোরটুলি স্ট্রিটের কবিরাজ বাড়িতে। ঋদ্ধি-সিদ্ধি-বুদ্ধির দেবতা গণেশ সাধারণত মায়ের ডানদিকে লক্ষ্মীর সঙ্গে থাকেন। বাঁদিকে থাকেন শৌর্য–বীর্যের দেবতা কার্তিক, সঙ্গে সরস্বতী। গঙ্গাপ্রসাদ সেনের বাড়িতে এর উল্টোটাই দেখতে পাবেন। বিধান সরণির লাহাবাড়ি, বউবাজারের দত্তবাড়িতে মহিষাসুরমর্দিনী নেই। এখানে দেবীর হরগৌরী মূর্তি। অর্থাৎ শিবের সঙ্গে পার্বতী। বিডন স্ট্রিটে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়িতে উমা নিয়ে আসেন জয়া-বিজয়াকে।

দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ট্রিটে মল্লিক পরিবারে জয়া-বিজয়া আছেন। কিন্তু এখানে নেই লক্ষ্মী সরস্বতী। দেবীর গাত্রবর্ণে বৈচিত্র্য পাবেন সাউদার্ন অ্যাভিনিউয়ের রায় পরিবারে। দশভুজা শাস্ত্রমতে অতসী পুষ্পবর্ণা। অতসীর রঙ হলুদ হয়, নীলও হয়। রায় পরিবারের ব্যতিক্রমী দুর্গা নীল বর্ণের।

এই শহরেই আছে সোনার দুর্গা। ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির কাছে হালদারদের নাটমণ্ডপ। দেবীর অভয়ামূর্তি একাধিক জায়গায় দেখা যায়। বৈঠকখানা রোডের নীলমণি সেনের বাড়িতে যেমন। দ্বিভুজা দেবী রয়েছেন বরদানের মুদ্রায়। ভবানীপুরের মিত্রবাড়ির মতোই অসুরদলনী নন। অভয়ামূর্তির দেখা পাবেন ঝামাপুকুরের চন্দ্রবাড়িতেও।

Bhawanipur_Dey-Bari-durga idol
ভবানীপুরেরে দে বাড়ির দুর্গা প্রতিমা

ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যে কলকাতার সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রতিমা কোনটি? এই প্রশ্নটা উঠলে আমার ভোট পাবে ভবানীপুরের দে বাড়ি। ফুলমালার ডোরে দেবী বাঁধা পড়ার আগে যদি তাঁর পায়ের নীচে অসুরটিকে দেখেন, আপনার তাক লেগে যাবে! এ তো অসুরের মতো দেখতে নয়, অথচ বুকে বিদ্ধ দেবীর ত্রিশূল। মহিষাসুরের পরনে কালো লম্বা ঝোলা কোট, তাতে পকেটও রয়েছে। সঙ্গে কালো বুট। একঝলক দেখলেই বোঝা যায়, এ অসুর নয়, মানুষের প্রতিকৃতি। আরও স্পষ্ট করে বললে এক ব্রিটিশের মূর্তি। ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী আর্য-অনার্যদের মতো কালো চুল নয় তার। অসুরের সোনালি চুল দেখে মনে পড়বে রবার্ট ক্লাইভকে। দে পরিবারের উত্তরসূরিদের এমন মূর্তির ইতিহাস জানা নেই। তবে দেখেই বোঝা যায়, ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোনও কারণে বিরোধ তৈরি হয়েছিল সুতোর ব্যবসায়ী দে পরিবারের। তাই এই অসাধারণ মূর্তির ভাবনা। এই প্রতিমা শাসকের বিরোধিতায় স্বাধীনতা স্পৃহার এক অনন্য উদাহরণ।

ছবি: লেখক

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন