ডঃ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়
রেজিস্ট্রার আইআইইএসটি, শিবপুর

প্র: উচ্চমাধ্যমিকের পর পড়ুয়ারা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে কেন?

উ: ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আসার পেছনে মূলত দু’টি কারণ থাকে। প্রথমত, কোনো কোর্সে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের মাথায় থাকে, পড়ার শেষে কাজের সুযোগ কতটা? এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার তুলনায় ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চার বছরের কোর্সের শেষে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, ইঞ্জিনিয়ারিং এমন একটা বিষয়, যা আমাদের রোজকার জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, অর্থাৎ আমাদের দৈনিক যাপনে এর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব খুবই প্রকট। স্বাভাবিক ভাবেই বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং-কে বেছে নেওয়ার প্রবণতাও বেশি।

প্র: বর্তমানে আমাদের দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর ছবিটা কেমন?

উ: আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আর এই সব কলেজের অধিকাংশেই ভর্তির ক্ষেত্রে, পড়ুয়ার মেধার তুলনায় তাদের অভিভাবকদের ক্যাপিটেশন ফিজ দেওয়ার ক্ষমতাটাই প্রাধান্য পায়।  ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে লোন নেওয়ার রীতি প্রচলিত থাকলেও সেই ক্ষমতাও সীমিত পরিবারের থাকে। স্বভাবতই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী পড়ুয়াদের মধ্যে আজকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার আগ্রহ কমছে। দেশের আইআইটি এবং এনআইটিগুলো বার্ষিক ১ লক্ষ টাকার কম আয়ের পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের জন্য টিউশন ফি মকুবের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বেসরকারি কলেজ তেমন কোনো নীতি গ্রহণ করেনি এখনও।

প্র: সার্বিক ভাবে আমাদের দেশে ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির বাজার বর্তমানে কেমন?

উ: ভারতবর্ষ প্রতি বছর যে সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে, তার সংখ্যাটা কিন্তু এখনও চিন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। প্রাক স্বাধীনতা পর্বে প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হত, তাই বেকারত্বের কোনো সমস্যাই ছিল না। নব্বই দশকের শুরুতে উচ্চ শিক্ষায় বেসরকারিকরণ আসতে থাকে। এখন তো সারা রাজ্যে প্রচুর বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ খুলেছে, যাদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই। এ ছাড়া রাজ্যে (সারা দেশের ছবিটাও পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় খুব কিছু আলাদা নয়) শিল্পের সুযোগ ক্রমশ কমছে। সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম যে পরিষেবা প্রয়োজন, দেশের প্রতিটা মানুষের কাছে যদি তা পৌঁছে দেওয়া যেত নিয়মিত, তা হলে কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মেই ইঞ্জিনিয়ারদের কাজের জায়গাটা অনেক বেশি প্রশস্ত হতে পারত। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। এত কিছু সত্ত্বেও বলব, বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার তুলনায় ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চাকরির বাজার বেশি প্রশস্ত এবং অনেক তাড়াতাড়ি চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা।

প্র: সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়তে গেলে জয়েন্টে যে র‍্যাঙ্ক দরকার, সব পড়ুয়ার তো তা থাকে না। সে ক্ষেত্রে বেসরকারি কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হবে?

উ: কলেজের পরিকাঠামো (মূলত ল্যাবোরেটরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি) কী রকম এবং শিক্ষক হিসেবে কারা রয়েছেন একটু খোঁজ নেওয়া দরকার। প্রতিষ্ঠান ৮/১০ বছরের পুরোনো হলে প্রাক্তনীদের সঙ্গে কথা বলা খুব জরুরি। তাঁদের কেমন প্লেসমেন্ট হয়েছে, শুধু তা দেখলেই চলবে না। চাকরির স্থায়িত্ব কতটা তা-ও জানা দরকার। আজকাল বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে পড়ুয়াদের প্রথম প্লেসমেন্টের ব্যবস্থা করে দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে সব চাকরি স্থায়ী হয় না। একেবারে নতুন প্রতিষ্ঠান হলে দেখে নেওয়া দরকার সেখানে শিক্ষক হিসেবে কারা নিযুক্ত হয়েছেন, তাঁরা যথেষ্ট অভিজ্ঞ কি না ইত্যাদি।

আর একটা ব্যাপার মাথায় রাখা দরকার, ইঞ্জিনিয়ারিং মানে শুধুই পাঠ্যবই মুখস্থ করা নয়। সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি না থাকলে এক জন ভালো ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায় না। তাই কলেজ বাছাই-এর সময় এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের বিষয়টাও মাথায় রাখা দরকার। বিতর্ক, নাটক, খেলাধুলা, গান ইত্যাদি এক জন ভবিষ্যতের ইঞ্জিনিয়ারের সার্বিক বিকাশে সাহায্য করে।

প্র: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ভালো কলেজে পড়বে বলে পছন্দের শাখার সঙ্গে আপোস করে পড়ুয়ারা। এই প্রবণতা কতটা ঠিক?

উ: এ ক্ষেত্রে পড়ুয়ার যদি কোনো বিশেষ শাখার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রতি প্যাশন থাকে, সে ক্ষেত্রে সেটা নিয়েই পড়ার জন্য র‍্যাঙ্কিং-এ একটু পিছিয়ে থাকা কলেজেও ভর্তি হওয়া যেতে পারে। কিন্তু ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানের পরিবেশটাই এমন হয়, যা এক জন পড়ুয়াকে এগিয়ে যেতে বেশ কিছুটা সাহায্য করে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই এম টেক অথবা এম ই-র সময় পড়ুয়া তার পছন্দের বিষয়ে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়।

(সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়) 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here