আজ মহাষ্টমী, দেবী দুর্গার সন্ধিপূজা

0
495
preparation of sandhipuja
পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

মহিষাসুর বধের জন্য অর্থাৎ অশুভ শক্তি বিনাশের জন্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ত্রিবিধ শক্তি – সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের প্রতীক ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এলেন যোগীশ্রেষ্ঠ মুনিবর ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে। ঋষি কাত্যায়ন শুনলেন বৃত্তান্ত। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে অশুভ আসুরিক শক্তির প্রভাব ও তার দাম্ভিক পাশবিক অত্যাচারের সবিস্তার বিবরণ প্রকাশ করতে করতে দেবাদিদেব মহাদেবের ভ্রূকুটি সংকুচিত হতে লাগল, মুখমণ্ডল শ্বেতশুভ্র থেকে রক্তবর্ণ হতে লাগল, শংখ-চক্র-পদ্ম-গদাধারী শ্রীবিষ্ণুর ত্রিনয়ন হয়ে উঠল রক্তনয়ন আর পদ্মযোনি ব্রহ্মার চতুর্মুখ ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে বিস্ফারিত হয়ে উঠল। এই ত্রিদেবের সর্বাঙ্গ থেকে মহাতেজ বিচ্ছুরিত হতে লাগল।

একই সঙ্গে মহাঋষি কাত্যায়নের সারা অঙ্গ থেকে তেজপুঞ্জ রাশিকৃত হতে লাগল। কাত্যায়নের সেই হিমালয়স্থিত অগম্য ও অত্যন্ত গুঢ় আশ্রমে তিন দেবতা ও ঋষির সমূহ তেজঃরাশির সম্মিলিত রূপ থেকে জন্ম নীল এক নারীমূর্তি। সেই দেবী নারীমূর্তি স্পষ্ট হয়েই বিলীন হয়ে গেলেন ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে লালিতাপালিতা ঋষিবরের বালিকা-কন্যার শরীরের মধ্যে। যে বালিকা কাত্যায়নের কন্যা বলে পরিচিতা এবং তাঁর নাম ‘কাত্যায়নী’।

উপস্থিত ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এবং অন্য দেবতাগণ সহ ঋষি কাত্যায়ন সেই বালিকারূপী দেবীর আরাধনা স্তব শুরু করলেন। সে এক মহাসাত্ত্বিক, মহাজাগতিক, মহাআধ্যাত্মিক, মহাযৌগিক আরাধনার আবাহন। ব্রহ্মাণ্ডের দশ দিক আলোকিত স্বর্গীয় সুষমায়। নীরব-গভীর মন্ত্রের, ধ্যানের ধেয়ানে দশ দিশা প্লাবিত। ধ্যানমগ্ন সমস্ত দেবতা ও ঋষি দৈববাণীতে জানতে পারলেন যে মহামায়া আদ্যাশক্তি দেবী দুর্গা ‘কাত্যায়নী’ রূপে প্রকট হবেন সেই মহামঙ্গলদায়ক মহাশুভ মুহূর্তে, যে মুহূর্তটি হল মহাষ্টমীর অন্তিম ষাট পল এবং মহানবমীর অগ্র ষাট পলের ‘সন্ধিক্ষণ’।

ঋষি কাত্যায়ন প্রথমে এই দৈববাণীর কথা প্রকাশ করে দেবতাদের বললেন, মহাষ্টমীর অন্তিম ষাট পল এবং মহানবমীর অগ্র ষাট পলের সম্মিলিত একশো কুড়ি পলে কন্যা কাত্যায়নীর মধ্যেই মা দুর্গা প্রকটিত হবেন এবং তিনিই মহিষাসুর তথা অশুভ দাম্ভিক শক্তিকে বিনাশ করবেন। তাই সেই দেবীকে আরাধনা করা হোক সর্ব উপাচারে। এই মুহূর্তটিতেই দেবীর ‘সন্ধিপূজা’ হয়। ১০৮টি পদ্মফুল, ১০৮টি প্রদীপ দিয়ে দেবীকে প্রণাম জানানো হয়।

আরও পড়ুন: আজ মহাষষ্ঠী, দেবী দুর্গার ‘বোধন’

ত্রেতা যুগে এই সন্ধিপুজোর জন্য মহাবীর হনুমানকে ‘দেবীদহ’ থেকে ১০৮টি নীলপদ্ম তুলে আনতে বলেন রামচন্দ্র। মহাবজরংবলী তা নিয়েও আসেন। কিন্তু যথাবিহিত দেবীপূজার অকালবোধনের পরে সন্ধিপুজোর সময় রামচন্দ্র অর্ঘ্য দিতে গিয়ে দেখেন ১০৭টি নীলপদ্ম রয়েছে। যে হেতু তাঁর চক্ষুদু’টিকে নীলপদ্মাক্ষ বলা হয়, সে হেতু তখন তিনি দেবীর পূজা সম্পূর্ণ করার জন্য নিজের একটি চোখে তিরবিদ্ধ করে পুজো দিতে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে দেবী মা দুর্গা রামচন্দ্রের সামনে আবির্ভূতা হয়ে বললেন, তিনি রামচন্দ্রের ভক্তির পরীক্ষা করতে নিজেই একটি পদ্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন। অবশেষে দেবী প্রসন্না হলেন এবং রাবণকে বিনাশ করার জন্য শ্রীরামচন্দ্রকে তাঁর প্রকাশিত রূপ দেখালেন।

সন্ধিপূজার সেই রীতি প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আজও প্রবহমান। দুর্গাপূজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল এই সন্ধিপুজা। এক পল মানে ২৪ সেকেন্ড, ৬০ পল মানে ২৪ মিনিট। সুতরাং আজকের সময়ের নিরিখে মহাষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং মহানবমীর শুরুর ২৪ মিনিট, মোট ৪৮ মিনিট হল এই মহা সন্ধিপুজার সময়কাল।

স্মৃতিসাগর গ্রন্থে বলা হয়েছে –

“অষ্টম্যাঃ শেষো দণ্ডশ্চ নবম্যাঃ পূর্ব এব চ/অত্র য়া ক্রিয়তে পূজা বিজ্ঞেয়া সা মহাফলা।”

ঋণ স্বীকার: কমল কুমার ব্যানার্জি

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here