সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

0
1336
ড. বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়
রেজিস্ট্রার আইআইইএসটি, শিবপুর

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নানা দিক নিয়ে আমরা কথা বলেছি শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির রেজিস্ট্রার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

প্র: সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যে হেতু আপনি দীর্ঘ দিনের পেশাগত জীবন কাটিয়েছেন, তাই আপনার কাছে জানতে চাইব, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কাদের পড়া উচিত?

উ: বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী, যাদের ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যায় এবং বিশেষ করে অঙ্কে আগ্রহ এবং দক্ষতা রয়েছে, তার সঙ্গে আঁকাজোকার আগ্রহ কিছুটা আছে, তারাই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পারে। তবে ভর্তি হওয়ার আগে নেট ঘেঁটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টি সম্পর্কে জেনে নেওয়া দরকার। যদিও, আঠারো বছরের এক পড়ুয়া, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর যে শাখাটির সঙ্গে সব চেয়ে বেশি পরিচিত, সেটি হল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। বাড়ি, স্কুল বিল্ডিং, স্কুলে যাওয়ার রাস্তা, সেতু, সবেতেই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অপরিহার্য। অতএব নিজের অজান্তেই ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এই শাখার সঙ্গে সে পূর্ব-পরিচিত। তবু ভর্তি হওয়ার আগে কর্মরত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আলোচনা করলে বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা একটু মজবুত হবে।

প্র:আমাদের সমাজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা কতটা?  ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এই শাখায় পড়লে চাকরির সুযোগই বা কেমন?

উ: এই প্রসঙ্গে আসার আগে কিছু কথা বলি। পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলো সম্পর্কে আমরা জানতে পারি কী ভাবে? প্রাথমিক ভাবে অবশ্যই প্রাচীন স্থাপত্য থেকে সংশ্লিষ্ট সভ্যতার চরিত্র নিয়ে আমাদের মনে একটা ধারণা জন্মায়। দেশে এবং দেশের বাইরে এ রকম প্রচুর স্থাপত্য রয়েছে। আর যে কোনো স্থাপত্যের পেছনেই রয়েছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। অতএব সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা কিন্তু কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই রয়েছেন। তবে হ্যাঁ, পোশাকি নামটা অবশ্য এখনকার। উচিত-অনুচিতের প্রশ্নে যাচ্ছি না, তবে বর্তমানে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে উন্নয়নের মাপকাঠিটাই কিন্তু ফ্লাইওভার, ব্রিজ, শপিং মল, আকাশচুম্বী বাড়ি, অর্থাৎ এই সময়ের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবেই জড়িয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। আবার পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন করতে প্রয়োজন এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং, যা আদতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এরই একটি শাখা।

এ বার আমাদের দেশে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদার আলোচনায় আসি। ১৩০ কোটির দেশে ২০ কোটি পরিবারের এখনও পাকা বাড়ি নেই। এত মানুষের পাকা বাড়ির বন্দোবস্ত করতে হলে সব চেয়ে আগে দরকার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের। দেশের ৬৮% কৃষিযোগ্য জমি খরাপ্রবণ এলাকায় পড়ে, ১২ শতাংশ জমি বন্যাপ্রবণ এবং ভূমিক্ষয়প্রবণ।  ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাও সারা দেশে ৬০ শতাংশ। পাহাড়ি অঞ্চলের একটা বড়ো অংশ তুষারপাত ও তুষারধসপ্রবণ। এই সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ন্যূনতম পরিষেবাটুকু দিতে হলে দরকার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের। দেশের মানুষকে পরিবহণ (সড়ক, জল এবং আকাশপথে), বিদ্যুৎ এবং পানীয় জলের পরিষেবা প্রদানেও প্রয়োজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। শহরের সামগ্রিক পরিকাঠামো বৃদ্ধিতে এবং নতুন শহর তৈরিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অপরিহার্য। যারা দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে, তাদের কাজ করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। প্রতি বছর ভারতে প্রায় ১ লক্ষের কাছাকাছি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পাশ করে। সংখ্যাটা শুনতে অনেক হলেও তা কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কমই। আগের আলোচনাতেই বলেছিলাম চিন যেটা পেরেছে, আমরা এখনও পারিনি। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারটাকে আমরা ব্যবহার করতে পারিনি যথার্থ ভাবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের কাজের সুযোগ অঢেল। পিডব্লিউডি স্টেট,  পিডব্লিউডি সেন্ট্রাল, স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড, মেট্রো রেল, ইরিগেশন, ডিভিসি, এয়ারপোর্ট অথোরিটি অব ইন্ডিয়া, ওএনজিসি, সেইল, ভেইল-এর মতো সংস্থায় নিয়মিত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ হয়। এ ছাড়া প্রচুর রিয়াল এস্টেট ডেভেলপার, কনসালটেন্সি ফার্মের মতো বেসরকারি সংস্থা যেমন এল অ্যান্ড টি, টাটা, ইরকন ইন্টারন্যাশনাল, জেপি গ্রুপ, এসার, গ্যামন ইন্ডিয়া লিমিটেড, হিন্দুস্তান কন্সট্রাকশন কোম্পানি (এইচসিসি), জিভিকে-র মতো বেসরকারি সংস্থায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ হয়। আরও নানা সংস্থা রয়েছে। এখানে সব উল্লেখ করা সম্ভব নয় বলে কয়েকটা নাম বললাম। এ ছাড়া এই ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ক্ষেত্রে একটা বড় সুবিধে, সরকারি অথবা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করার ইচ্ছে না থাকলে নিজে স্বাধীন ভাবে কাজ করার সুযোগ থাকে। আজকাল অনেকেই চাকরি না করে নিজের কন্সালটেন্সি এবং কন্সট্রাকশন ফার্ম খুলছেন।

