আজ মহাষষ্ঠী, দেবী দুর্গার ‘বোধন’

0
594
goddess durga
পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

আজ দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠী। এই দিনে কালীঘরে গিয়ে তো বটেই, অন্য সময়েও প্রায়ই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ একটি গান আপনমনে গাইতেন। গানটির পদকার ছিলেন দেওয়ান রঘুনাথ রায়। গানটির শেষ পংক্তিটি হল – “উপায় না দেখি আর, অকিঞ্চন ভেবে সার, তরঙ্গে দিয়ে সাঁতার, দুর্গা নামের ভেলা ধরি।।”

দুর্গা নামের ভেলা ধরতে হবে। শ্রীশ্রীচণ্ডীর একাদশ অধ্যায়ের অংশে মহাঋষিগণ দেবীর স্তব করেছেন। তাঁরা এই শক্তিরূপার মঞ্জুল শোভা (স্বর্গীয় সৌন্দর্য) প্রত্যক্ষ করেছেন। স্মরণ করেছেন, “সিংহস্থা শশীশেখরা মরকতপ্রেক্ষাঃ চতুর্ভিভুজৈঃ, শঙ্খং চক্র ধনু শরাংশ্চ দধতিনেত্রৈঃ স্থিভিঃশোভিতা, আমুক্তাঙ্গদ হারকঙ্কন রণংকাঞ্চী কন্বংনূপুরা –দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী, ভবতুয়ো রত্নোলস্যৎকুন্তলা।”

প্রতি পদক্ষেপে মহামায়া দুর্গাকে স্মরণ করেছেন – “ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিরণন্তবীর্যা/বিশ্বাস্য বীজং পরমাসি মায়া/সম্মোহিতং দেবি সমস্তশেতৎ/ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তি-সিদ্ধিহেতুঃ।।”

মা সিংহবাহিনী, তোমার শক্তি, তোমার বীর্য অনন্ত অপার। তুমিই ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের জগৎপালিনি শক্তি। এই ব্রহ্মাণ্ডের তুমি আদির আদি কারণ মহামায়া। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডজগৎকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছ; কিন্তু তুমি প্রসন্না হলে শরণাগত মুক্তিসিদ্ধি লাভ করে। এই হল বোধনের আদি মন্ত্র।

‘বোধন’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল ‘বোধ’-এর ‘অনট্‌’ ধাতু – অর্থাৎ জাগ্রত করা – অপরা জগতের ‘ধী’শক্তি দিয়ে পরাজাগতিক মহাশক্তিকে বোধিত্বে অর্থাৎ জাগ্রত অবস্থায় অধিষ্ঠিত করা, প্রতিষ্ঠিত করা।

সত্য যুগে দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া দুর্গার বসন্তকালে বোধন করেছিলেন রাজর্ষি সুরথ। তাঁর সঙ্গী ছিলেন সমাধি বৈশ্য। সময়টি ছিল চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষ। একে আমরা বাসন্তীপূজা বলি। দেবীর বোধনের আলোচনা পাওয়া যায় মৎস্যপুরাণ, মার্কেণ্ডয়পুরাণ, শ্রীশ্রীচণ্ডী, দেবীপুরাণ, কালিকাপুরাণ এবং দেবী ভাগবতে।

পরবর্তী যুগে অর্থাৎ ত্রেতা যুগে রাবণও চৈত্র মাসে দেবী দুর্গার বোধন এবং আরাধনা করতেন। কিন্তু রামায়ণের কাহিনি অনুসারে লঙ্কা থেকে সীতাকে উদ্ধারের জন্য যে রাম-রাবণের অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধ, সেখানে রাবণকে বধ করার জন্য রামচন্দ্রকে দেবীর শরণাপন্ন হতে হয়। দেবাদিদেব মহাদেবকে কঠোর তপস্যায় তুষ্ট করে রাবণ বর লাভ করেছেন। দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপের একনিষ্ঠ সাধক ও পূজারি হলেন রাবণ। যুদ্ধক্ষেত্রে মহাকালী স্বয়ং রাবণকে নিজের কোলে স্থান দেন। এ হেন রাবণকে বধ কী করে হবে? রাম পড়লেন দুশ্চিন্তায়। দেবরাজ ইন্দ্রদেবও দুশ্চিন্তায়। এ দিকে অশুভশক্তি অহংকারী দাম্ভিক রাবণের বিনাশ ঘটবে রামের  হাতে, এই হল দৈববাণী। তাই দেবতারা প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণ নিলেন। তখন মহামায়া একাক্ষরী আদ্যাদেবী মা দুর্গা সমাধিনিদ্রায় নিদ্রিতা। ব্রহ্মা স্বয়ং তাঁর পুজো করে তাঁকে তুষ্ট করে উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। দেবী বললেন, রামচন্দ্রকে ‘বোধন’ করতে বলো। তবেই রাবণকে বধ করার জন্য তিনি রামকে সাহায্য করবেন।

রামকে দেবীর নির্দেশের কথা বললেন ব্রহ্মা ও ইন্দ্র। যদিও সময়টা শরৎকাল – রামচন্দ্র নিজের হাতে দেবী দুর্গার মূর্তি তৈরি করে পুজো করলেন, অকালে বা অসময়ে প্রকট হওয়ার জন্য দেবী দুর্গার আরাধনা করলেন।

ব্রহ্মা স্বয়ং দুর্গার বোধনপূজা করেন। পূজার প্রারম্ভে স্বয়ং প্রজাপতি পদ্মযোনি ব্রহ্মা দেখেছিলেন সাগরের বালুকাবেলার অনতিদূরে গভীর অরণ্যের প্রান্তসীমায় একটি বিল্ববৃক্ষের নীচে একটি আট থেকে দশ বছরের বালিকা আপন মনে খেলছে। ব্রহ্মা ধ্যা্নস্থ হয়ে জানলেন, সেই বালিকাই স্বয়ং গৌরী – কন্যকা। ব্রহ্মা চোখ মেলতেই সেই বালিকা ওই বিল্ববৃক্ষে লীন হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মা স্থির করলেন, দেবী দুর্গার সেই বোধনের পূজার্চনা হবে ওই বিল্ববৃক্ষের নীচে। তাই আজও দেবীর বোধনের পূর্বে বিল্বশাখা বা বিল্ববৃক্ষকে পূজা করে তা প্রতিষ্ঠিত করতে হয় দেবীর মৃন্ময়ী বিগ্রহের মহাঘটে। শুরু হয় ‘বোধন’-এর আরাধনা, বেজে ওঠে শঙ্খ, ঢাক।

তাই বোধন হল মহাপূজায় দেবী মা দুর্গার প্রারম্ভিক আবাহন, যা প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে পরম্পরাগত ভাবে প্রবহমান। বসন্তকালের সঙ্গে ত্রেতা যুগে যুক্ত হল শরৎকাল – অর্থাৎ অকালে হল দেবীর বোধন, তাই এ হল অকালবোধন।

উচ্চারণ করি বোধনের মন্ত্র –

রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানু গ্রহায় চ/অকালে ব্রহ্মনা বোধো দেব্যাস্ত্বয়ি কৃতঃ পুরা। অহমপ্যাশ্বিনে ষষঠ্যাং সায়াহ্নে বোধয়ামি বৈ।।

ঋণ স্বীকার: কমল কুমার ব্যানার্জি    

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here