nabapalli, chittaranjan park
হরপ্রসাদ সেন

এক সময়ে বাংলার বাইরে দুর্গাপুজো বলতে বোঝাত পটনা, লখনউ, কানপুর, ইনদওর বা মুম্বইয়ের পুজো। পরবর্তীকালে দিল্লির প্রবাসী বাঙালিদের আয়োজিত পুজোগুলোর কাছে এই সব শহরের পুজো কিছুটা মলিন হয়ে গিয়েছে। দিল্লিতে কালীবাড়ির সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে দুর্গাপুজোর সংখ্যা। দিল্লি বা তার চার পাশের দুর্গাপুজোগুলো জাঁকজমক বা আতিশয্যে কলকাতার পরেই স্থান পেতে পারে। এ বছরও আয়োজিত হচ্ছে হাজারখানেক দুর্গাপুজো।

নিউদিল্লি কালীবাড়ি বা দিল্লি দুর্গাপূজা সমিতির দুর্গাপুজো বেশ প্রাচীন। শতাধিক সাল পুরোনো এই দুর্গাপুজো দিল্লিবাসীর কাছে এখনও আকর্ষণীয়। ৩০-৩৫ বছর আগে দিল্লির বেশির ভাগ পুজো আয়োজিত হত শহরের মধ্য বা উত্তরে সরকারি আবাসন এলাকায়। সেই সব দুর্গাপুজো এখনও ধুমধামের সঙ্গে আয়োজিত হলেও নতুন গড়ে ওঠা বেসরকারি কলোনির দুর্গাপুজোর কাছে তাদের হার মানতে হচ্ছে। মিন্টো রোড, মাতাসুন্দরী, কারোলবাগ, সরোজিনীনগর, লোধি কলোনি, মোতিবাগ – এই সব পুরোনো পুজোর প্রতিটিরই ৬৫ থেকে ৭০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। দিল্লির পুজো ছড়িয়ে আছে চিত্তরঞ্জন পার্ক থেকে দ্বারকা কিংবা সাকেত থেকে তিমারপুর। প্রতিটি পূজামণ্ডপ দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা মুশকিল। তবুও এদের মধ্যে এ বার নজর কাড়ছে বেশ কয়েকটি পুজো।

entrance gate of dakshin delhi kalibari puja
দক্ষিণ দিল্লি কালীবাড়ি পুজোর প্রবেশদ্বার।

কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছে দক্ষিণ দিল্লি কালীবাড়ি। দক্ষিণ দিল্লি কালীবাড়ি এ বছর তাদের দুর্গাপুজোর ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। বিশাল প্যান্ডেলে কোনো থিমের প্রভাব না থাকলেও একটা সুরুচির ছাপ অবশ্যই আছে। তোরণদ্বারটি খুবই আকর্ষণীয়। দেবীর মূর্তি একচালা, সম্পূর্ণ ডাকের সাজের। শিল্পীরা সবাই পশ্চিমবঙ্গের। মন্দিরচত্বর এক ক’দিন শুধু উৎসবমুখরই থাকবে না, হয়ে উঠবে মিলনমেলার প্রাঙ্গণও। স্বর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মন্দিরপ্রাঙ্গণ ও আশেপাশের বিশাল এলাকা আলোকমালায় সজ্জিত হয়ে উঠেছে। প্রতি সন্ধ্যায় থাকছে নামীদামি শিল্পীদের বিচিত্রানুষ্ঠান।

matrimandir, delhi
মাতৃমন্দির।

অনতিদূরে দক্ষিণ দিল্লির আর-এক বড়ো কালীমন্দির, ‘মাতৃমন্দির’। শিল্পনৈপুণ্যের ছোঁয়া এই কালীবাড়ির দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল ও প্রতিমায়। এ বছরে এদের থিম ‘নারীশক্তি’। খেলাধূলা, সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক জগতে বিশিষ্ট নারীদের অবদান তুলে ধরা হয়েছে। সকাল থেকে শেষরাত পর্যন্ত জমে থাকছে মন্দিরপ্রাঙ্গণ। ভোজনরসিকদের জন্য ‘মাতৃমন্দির’ প্রতি বছর একটা পুরো পার্ক জুড়ে বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্টলের আয়োজন করে থাকে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এখানেও কলকাতা থেকে আসা শিল্পীরা মন্দিরপ্রাঙ্গণ ভরিয়ে তুলছেন তাঁদের সুরের মূর্ছনায়।