সিভিল নিয়ে পড়ে পরবর্তী সময়ে ম্যানেজমেন্ট পড়া যেতে পারে। এ ছাড়া আইএএস, আইইএস-এর মতো সর্ব ভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাতেও বসা যায়।

উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ প্রচুর সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নানা শাখায় (স্ট্রাকচারাল, জিওটেকনিক্যাল, ট্রান্সপোর্টেশন, এনভায়ারনমেন্টাল, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি) স্পেশালাইজেশনের সুযোগ রয়েছে। যার যে দিকে ঝোঁক বেশি, সেইমতো স্পেশালাইজেশনের বিষয় বেছে নিতে পারবে পড়ুয়ারা। স্নাতকোত্তর স্তরে পড়তে হলে গেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে স্কলারশিপ পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে পড়ার খরচ অনেকটাই কমে। গেট-স্কোর ভালো থাকলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোতে সরাসরি ইন্টার্ভিউ দেওয়া যায়, লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের মধ্যে পুরোনো আইআইটিগুলো, রুড়কি, শিবপুর বিই কলেজ(আইআইইএসটি), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে রয়েছে এখনও। দিন দিন বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ যে হারে বাড়ছে, পাশাপাশি শিক্ষকের চাহিদাও বাড়ছে। আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় শিক্ষক পড়ুয়ার অনুপাত ১: ১৫। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ভবিষ্যতে শিক্ষকতায় যাওয়ার সুযোগও থাকছে।

প্র: সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেয়েদের আসার প্রবণতা এখনও তুলনামূলক ভাবে কম। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা আছে, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেয়েদের চাকরির সুযোগ তেমন নেই, সেটা কতটা ঠিক?

উ: আমাদের দেশে সামগ্রিক ভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং-এই এখনও মেয়েদের সংখ্যা কম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ তা আরও কম। সাইট ওরিয়েন্টেড কাজে পরিকাঠামোগত নানা সমস্যা থাকার জন্য অভিভাবকরা তাঁদের মেয়েদের এই লাইনে পড়তে উৎসাহ দেন না। শুধু তা-ই নয়, সংখ্যায় কম হলেও কিছু সংস্থা এখনও নতুন কন্সট্রাকশন সাইট পরিদর্শনের কাজে মেয়েদের পাঠাতে চায় না। কিন্তু এখানে জেনে রাখা দরকার, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং মানেই কিন্তু সাইটে গিয়ে কাজ করা নয়। স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, এস্টিমেট, প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, মেটেরিয়াল পার্চেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, কনসালটেন্সির মতো নানা ভাগ রয়েছে। নিজেদের পছন্দের মতো কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে শেষ তিন দশকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেয়েদের আসার প্রবণতা বেড়েছে। আশির দশকের শুরুতে আমি নিজে যখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়, শিবপুর বিই কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ আমাদের ব্যাচেই প্রথম একটি মেয়ে ভর্তি হয়। এখন সেই সংখ্যাটা বেড়ে ১০ থেকে ১৫তে দাঁড়িয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ হলে মেয়েরা এখন ভালো চাকরিও পাচ্ছে, সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। শিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য যত তাড়াতাড়ি মুছে যায়, ততই ভালো।

প্র: দু’দিন আগেই জয়েন্টের ফল প্রকাশ হয়েছে। নিজের র‍্যাঙ্ক অনুযায়ী কলেজ বাছাইটা এখন পড়ুয়াদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। র‍্যাঙ্কিং-এ তুলনামূলক ভাবে পিছিয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের কলেজ বাছাই-এর ক্ষেত্রে কী কী বিষয় মাথায় রাখা জরুরি?

উ: বেসরকারি কলেজে যারা পড়বে, তাদের অবশ্যই খোঁজ নেওয়া উচিত কলেজে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো (উন্নত ল্যাবরেটরি) রয়েছে কিনা। কলেজের শিক্ষক হিসেবে কারা রয়েছেন, সেটাও খবর নেওয়া দরকার। বহু বেসরকারি কলেজের পড়ানোর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বহু কলেজ থেকে পাশ করেই ইঞ্জিনিয়াররা ভালো চাকরি পায় না, এটাও সত্যি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ক্ষেত্রে ঠিক কলেজ বাছাইয়ের গুরুত্ব অনেক। একজন ভবিষ্যতের ইঞ্জিনিয়ারের পেশাগত নৈতিকতা বোধ তৈরি হতে শুরু করে কলেজের দিনগুলো থেকেই।

সাক্ষাৎকার: মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here