wrivuশ্রয়ণ সেন

“আমরাই কলকাতার প্রথম থিম পুজো।”

বর্ষীয়ান অভয়বাবুর মুখ থেকে এই কথাটা শুনে আমি রীতিমতো স্তম্ভিত। কলকাতার যে গুটিকয়েক সাবেকি পুজোর অস্তিত্ব এখনও আছে তার মধ্যে বাগবাজার অন্যতম। সেই বাগবাজারের পুজোর সভাপতিই, অভয় ভট্টাচার্যই কি না বললেন এটা থিম!

“কেন থিম বলছি জানতে চাও?”

“হ্যাঁ নিশ্চয়ই, বলুন”।

“কারণ, বনেদি বাড়ির চার দেওয়াল থেকে বার করে এনে, দুর্গাপুজো যে রাস্তায়ও করা যায় এবং তাতে যে সমাজের সব স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারেন, এই থিমের পথ প্রদর্শক তো আমরাই”।

১৯১৮ সালে ৫৫, বাগবাজার স্ট্রিটে লেবুবাগান বারোয়ারি নামে যে পুজোর সূচনা হয়, সেটাই আজকের বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী। ১৯১৮-তে পুজোর সূচনা হলেও তার দু’তিন বছর আগে থেকেই এই পুজোর বীজ বোনা শুরু। এর পেছনে রয়েছে বিশাল এক শ্রেণি দ্বন্দ।

দুর্গাপুজো তখন ধনী, বনেদি বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পুজোর আয়োজনে ওতপ্রোতভাবে লেগে পড়তেন পাড়ার স্থানীয় যুবকরা। এঁরা কেউ একেবারে দরিদ্র নন, আবার শিক্ষিতও বটে। কিন্তু বনেদি বাড়ির মানুষজন তাঁদের নিজেদের সমতুল্য মনে করতেন না। ১৯১৫ সালে, এমনই এক বাড়িতে পুজোর আয়োজন চলাকালীন কাজ করতে করতে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত কয়েকজন যুবক প্রথম পাতেই খেতে বসে পড়েছিলেন। এই ব্যাপারটি ভালো চোখে দেখেননি ওই বনেদি বাড়ির লোকজন। তাঁরা ওই যুবকদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। ওই বছরই নয়, এমন ঘটনা ঘটে তার পরের বছরও। এরপরই যুবকরা ঠিক করেন নিজেরা পুজোর আয়োজন করবেন। যেমন কথা, তেমন কাজ। এই ভাবেই পথ চলা শুরু করল লেবুবাগান বারোয়ারির।bbj

লেবুবাগান বারোয়ারি থেকে বাগবাজার সর্বজনীনের গল্প বললেন অভয়বাবু। লেবুবাগানে ২-৩ বছর পুজোর পর, কপিবাগান, কাঁঠালতলা হয়ে ১৯৩০ সালে বাগবাজারের এই মাঠে সরে এল এই দুর্গাপুজো। ততদিনে স্বাধীনতা সংগ্রাম তীব্রতর হচ্ছে। এমন সময় ১৯৩০ সালে কলকাতা পৌরনিগম দখল করেন স্বদেশিরা। মেয়র হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। হেমন্ত বসু, দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুশীল ভট্টাচার্যের মতো ব্যক্তিত্বরা যাঁরা এই পুজোর সাথে যুক্ত, তাঁদের এই মাঠেই পুজো নিয়ে আসতে বলেন দেশবন্ধুই।  

১৯৩৬ সালে ‘বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী’ হিসেবে সরকারের খাতায় নথিভুক্ত হয় এই পুজো।

“প্রদর্শনী কেন”?

কারণ তখন অসহযোগ আর স্বদেশি আন্দোলন তুঙ্গে। এই অবস্থায় প্রধানত দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই স্বদেশি দ্রব্য বিক্রি আর আন্দোলনের ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে আরও উজ্জীবিত করার জন্য এই প্রদর্শনী। এভাবেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে এই বাগবাজার সর্বজনীন।

কিন্তু বারোয়ারি থেকে সর্বজনীন হল কী ভাবে?