দক্ষিণ দিল্লি থেকে পৌঁছে যাই দিল্লির ‘মিনি কলকাতায়’। স্থানীয় মিডিয়া চিত্তরঞ্জন পার্ককে ‘মিনি কলকাতা’ বলেই অভিহিত করে। এখানকার প্রতিটি দুর্গাপুজোই আকর্ষণীয়। আধুনিকতা ও সাবেকিয়ানার মেলবন্ধনে ফুটিয়ে তোলা হয় মণ্ডপসজ্জা। কলকাতার মতো থিম না থাকলেও শিল্পনৈপুণ্যে মণ্ডপগুলো আকর্ষণীয় চেহারা নেয়। এখানে প্রায় ১২-১৩টা দুর্গাপুজো হলেও মন কেড়ে বেয় শিবমন্দির, কো-অপারেটিভ, বি ব্লক আর মেলাগ্রাউন্ডের পুজো।

entrance, nabapalli
নবপল্লির প্রবেশদ্বার।

তবে ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে নবপল্লির পুজো এ বছর একটা বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। মণ্ডপের প্রবেশদ্বার তৈরি করা হয়েছে বেলুড় মঠের আদলে। সরকাঠি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এর তোরণ। ব্যবহৃত হয়েছে আইসক্রিমের কাঠিও। শিল্পীরা কলকাতারই। কর্মকর্তারা জানালেন, এ বছর ওঁদের যতটা খরচা হচ্ছে তত ডোনেশন আসেনি। তবু আপ্রাণ চেষ্টা করছেন রৌপ্যজয়ন্তী বর্ষের পুজোকে সর্বতোভাবে সফল করে তোলার। মণ্ডপের প্রবেশমুখে প্রায় ৩০০ মিটার লম্বা রাস্তা স্থানীয় শিল্পীরা রং-তুলির ছোঁয়ায় ভরিয়ে তুলেছেন। পঞ্চমীর দিনই আয়োজিত হয়েছে ‘আনন্দমেলা’।

প্রায় এক কোটি টাকা বাজেটের ‘শিবমন্দির’-এর পুজো চিত্তরঞ্জন পার্কবাসীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। এখানেই শিল্পীরা একচালার প্রতিমা তৈরি করেন। মণ্ডপসজ্জায় খুব বেশি আধুনিকতার ছোঁয়া না থাকলেও খুবই দৃষ্টিনন্দন। মন্দিরপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করার জন্য একটু ধৈর্যের প্রয়োজন। কারণ, দর্শনার্থীদের লাইন বেশ দীর্ঘ হয়ে থাকে এখানে।

স্বল্প দূরের ‘মেলাপ্রাঙ্গণ’-এর পুজোয় প্রবেশ করার সুযোগ মিললেও প্রতিমা দর্শনের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। এখানকার মূর্তি বা মণ্ডপ পরিকল্পনা একটু অন্য ধরনের। বিশাল মাঠ জুড়েই পুজোর আয়োজন। বিভিন্ন ধরনের খাবার ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের স্টল চার দিকে।

oikotan, dwaraka
দ্বারকার ঐকতান।

চিত্তরঞ্জন পার্কের পুজোগুলোর মতোই খরচ ও বহরে দ্বারকার পুজোগুলো কোনো অংশে কম নয়। এখানে বঙ্গীয় সমাজ, ঐকতান বা দক্ষিণায়ন-এর পুজো দ্বারকাবাসীর কাছে খুবই আকর্ষণীয়। মণ্ডপ তৈরি করা হয় কলকাতার অনুকরণে। কলকাতা ও মুম্বইয়ের শিল্পীরা জমিয়ে রাখেন রাতের অনুষ্ঠানগুলো।

দিল্লির প্রবাসী বাঙালিরা এ ভাবেই প্যান্ডেল হপিং করে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন পুজোর ক’দিন।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন