পায়েল সামন্ত

মিষ্টিপ্রিয় বাঙালির তো মিষ্টিজলের মাছেই আসক্তি। বিয়েবাড়ির পাতে রুই-কাতলা পড়ার বহর সেটাই বলে। কিন্তু গোল বাঁধে ইলিশকে নিয়ে। ইলিশের কদর কি আর আর পাঁচটা সামুদ্রিক মাছের মতো? নাকি মিষ্টি জলের মাছের মতো?

আর সমুদ্রের তটেই বা তার কদর কেমন? এটা জানতেই তো দিঘায় ঢুঁ দিলাম।

বলা ভালো, এ দিঘা ফি বছর দেখা শীতের রূপসী দিঘার চেয়ে আলাদা — বাসে-ট্রেনে, হাটে-বাজারে, হোটেলে-লজে… সর্বত্র ইলিশের আলোচনায় কল্লোলিত দিঘা। গত পাঁচ বছরে এমন ইলিশ ওঠেনি, কী স্বাদ! আগে কখনও এমন হরির লুটের মতো ইলিশ খেয়েছি বলে মনে পড়ে না — ইত্যাদি নিছকই ইলিশি আলাপ। এ হেন ইলিশি দিঘার রেস্তোরাঁগুলোও ইলিশের নানা পদে উল্লসিত এবং মুখরিত। রেস্তোরাঁর বাইরেই টাঙানো চার্টে সচিত্র ইলিশ কাহন। পাতুরি, বিরিয়ানি কিংবা সরষে বা দই সহযোগে ইলিশের লোভনীয় ছবি। ও সব দেখে কি আর ডাল-ভাত কিংবা কাতলার থালি অর্ডার দেওয়া সম্ভব? বিজনেস পলিসি ক্লিক করে ওতেই — এক পিস ইলিশ নিতেই হয় খদ্দেরকে।

দিঘার মোহনায় গেলে এমন বিজনেস পলিসি আপনি অনেক দেখবেন। আপনাকে ইলিশ কেনার জন্য অনেক খুচরো ব্যবসায়ীই ডাকাডাকি করবে। এ দিকে আপনার চোখে ও মনে তখন ভাসছে ইলিশ এবং ইলিশ। আর পাশ দিয়ে যেন অবচেতনের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে পাইকারি মাছের বাজার, বড়ো বড়ো বরফের চাঁই বা থার্মোকলের বাক্স আর ইলিশভর্তি গাড়ি। কিছুই চোখে পড়ছে না আপনার। আপনি ছুটে চলেছেন সমুদ্রের রুপোলি শস্যের দিকে।

দিঘার ইলিশের চেহারার বিবরণটা এক বার শুনে নিন। আমাদের শহরের বাজারে যে লম্বাপানা ইলিশ পাওয়া যায়, তার তুলনায় পেটের কাছটা চওড়া। একটু কল্পনা করুন মা দুর্গার ত্রিনয়নটা। সেই ত্রিনয়নটা যেন দিঘার ইলিশের মিনিয়েচার।

ইলিশ বোঝাই করে মাঝসমুদ্র থেকে যখন ট্রলার ফেরে, তখন তো বাঙালির ‘সোনার তরী’ সেগুলোই। ছোটোবেলায় কবিতাটা না বুঝে মুখস্থ করেছিলুম বটে, এখন ওই ট্রলার দেখে তার উপলব্ধি করেছি। ট্রলারগুলোতে ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী, আমারই সোনার ধানে (রুপোলি শস্যে?) গিয়েছে ভরি।’

ইলিশ ধরার জাল নিয়ে যারা মাঝসমুদ্রে যায়, তাদের ট্রলারেই মজুত থাকে চাঁই চাঁই বরফ। সমুদ্রবক্ষ থেকে ইলিশ তুলবে আর বরফ চাপাবে। এই নীতি। যা হোক, দিঘার বাজারে ‘কাঁচা ইলিশ, কাঁচা ইলিশ’ হাঁকাহাঁকি শুনে থমকে গেলাম। কাঁচা ইলিশের ঝোল শুনেছি, সে তো মা রান্না করে। মাছটাকে না ভেজে সিম্পল ঝোল যাকে বলে। বাজারে গিয়ে বুঝলাম কাঁচা মানে টাটকা ইলিশ, অর্থাৎ যাতে বরফ পড়েনি। কাঁচা ইলিশ খুঁজতে গিয়েই মোহনার মাছের আড়তে রাজকুমারের সঙ্গে আলাপ হল। সে পাইকারি আড়তদার। দাম কিছুতেই কমাবে না। কেজি প্রতি ৬০০ টাকা, ৫০০-তেও আছে। সবই ইলিশের টাটকাত্বের ওপর নির্ভর করে বই-কি! কেন বাপু, এত দাম কেন? আমাদের ডায়মন্ড হারবারের ইলিশ তো কত সস্তা। রাজকুমার হেসে বলল, “তফাতটা স্বাদে। এ ইলিশ মাত্র দু-তিন দিনের পুরোনো। তাই এর দাম বেশি।”