এর উত্তরও লুকিয়ে আছে সেই তিরিশের দশকেই। বারোয়ারি কথাটার অর্থ বোঝায় বারো বন্ধুর আয়োজন করা, সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ বোঝায় না। এই তত্ত্ব থেকেই বারোয়ারি থেকে সর্বজনীন হল বাগবাজারের পুজো।

এখনও পর্যন্ত বাগবাজারের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই যে এই পুজোর মূলমন্ত্র তা বলতে কোনোরকম দ্বিধা করলেন না অভয়বাবু — “গত বছর এখানে প্রণামি জমা পড়েছে দেড় লক্ষেরও বেশি টাকা। এতেই বুঝতে পারছ মানুষ, এখনও এই পুজোটাকে কতটা ভালোবাসে”- গর্বিত ভাবে বললেন তিনি। স্বদেশি দ্রব্য বিক্রি করার জন্য নিজেদের উদ্যোগে শুরু করা এই প্রদর্শনী, আজ বাগবাজার পুজোর আয়ের এক প্রধান মাধ্যম। পুজো বাবদ আয় হওয়া প্রণামি এঁরা কখনও ভারত সেবাশ্রমকে দান করেন, কখনও বা নিজেরাই বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করেন।

তবে এখন থিম পুজো বলতে যা বোঝায়, বাগবাজার সে সবের ধার ধারে না। তা সত্ত্বেও ভিড় করেন মানুষ, বিশেষ করে নব প্রজন্মের অনেকের কাছেই বাগবাজারের আকর্ষণই আলাদা। অভয়বাবুর কথায়, সাবেক প্রতিমার রূপ, এই পুজোর বিশেষ ইতিহাস, এ সবের টানেই মানুষ আসেন, ভিড় করেন, অষ্টমীর অঞ্জলিও দেন। কিন্তু তা বলে, এখনকার থিম পুজোর সাথে দ্বন্দে যেতে নারাজ বাগবাজার। 

বাগবাজারের দুর্গাপ্রতিমার বিশেষত্ব হল ঠাকুর এক চালার। মণ্ডপেই চলছে প্রতিমা গড়ার কাজ। গত ৫০ বছর ধরে এই কাজে নিযুক্ত ‘জিতেন পাল অ্যান্ড সন্স’। আরেকটা বিশেষত্ব হল, প্রতিমা গড়ার সময়কালে পুজোর সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তিই প্রতিমার কাছে যেতে পারেন না। তিনি যদি যেতে চান তাহলে প্রতিমা শিল্পীদের থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। সপ্তমী, অষ্টমী আর নবমী, তিন দিনই কুমারী পুজো হয় এখানে। তবে কোনো কারণে যদি সপ্তমী আর নবমীতে কুমারী পুজো না-ও হয়, তাহলেও অষ্টমীতে কুমারী পুজো করতেই হয়। দশমীর দিন সিঁদুরখেলাও এখানকার বিশেষ আকর্ষণ। ওই দিন দুপুর থেকে এলাকার শুধু নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই মহিলারা আসেন সিঁদুরখেলায় মেতে ওঠার জন্য। ওই দিন রাতেই নিরঞ্জন হয়ে যায় প্রতিমা।     

স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার জন্য এখানে বীরাষ্টমী ব্রত আয়োজন করা হত। অর্থাৎ অষ্টমীর দিন যুবকদের মধ্যে অস্ত্র খেলার আসর হত। এখন আর অস্ত্রখেলার কোনো বালাই নেই, কিন্তু প্রতীকী একটা লড়াই হয়। বীরাষ্টমী প্রথা এখন আর না থাকলেও, বীরদের সম্মান এখনও জানানো হয়। পড়াশোনায় বীর যারা। প্রত্যেক বছর একাদশীর দিন এলাকার মেধাবি ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনা দেন অভয়বাবুরা।

অভয়বাবুর সাথে আলাপচারিতা প্রায় শেষ হওয়ার মুখে। এমন সময় এক কলেজ ফেরতা তরুণী মাটির প্রতিমার দিকে হাতজোড় করে নমস্কার করল।

“ঠাকুর তো তৈরিই হয়নি এখনও, প্রণাম কীসের?” সস্নেহে ওই তরুণীকে বললেন অভয়বাবু।

“না, বাগবাজারের ঠাকুরের বিশেষত্বই আলাদা। এখানে এলে মনে অদ্ভুত একটা ভালো লাগা চলে আসে”, তাঁর উত্তরের সঙ্গে সহমত হলাম আমিও। 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here