মুসলমান বাদকদের নৈপুণ্যেেই জমে উঠেছিল মহিষাসুরমর্দিনী

0
515
contribution-of-muslim-instrumentalists-in-the-success-of-mahishasuramardini
শৈবাল বিশ্বাস

ছোটোবেলা থেকে শুনে এসেছি উলটোরথ হয়ে যাওয়া মানেই পুজোর ঢাকে কাঠি পড়া। তার মানে এ বারেও সেটা শুরু হয়ে গিয়েছে। আর পুজোর সেরা আগমনি তো সেই একই — বাঙালি সংস্কৃতিজীবনের অবিচ্ছেদ্য‌ অঙ্গ মহিষাসুরমর্দিনী। শুরু করা যাক মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠান সম্পর্কে অন্য‌ এক কাহিনি শুনিয়ে।

কিছু দিন আগেই ঘটে গিয়েছে বসিরহাটের মর্মান্তিক ঘটনা। আবার নতুন করে আমাদের ভাবতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গেরও বোধহয় সম্প্রীতির মন্ত্রের প্রয়োজন আছে। ১৯৯২-এর মর্মান্তিক ঘটনার পর কলকাতায় যা একটু ফ্য‌াসাদ হয়েছিল। কিন্তু রাজ্য‌ের সর্বত্র গণ্ডগোলের ঘটনা তো ঘটেনি। এ বারে গন্ধটা অন্য‌ রকম, তাই আমাদের চিরাচরিত পুজোর গল্প বলতে গিয়েও আনতে হচ্ছে দুই সম্প্রদায়ের মিলনের প্রশ্ন। এহ বাহ্য‌ বলে আর বিষয়টা আলাদা করে সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

অনেকেই জানেন না মহিষাসুরমর্দিনীর জনপ্রিয় সুরারোপের ব্য‌াপারে আকাশবাণী কলকাতার মুসলমান শিল্পীদের অবদান কতটা। তাঁরা অজ্ঞানে একটি ভুল করে না ফেললে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর অনবদ্য‌ আনুনাসিক কন্ঠের সুরেলা ধ্বনির মন্ত্রোচ্চারণ হয়তো শুনতে পেতাম না। আমরা আজকাল যাকে বলি ইউএসপি — অর্থাৎ মোদ্দা আকর্ষণ সেটাই বেমালুম হারিয়ে যেত মহালয়া থেকে। মোদ্দা আকর্ষণ তো অতি অবশ্য‌ই সেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অনবদ্য‌ সুরেলা মন্ত্রোচ্চারণ।

১৯২৭ কিংবা ২৮ সালে রেডিও-র আড্ডায় তখনকার দিনের রেডিওর কর্তা নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদারের আগ্রহে এবং প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ, বাণীকুমারদের সোৎসাহ প্রেরণায় মহিষাসুরমর্দিনী শুরু হল। লেখার দায়িত্ব পড়ল বাণীকুমারের ওপর আর চণ্ডীপাঠের দায়িত্ব নিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। এর মধ্য‌ে কেউ এক জন খুঁত ধরে বলেছিলেন, কায়েতের ছেলে আবার চণ্ডীপাঠ করবে কী হে? বীরেন্দ্রকৃষ্ণের বয়ানে শোনা যাক সে দিন নৃপেনবাবু কী বলেছিলেন – “প্রোগ্রাম করবে আবার বামুন-কায়েত কী হে? আমরা কি হিন্দুর মন্দিরে গিয়ে পুজো করছি? তা হলে আমাদের এই প্রোগ্রামে যারা বাজাবে তারা তো অর্ধেক মুসলমান, খুশি মহম্মদ, আলি, মুনশি সবাই তো বাজাবে, তা হলে তাদের বাদ দিয়ে ব্রাহ্মণদের ডেকে আনতে হয়। তা ছাড়া আমরা একটা বিরাট উৎসবের আগে ভূমিকা হিসেবে এই প্রোগ্রাম করব। এতে কার কী বলার আছে? প্রোগ্রামটা আসলে লিখবে তো একজন বামুন, কী বল হে বাণী?” লেখক বাণীকুমার হেসে বলেছিলেন, বীরেন ছাড়া আর কাউকে তিনি চণ্ডীপাঠ করতে দেবেন না।

এই অসাম্প্রদায়িক পরিবেশেই মহিষাসুরমর্দিনীর ভাবনার সূত্রপাত।

বাস্তবিক সে দিন সারেঙ্গি বাজিয়েছিলেন মনশি, চেলো বাজালেন তাঁর ভাই আলি, হারমোনিয়ামে খুশি মহম্মদ। এ ছাড়াও আকাশবাণীর আরও কয়েক জন নিয়মিত মুসলমান বাদক সে দিন মহিষাসুরমর্দিনীর ধরতাই ধরেছিলেন। অন্যদের মতো তাঁরাও শুদ্ধ বসনে স্নান করে এসে অনুষ্ঠান শুরু করতেন।

মুসলমান যন্ত্রীদের বেশির ভাগই ছিলেন অবাঙালি। তাঁরা বাংলা বা সংস্কৃত কোনোটাই তেমন ভালো ভাবে জানতেন না। মহড়ার সময় কথা ছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ যখন শ্লোক আবৃত্তি করবেন তখন তাঁকে যন্ত্রীরা সুরের ধরতাই জোগান দেবেন। কিন্তু বাংলা গদ্য‌ আবৃত্তির সময় পিছন থেকে কেবলমাত্র রাগের আলাপ বাজাবেন। আসল অনুষ্ঠান শুরুর আগে রাইচাঁদ বড়াল মশাই সেটাই মুসলমান যন্ত্রীদের ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। যথারীতি প্রোগ্রাম শুরু হল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ শ্লোকাবৃত্তি করে, একটু থেমে বাংলা গদ্য‌ আবৃত্তি শুরু করলেন –‘আজ শুভ শারোদৎসব, জলে স্থলে প্রকৃতিতে আনন্দের বার্তা’ ইত্য‌াদি। এ দিকে সংস্কৃত শ্লোক ও বাংলা পার্থক্য‌ বুঝতে না পেরে উর্দুভাষী মুসলমান বাদকরা কথার সুরে সুরেই ধরতাই শুরু করে দিলেন। সবাই অবাক হয়ে দেখলেন গদ্য‌ের সুরের সঙ্গে তাঁদের বাজনা কী চমৎকার ভাবে মিলে যাচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে বাঙালি যন্ত্রীরা দেখছিলেন কী কাণ্ড ঘটছে। যখন দেখলেন অপূর্ব সেই কথা আর সুরের মেলবন্ধন, তখন তাঁরাও সুর মিলিয়ে বাজাতে শুরু করলেন। সমস্ত জিনিসটাই, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের ভাষায় ‘অখণ্ড সুরের প্রবাহে’ পরিণত হল। সব মিলিয়ে দিকে দিকে ধন্য‌ ধন্য‌ রব উঠল। অজস্র অভিনন্দনের বন্য‌া আর মুগ্ধতার বহিঃপ্রকাশ।

আরও পড়ুন: আশ্বিনের শারদপ্রাতে আলোকমঞ্জীর বেজে উঠলেই মনে পড়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে 

মুসলমান শিল্পীদের অনবদ্য‌ ‘ইনটিউশন’ বা সুরজ্ঞানের জন্য‌ই হয়তো মহিষাসুরমর্দিনীর অখণ্ড সুরপ্রবাহ জনপ্রিয়তার নতুন নিরিখ তৈরি করেছিল।

আজকের দিনে বড়ো বেশি করে সে কথা মনে রাখা দরকার।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here