দিঘার টাটকা ইলিশের ওই তেল চুকচুকে শরীরী ভাষাই প্রমাণ করে তাদের টাটকাত্ব! হাতে ধরলে অনুভূতিটাই অন্য! রাজকুমারের মতে, ডায়মন্ড হারবারের ইলিশ সমুদ্র থেকে তোলা হয় অনেক আগে। অন্তত ২০-২৫ দিন আগে তো বটেই। ওদিককার ট্রলার অনেক অনেক দিন পর্যন্ত সমুদ্রে থাকে। তার পর যখন তীরে ফেরে তখনই ইলিশের স্বাদ কমে অর্ধেক হয়ে যায়। বরং দিঘার ছোটোখাটো নৌকাগুলো বেশি দূর যায় না। সামনাসামনি যা পায়, তাই নিয়ে চলে আসে, তাদের কাছেই কাঁচা ইলিশ মানে বরফ ছাড়া ইলিশের সন্ধান মেলে। আসলে ইলিশে বরফ দিতে হবেই। সেটা টাটকা ইলিশ না পুরোনো ইলিশ সেটাই হচ্ছে কথা!

নদিয়ার গৌরাঙ্গ দেবনাথ শুঁটকি আর নোনা ইলিশ বিক্রি করছিলেন মোহনার বালির উপর বসে। ২০০ টাকা প্রতি কেজি। “হাত দেবেন না, হাত দেবেন না। বড়োলোকের বেটির সোনার অঙ্গে হাত দেবেন না।” কেন? নোনা ইলিশের গা থেকে নুন ঝরে যাবে যে।

সত্যি, সেলুকাস! কি বিচিত্র এই দেশ!… আরে! ইলিশ তো জীবনের বেশির ভাগই সমুদ্রে কাটায়। ডিম পাড়ার জন্য সমুদ্রের নোনা জল থেকে ইলিশ যত উজানে যেতে থাকে তার শরীর থেকে আয়োডিন ও লবণ ঝরে যায়। যত মিষ্টি জলে থাকে ইলিশ তত স্বাদু হয়ে ওঠে আর তাকে নিয়ে বাঙালির আদিখ্যেতাও ততোধিক বেড়ে চলে। কাঁচা খাও, বরফে খাও, শুকিয়ে খাও।

যা হোক, মাথায় হাত বুলিয়ে রাজকুমার আড়াই হাজার টাকার মাছ গছিয়ে দিল আমায়। আরে! দিঘা থেকে কলকাতা কি দেখা যাচ্ছে? বাস, ট্রেন, মেট্রো, অটো — কত কী উজিয়ে আমি বাড়ি ফিরব। রাজকুমারের রাজ পরিবারের সদস্যকে নেব কী ভাবে? থার্মোকলের প্যাকেটের ব্যবস্থা থাকে মোহনার মার্কেটে। এ জন্য লোক অনবরত ঘোরাঘুরিও করে। রেটটাও বাঁধাধরা — প্রতি কেজি মাছে প্যাকিং চার্জ মাত্র ৬০ টাকা। থার্মোকলের বাক্সে মাছ ভরে বরফের আচ্ছাদনে ঢেকে সুন্দর করে প্যাকিং করে দেবে। তাতেও খসে গেল ৫০০ টাকার মতো।

ইলিশ ধরার জাল

ছোটো ইলিশ নিয়ে ‘বার্নিং কোয়েশ্চেন’ সাড়া ফেলেছে শিক্ষিত মহলে। এমনিতে নিজেকে শিক্ষিত বলে জানলেও স্রেফ ইলিশ খাওয়ার বেলায় অশিক্ষিত হয়ে যাই। তখন ২০০ টাকাতেই খোকা ইলিশ খেতে লাফ মারি! আমার সেই আমিত্ব বোধের হঠাৎ কী উত্তরণ ঘটল কে জানে, এত টাকার মাছ কিনে ফেললাম। বুকের মধ্যে কোনো মধ্যবিত্তসুলভ হিসেবনিকেশের ধুকপুক চলল না। সমু্দ্রের দরাজ হাওয়ার গুণ কিনা কে জানে! ভাবলাম, এ বার পুজোয় নতুন শাড়ি চাই না, বরং জমিয়ে সপরিবার ইলিশ খাওয়া যাবে। বাঙালির খাওয়া ছাড়া আর আছেটা কী! ষষ্ঠীতে একটু বেগুন দিয়ে কাঁচা ইলিশের কালোজিরে দিয়ে ঝোল। সপ্তমীতে ভাপা। অষ্টমীতে নিরামিষ বলে নবমীতে দুটো পদ। দিনে সর্ষে ইলিশ আর রাতে ইলিশ বিরিয়ানি। দশমীতে মায়ের বিদায় উপলক্ষে কাঁদতে কাঁদতে ইলিশ পাতুরিই চলবে। আবার একটা বছর পর মায়ের সঙ্গে দেখা হবে — মায়ের সঙ্গে ইলিশের স্মৃতিটাও পাটকাচা শাড়ির মতো তুলে রেখে দিতে হবে কিনা! সামনের বছর পুজোয় এমন ইলিশ খাওয়ার ভাগ্যি হবে কিনা কে জানে!

ছবি: লেখক

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন