স্লগ ওভার অর্থাৎ কি না স্ট্রাইকিং জোনে ঢুকে পড়তে আর বেশি বাকি নেই। মানে আর ৩০ দিনও নেই। গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব, কেরলে যাকে নবরাত্রি বলে, হিমাচল প্রদেশের কুলু উপত্যকায় কুলু দশেরা, কর্নাটকের মহীশূরে মাইসোর দশেরা, তামিলনাডুতে বোম্মাই গোলু এবং অন্ধ্রপ্রদেশে যাকে বলে বোম্মালা গোলু, বাঙালির সেই চিরকালের দুর্গাপুজো নিয়ে কথাবার্তা তাই শুরু করে দিতেই হল।

চিরকালের বললাম বটে। কিন্তু সূর্যের আলো, বাতাসের চলাফেরার মতো কয়েকটা প্রাকৃতিক বিষয় ছাড়া চিরকালের বলে তো কিছু হয় না। সবই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালটায়, নতুন চেহারা নেয়। দুর্গাপুজোও আলাদা নয়। পৌরাণিক অকালবোধনের ঘটনা বলে আপনাদের বোর করার কোনও ইচ্ছেও নেই। কলকাতা, গোটা রাজ্য ও গোটা দুনিয়ায় হিন্দু বাঙালি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে যে চেহারার সর্বজনীন দুর্গোৎসবে  নিয়ম করে মেতে ওঠে, তার ইতিহাসটা আরও একবার মনে করে নেব।

যোড়শ শতক থেকেই বাংলার রাজবাড়ি ও জমিদার বাড়িগুলোয় শরতে দুর্গাপুজোর চল বাড়ে। এ ব্যাপারে কোনও কোনও মতে নদিয়ার দুই রাজার নাম পথিকৃৎ হিসেবে শোনা গেলেও, মূল জায়গা ছিল ছিল মালদা ও দিনাজপুর। কিন্তু সেসবই ছিল নিতান্তই পারিবারিক ব্যাপার। দুর্গাপুজো সামাজিক চেহারা নিতে শুরু করল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরে। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে জেতার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিফ অফিসার লর্ড ক্লাইভ ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য একটা উৎসব করতে চাইছিলেন। কিন্তু ততদিনে কলকাতার একমাত্র গির্জাটি ধ্বংস করে দিয়েছেন সিরাজ-উদ-দৌল্লা। এই অবস্থায় সাহেবের স্বপ্নপূরণে এগিয়ে আসেন শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেব। ১৭৫৭ সালে কলকাতার প্রথম দুর্গাপুজোটা শোভাবাজার রাজবাড়িতেই হয়। মেলা টাকা খরচও করা হয় বিনোদনের জন্য। হিন্দু উৎসবে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে প্রথমে দ্বিধা থাকলেও নাচার সাহেব শেষ অবধি দেবতাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য রাজবাড়ির দুর্গাকেই বেছে নেন। সেই থেকে ব্রিটিশদের খুশি করার জন্য দুর্গাপুজোয় তাদের নিমন্ত্রণ করা এবং রকমারি ফুর্তির সুযোগ করে দেওয়াটা রাজা, জমিদার, ব্যবসায়ীদের কাছে অবশ্য কর্তব্য ছিল ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। তারপর ব্রিটিশ গেছে, রাজত্বও গেছে, কিন্তু পুজো রয়ে গেছে। যদিও এই ইতিহাসটা সম্প্রতি অস্বীকার করেছে শোভাবাজার রাজবাড়ি। ২০১১ সালের পুজোর সময় বাড়ির সদর দরজায় নোটিশ দিয়ে এই ইতিহাস অস্বীকার করা হয়। কিন্তু পুজোর বয়স আড়াইশোরও বেশি হয়ে যাওয়ার পর কেন এ কাজ করার প্রয়োজন হয়ে পড়ল, সেটা রহস্যই থেকে গেছে। তবে ১৭৫৭ সালের পুজোর পর থেকে ব্রিটিশ অফিসার ও সৈন্যদের দুর্গাপুজোয় যাওয়া প্রসাদ খাওয়ার চল হয়ে গিয়েছিল। ১৭৬৫ সাল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিভিন্ন দফতরেও পুজো করা শুরু হয়। অনেকের মতে, হিন্দুদের রাজনৈতিক ভাবে কাছে টানার জন্যই দেখা দেয় কোম্পানির এই দুর্গাভক্তি।sova-in

বারোয়ারির (যা আজ পরিবর্তিত হয়ে সর্বজনীন) ইতিহাসটা অন্য। ১৭৯১, মতান্তরে ১৭৬০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ১২ জন ব্রাহ্মণ বন্ধু চাঁদা তুলে দুর্গাপুজো করেন, সেই থেকে বারোয়ারি পুজোর চল শুরু। কোনো একটা বাড়ির পুজোয় তাদের অংশ না নিতে দেওয়ায় ক্ষোভে, প্রতিবাদে তাঁরা এ কাজ করেছিলেন বলে জানা যায়।  কলকাতায় এ ধরনের পুজো প্রথম করেন কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ ১৮৩২ সালে। সেই বারোয়ারি পুজো সর্বজনীন পুজোয় পরিণত হয় ১৯১০ সালে। বাগবাজারের, মতান্তরে ভবানীপুরের সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভায় এই পুজোয় বহু মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও জুড়ে যায় দুর্গাপুজো। সব মানুষের মেলবন্ধন, দুর্গাকে দেশমাতা হিসেবে আবাহন করার ধারা শুরু করেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। উনিশ শতক থেকে শুরু হলেও  দুর্গাপুজো হিন্দু বাঙালির সংস্কৃতির অচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে বিশ শতকেই।

এখন অবশ্য হিন্দু বাঙালির সীমানা পেরিয়ে আরও ছড়িয়ে পড়েছে শারদোৎসব। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ব্রিটিশদের সঙ্গে দেশীয় প্রজাদের সম্পর্ক, এদেশের সামন্ত প্রভু ও বানিয়াদের স্বার্থ ইত্যাদি জুড়ে যে দুর্গাপুজোর উৎসব হয়ে ওঠা, তা এখন আরও অনেক অনেক বড় আকারে দেশি বিদেশি বাণিজ্যিক সংস্থার মৃগয়াক্ষেত্র।

উৎসবে গা ভাসাতে এসব কিছুই জানার দরকার নেই। তবু যদি কখনও কারও মনে কোনও প্রশ্ন জাগে, ম্যাডক্স স্কোয়ারের আড্ডায় গল্পের বিষয় কম পড়ে যায়, তাই খবর অনলাইনে এসব রইল, আরও অনেক ওয়েবসাইটের সঙ্গে। হ্যাপি পূজা ইন অ্যাডভান্স।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here