জীবন্ত ‘দশভুজা’দের হাত ধরে পুজো এল পাখরিডাঙায়

0

titas_paulতিতাস পাল, জলপাইগুড়ি

‘শাপে হল বর’। বহুবার শোনা এই প্রবাদই সত্যি হয়েছে জলপাইগুড়ি জেলার প্রত্যন্ত পাখরিডাঙা গ্রামের ক্ষেত্রে। এবং তা হয়েছে গ্রামের জীবন্ত ‘দশভুজা’দের হাত ধরে। 

জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের পাখরিডাঙা গ্রাম। সব মিলিয়ে ৪০০ পরিবারের বাস এখানে। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নীম নদী। ওপারে বর্ধিষ্ণু গ্রাম আমবাড়ি। এত দিন পাখরিডাঙায় কোনো দুর্গাপুজো হত না। ছোটো গ্রাম। এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র। তাই চাঁদা তুলে পুজো করার সামর্থ ছিল না তাদের। তাছাড়া এলাকায় নেই কোনো ক্লাবও, যারা উদ্যোগ নিয়ে পুজোর আয়োজন করবে। তাই দুর্গাপুজো হোক বা অন্য কোনো পুজো, এই গ্রামের লোকেদের ভরসা নীম নদীর ওপারে আমবাড়ি গ্রাম। বর্ধিষ্ণু এলাকা হওয়ায় এখানে গোটা তিনেক দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়। তাই পরিবার, সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে আমবাড়ি যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না এই গ্রামের লোকেদের। 

titas-durga-2কিন্তু এবারে তাতেও বাধ সেধেছিল প্রকৃতি। গত বর্ষায় নীম নদীর বাঁশের সাঁকোটি পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছে। নতুন করে আর তা তৈরি হয়নি। নদীতে বুক সমান জল। স্বাভাবিক ভাবেই ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েকে নিয়ে হেঁটে নদী পার হয়ে পুজো দেখতে যাওয়া অসম্ভব। তাই বেজায় মন খারাপ হয়ে ছিল কচিকাঁচাদের। স্কুলে পুজোর ছুটি ঘোষণা হয়ে গেলেও মনমরা তারা। আকাশে পেঁজা তুলোর লুটোপুটি জানান দিয়েছে মায়ের আগমনবার্তা। কিন্তু কাশবনে ছুটোছুটি ভুলে ঘরের কোণে চুপটি করে বসে বিগত বছরের ঢাকের তালে নাচার দৃশ্য মনে করার চেষ্টায় কচিকাঁচাগুলি। তাদের ছলছল চোখ মুখ দেখে ততোধিক মন খারাপ বড়োদেরও। ৮ থেকে ৮০, সকলেই যেন ভুলে গিয়েছে হাসতে। কিন্তু করারই বা কী আছে?

কিন্তু মন খারাপ করে তো বসে থাকলে তো চলবে না। বাচ্চাগুলোর মুখের হাসি ফিরিয়ে দিতেই হবে। আর এ কাজ একমাত্র মায়েদের পক্ষেই সম্ভব।  শেষ পর্যন্ত সব মন খারাপ ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মহিলারাই। সিদ্ধান্ত নিলেন, এতদিন যে আনন্দ থেকে বঞ্চিত ছিল গোটা গ্রাম, এবার তাঁরাই সেই আনন্দ নিয়ে আসবেন গোটা গ্রামে। তাঁদের সিদ্ধান্ত, গ্রামেই হবে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আরাধনা। শুধু এবছর নয়। এখন থেকে প্রতি বছরই নিয়মিত হবে পুজো। তৈরি হল ‘মহিলা শক্তি সমিতি’। সদস্য গ্রামেরই ২৫ জন গৃহবধূ।

titas-durga-1প্রথম দিকে যদিও একটু আপত্তি উঠেছিল। পুজো করার টাকা কোথা থেকে আসবে, প্রশ্ন ছিল অনেকের। কিন্তু মহিলাদের এই ‘দশভুজা’ রূপ দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন গ্রামের সকলেই। ঠিক হল, জোরজুলুম নয়, যে যা পারবে, ততটুকুই চাঁদা দেবে। যারা আর্থিক সাহায্য করতে পারবে না তারা জমির সবজি, চাল, ডাল দিয়ে সাহায্য করবে, যা দিয়ে হবে মায়ের ভোগ। ব্যাস, কেল্লা ফতে। গ্রাম জুড়ে শক্তি কমিটির ‘মায়েদের’ জয়জয়কার। শুরু হয়ে গেল চাঁদা তোলা। বেশি নয়,  বাজেট ২১ হাজার টাকা। তাতে কী! নিজের গ্রামে পুজো, নিজেদের পুজো। আনন্দই আলাদা। মহাপঞ্চমীর দিন সন্ধ্যায় ঢাকের তালে নাচতে নাচেতে  নিয়ে আসা হল মা দুর্গার প্রতিমা। শুরু হয়ে গেল আরাধনা। চারদিকে পুজোর গন্ধ। মণ্ডপে খুশিতে লুটোপুটি কচিকাঁচাদের। ঢাকের তালে তালে মেতে উঠেছে বড়োরাও। আড্ডা-গল্প-খুনসুটিতে ভরে উঠেছে পুজোর দিনগুলি। দারিদ্র ভুলে এই ক’টা দিন শুধু আনন্দ। পুজোর পর সকলে মিলে এক সঙ্গে খিচুড়ি-তরকারি ভোগ খাওয়া। এই তো চাওয়া ছিল এতদিনের। তা পূরণ হয়েছে। আর যাদের হাত ধরে এই স্বপ্নপূরণ হল, সেই মালতী বর্মণ, জুঁই রায় ?  এদের ছাড়া কি সম্ভব ছিল এই আনন্দ? তাই মণ্ডপে দেবীদুর্গার পাশাপাশি তাদের নামেও জয়ধ্বনি উঠছে বারবার। এই মায়েদের হাত ধরেই তো গ্রামে এসেছেন ‘মা’। আসবেন প্রতি বছর। 

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here