শৈবাল বিশ্বাস

সর্বপ্রথম শহর কলকাতায় সর্বজনীন দুর্গোৎসবের পত্তন হয় কোথায়? সিমলা পাড়ায় নাকি বাগবাজারে?

দু’ তরফই লম্বা ইতিহাসের ফিরিস্তি নিয়ে হাজির। তুলনামূলক বিচারে কাকে এগিয়ে রাখা যায় সে দায়িত্ব আপাতত পাঠকের ওপরই ছাড়া থাক, আসুন আমরা এই ফাঁকে একটু দেখে নিই দু’টি পুজোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। তবে গোড়াতেই একটা কথা জেনে রাখা ভালো দু’টি পুজোই কিন্তু শুরু হয়েছিল জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের হাত ধরে। শক্তি আরাধনার সঙ্গে জাতীয় চেতনার যে ধারা ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের চরমপন্থী পর্ব থেকে শুরু হয়েছিল তারই উত্তরসূরি হিসাবে উত্তর কলকাতার দুই প্রাচীন পাড়ায় দু’টি প্রাচীন সর্বজনীন পুজোর জন্ম হয়।

আগে আসি সিমলা ব্য‌ায়াম সমিতির কথায়

সিমলা ব্য‌ায়াম সমিতির পুজোর সূত্রপাত হয় বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসুর হাত ধরে। তিনি ছিলেন অরবিন্দ ঘোষের শিষ্য‌। ঘনিষ্ঠ ছিলেন বাঘা যতীন প্রমুখ বিপ্লবীদের। বাঙালি যুবকদের শরীরচর্চায় উৎসাহ দিয়ে তাঁদের বিপ্লবমুখী করে তোলার জন্য‌ তাঁর হাত ধরেই সিমলা ব্য‌ায়াম সমিতির প্রতিষ্ঠা। ১৯২৬ সালে ব্য‌ায়াম সমিতির মাঠে প্রথম পুজোর আয়োজন করা হয়। সেই সময় সর্বজনীন কথাটি খুব একটা প্রচলিত ছিল না। অতীনবাবুই প্রথম এই শব্দটি জনপ্রিয় করেন। অতীনবাবুর উৎসাহে সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, রাজেন দেব, সুরেশ মজুমদার, মাখনলাল সেন প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব এই পুজোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ব্য‌ায়াম সমিতির সঙ্গে জড়িত একাধিক নেতা পুলিশের খাতায় বিপজ্জনক ব্য‌ক্তি হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন। ডালহাউসি বোমা মামলায় গ্রেফতার হন সিমলা ব্য‌ায়াম সমিতির সদস্য‌ ডাঃ নারায়ণচন্দ্র রায়। এই পুজোর প্রথম পুরোহিত ছিলেন সাংবাদিক চপলাকান্ত ভট্টাচার্য। প্রথম প্রতিমাশিল্পী নিতাই পাল। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ সরকার সিমলা ব্য‌ায়াম সমিতির পুজোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এলাকার মানুষদের চাপে সেই নিষেধাজ্ঞা ওঠে ১৯৩৪-এ। অতীন্দ্রনাথের পর এই পুজোর হাল ধরেছিলেন তাঁর জ্য‌েষ্ঠপুত্র অমরেন্দ্রনাথ বসু। তিনিও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৩৯ সালে প্রথম এই পুজোর প্রতিমা রূপায়ণে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আগে দুর্গাপ্রতিমা হত একচালা। কিন্তু সে বছর সিমলা ব্য‌ায়াম সমিতি প্রথম আলাদা আলাদা প্রতিমা গড়ল। অর্থাৎ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ— সব আলাদা। সেই থেকে একই প্রতিমা প্রতি বছর চলে আসছে।

এ বার বাগবাজার

বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনীর সূত্রপাত ১৯১৯ সালে। তখন অবশ্য‌ এই পুজোর নাম ছিল নেবুবাগান বারোয়ারি দুর্গাপুজো। এই হিসাব মাথায় রাখলে বাগবাজারের পুজো আগামী ২০১৯-এ শতবর্ষে পা রাখবে। সে যা-ই হোক, ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম এই পুজো অনুষ্ঠিত হয় নেবুবাগান ও বাগবাজার স্ট্রিটের সংযোগ স্থলে সরকারদের বাড়িতে। পরে ১৯২৪ সালে পুজো সরে এল বাগবাজার স্ট্রিট আর পশুপতি বসু লেনের সংযোগস্থলে। ১৯২৭ সালে পুজো হয়েছিল বাগবাজার কালীবাড়িতে। ১৯৩০ সালে এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত হন জাতীয়তাবাদী নেতা তথা তৎকালীন কলকাতা পুরসভার অল্ডারম্য‌ান দুর্গাচরণ বন্দ্য‌োপাধ্য‌ায়। তাঁরই উদ্য‌োগে পুজো উঠে আসে কর্পোরেশনের মাঠে। তৎকালীন মেয়র সুভাষচন্দ্র বসু সানন্দে এই অনুমতি দেন। শুধু পুরসভার মাঠ ব্য‌বহার করতে দিয়েছিলেন তা-ই নয়, পুরসভা তখন বাগবাজারের এই পুজোয় চাঁদাও দিত।

দুর্গাচরণের উদ্য‌োগে পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয় দেশীয় শিল্প সম্পর্কিত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী। সেখানে দেশীয় উদ্য‌োগগুলিকে আমন্ত্রণ করে জায়গা দেওয়া হত। বলা বাহুল্য‌ এ থেকেই বোঝা যায় কারা এই পুজোর উদোক্তা ছিলেন। বস্তুত পক্ষে এই পুজোর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বিপ্লবী এবং কংগ্রেসের সুভাষপন্থী অংশ। নেতাজি সুভাষচন্দ্র স্বয়ং ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসবের সভাপতি হয়েছিলেন।

তর্কটা ঠিক কোথায়?

হিসাব অনুযায়ী সত্য‌িই তো বাগবাজার অনেকটাই এগিয়ে তাদের এ বার ৯৮ বছর অন্য দিকে সিমলার ৯২। কিন্তু সিমলার কর্মকর্তারা সেটা মানেন না। তাঁদের বক্তব্য‌, ১৯৩০ সালের আগে তো আর বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী নাম ছিল না। তখন বাগবাজারের পুজো হিসাবে তার পরিচয় থাকলেও সেটি ছিল অজ্ঞাতকুলশীল উদ্য‌োগ।

অন্য‌ দিকে বাগবাজারের পুজোকর্তারা বলেন, ১৯১৯ সালে যাঁরা এই পুজো শুরু করেছিলেন তাঁরাই এটির নাম-সম্প্রসারণ করেন। এই নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। শুধুমাত্র নাম-সম্প্রসারণ এবং স্থান পরিবর্তনের জন্য‌ একটা পুজোর ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে? বাগবাজারের পুজোর উদ্দেশ্য‌-বিধেয় তো আর পরিবর্তিত হয়নি। কাজেই ধারাবাহিকতা মেনে স্বীকার করতেই হবে এই পুজো শুরু হয়েছিল ১৯১৯ সালে। তারাই কলকাতার সব চেয়ে প্রাচীন পুজো।

আপনি কী বলেন?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন