bagbazar puja
শ্রয়ণ সেন

“প্রতিমার যা রূপ, যেন জীবন্ত। এই প্রতিমা না দেখলে মন ভরে না।”

একচালার সাবেক প্রতিমার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকতে নিজের মনে বলে উঠলেন বরানগরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব নীলিমা সরকার। স্বামী অজয়বাবুকে নিয়ে চলে এসেছেন বাগবাজার সর্বজনীনের ঠাকুর দেখতে। তবে কলকাতার আর কোনো ঠাকুর দেখবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন তাঁরা।

“শহরের বেশির ভাগ পুজো মানেই তো থিম আর প্রতিযোগিতার লড়াই। সেই একাত্মতার ছোঁয়া তো কোথাও পাই না। কিন্তু বাগবাজারের প্রতিমা একবার প্রাণভরে না দেখলে হয় না।” মণ্ডপ ছাড়ার আগে বলে গেলেন অজয়বাবু। আগামী দিনে তাঁদের প্ল্যান কলকাতার বাইরে গ্রামাঞ্চলের ঠাকুর দেখা।

এই হল বাগবাজার। শতবর্ষে ছুঁতে চলা পুজোটির থিম হল সাবেকিয়ানাই। আর এই থিমের টানেই চলে আসে কলেজপড়ুয়া তরুণ-তরুণী থেকে ষাটোর্ধ্ব সরকারদম্পতি। প্রতিমাকে পেছনে রেখে সেলফির ধুমও চোখে পড়ার মতো। ঠিক এমনই এক কলেজপড়ুয়া তরুণের সঙ্গে কথা হল। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে প্যান্ডেল হপিং-এ বেরিয়েছে সে। গড়িয়ানিবাসী ওই তরুণের মহাষষ্ঠীর প্যান্ডেল হপিং কিন্তু বাগবাজার থেকেই শুরু।

-“এখানে তো থিমের ছোঁয়া নেই, ঠাকুর একেবারে সাবেক, তবুও এখানে কেন এসেছ?”

-“ছোটোবেলা থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাগবাজারে চলে আসতাম। সেই ট্র্যাডিশন এখনও বজায় রেখেছি। সত্যি কথা বলতে থিমের ঠাকুর দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাই।” সাফ জবাব ওই তরুণের।

এখনকার নবপ্রজন্ম কিন্তু বাগবাজারের ইতিহাস সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল নন। এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে এক দিকে যেমন স্বাধীনতা আন্দোলনের যোগসূত্র রয়েছে, তেমনই যোগ রয়েছে বিশাল এক শ্রেণিদ্বন্দের। সংক্ষিপ্ত ভাবে সেই ইতিহাসের সরণিতে হেঁটে আসা যাক।

bagbazar

১৯১৮ সালে ৫৫, বাগবাজার স্ট্রিটে নেবুবাগান বারোয়ারি নামে যে পুজোর সূচনা হয়, সেটাই আজকের বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী। ১৯১৮-তে পুজোর সূচনা হলেও তার দু’তিন বছর আগে থেকেই এই পুজোর বীজবোনা শুরু। এর পেছনে রয়েছে শ্রেণিদ্বন্দ।

দুর্গাপুজো তখন ধনী, বনেদি বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পুজোর আয়োজনে ওতপ্রোত ভাবে লেগে পড়তেন পাড়ার স্থানীয় যুবকরা। এঁরা কেউ একেবারে দরিদ্র নন, আবার শিক্ষিতও বটে। কিন্তু বনেদি বাড়ির মানুষজন তাঁদের নিজেদের সমতুল্য মনে করতেন না। ১৯১৫ সালে, এমনই এক বাড়িতে পুজোর আয়োজন চলাকালীন কাজ করতে করতে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত কয়েক জন যুবক প্রথম পাতেই খেতে বসে পড়েছিলেন। এই ব্যাপারটি ভালো চোখে দেখেননি ওই বনেদি বাড়ির লোকজন। তাঁরা ওই যুবকদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। ওই বছরই নয়, এমন ঘটনা ঘটে তার পরের বছরও। এর পরই যুবকরা ঠিক করেন নিজেরা পুজোর আয়োজন করবেন। যেমন কথা, তেমন কাজ। এই ভাবেই পথ চলা শুরু হল নেবুবাগান বারোয়ারির। নেবুবাগানে ২-৩ বছর পুজোর পর, কপিবাগান, কাঁঠালতলা হয়ে ১৯৩০ সালে বাগবাজারের মাঠে সরে আসে এই দুর্গাপুজো। নাম হয় বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী।

কিন্তু প্রদর্শনী কেন?

তিরিশের দশকে অসহযোগ আর স্বদেশি আন্দোলন তুঙ্গে। এই অবস্থায় স্বদেশি দ্রব্য বিক্রি আর আন্দোলনের ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে আরও উজ্জীবিত করার জন্য এই প্রদর্শনী। এ ভাবেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে এই বাগবাজার সর্বজনীন।

যাই হোক ইতিহাসের পাতা থেকে ফিরে আসা যাক বর্তমানে। আজও প্রাকস্বাধীনতা যুগের ঐতিহ্য বহন করে আসছে বাগবাজার। এখন সে ভাবে স্বদেশি দ্রব্যের প্রদর্শনী হয়তো নেই, কিন্তু মাঠ জুড়ে মেলা বসেছে। রয়েছে খাওয়াদাওয়ার হরেক আয়োজন, রয়েছে বিনোদনমূলক ব্যবস্থাও।

তবে পরিবর্তন নেই প্রতিমায়। পঞ্চাশ বছর আগেও যে একচালার প্রতিমা ছিল, এখনও তাই রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতেও যে এই পুজোয় থিমের ছোঁয়া লাগবে না তা এখনই বলে দেওয়া যায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here