স্মিতা দাস

‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো’  — এই কথাটাই বলতে চেয়ে এক বিশাল কর্মকাণ্ড করে গেছেন ঠাকুরপুকুর  ক্যানসার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সরোজ গুপ্ত। ক্যানসারের বিষয়ে মানুষের ভীতি দূর করতে, সচেতনতা বাড়াতে আর শিশু ও বড়োদের এই রোগের জ্বালা থেকে মুক্তি দিতে জীবনভর চেষ্টার কোনো অন্ত রাখেননি। তা সে পার্ক তৈরি করে ছোটোদের আনন্দদান, কী শিয়রে মৃত্যু দাঁড়িয়ে লাং ক্যানসারের এমন রোগীর শেষ সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছাপূরণ কিংবা ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার আধুনিক যন্ত্র নিয়ে আসা — কী না করেছেন পদ্মশ্রী এই মানুষটি। এর পর সেই আগুন জ্বালিয়ে রাখার গুরুদায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন তাঁর সুযোগ্য পুত্রকন্যাদের হাতে।

ডাক্তার সরোজ গুপ্ত। ঠাকুরপুকুরের সরোজ গুপ্ত ক্যানসার সেন্টার অ্যান্ড ইনস্টিটিউট-এর প্রতিষ্ঠাতা।

তবে রবিবার নন্দনে তিনি আলোচিত হলেন এক জন সুলেখক হিসেবে। এ দিন উপস্থিত বিশিষ্টজনেদের হাত ধরে প্রকাশিত হল সাহিত্যরসিক ডাক্তার সরোজ গুপ্তর একখানি ‘রচনা সংগ্রহ’। তাতে সংকলিত হয়েছে তাঁর সারা জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে লেখা বিভিন্ন মুডের নানা গল্প, নাটক। এই সমস্ত লেখাতেই প্রতীকী প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর চিকিৎসক জীবনের নানান অভিজ্ঞতার মুহূর্ত। কখনও রোগীদের মুখে হাসি ফোটাতে, কখনও পরিচালক বন্ধুদের আব্দারে চলেছে তাঁর কলম। তাঁর লেখা বেশ কিছু গল্প নিয়ে বানানো হয়েছে বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্রও। যেগুলি ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা তথা সমাজ সচেতনতা বাড়ানোর কাজেও সাহায্য করেছে। এই সংকলনটি প্রকাশ করার কাজে বিশেষ সাহায্য করেছেন তাঁর স্ত্রী ইলা গুপ্ত, জানালেন তাঁর দুই ছেলে অর্ণব ও অঞ্জন গুপ্ত।

এ দিনের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, সরোজদা নিজে যখন ছাত্র ছিলেন তখন থেকে তাঁর লেখায় আগ্রহ ছিল। কলকাতার বাইরে থেকে আসা ক্যানসার আক্রান্ত মানুষদের জন্য আশ্রয় তৈরি করার যে কর্মকাণ্ড তিনি শুরু করেছিলেন সেই সময়ের অভিজ্ঞতাও তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। তাঁর যাবতীয় চেষ্টা, যাবতীয় কাজের পেছনে যে উদ্দেশ্যটা কাজ করত তা হল সেবা। আর সেই উদ্দেশ্যে রোগীদের অন্তত কিছু সময় আনন্দ দিতে তিনি নিজে গল্প-নাটক লিখতেন।

বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট  চিত্রপরিচালক গৌতম ঘোষ। তিনি বলেন, ১৯৯৩ সালে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন ক্যানসার রোগীদের নিয়ে। সেই তথ্যচিত্রের মূল উপাদান সরবরাহ করেছিলেন ডাক্তার সরোজ গুপ্ত নিজে। এমনকি এ ছাড়াও তাঁর বেশ কিছু গল্প নিয়েও কাজ করেছেন গৌতম ঘোষ।

জগন্নাথ বসু ও ঊর্মিমালা বসু তাঁদের স্মৃতিও থেকে তুলে ধরেন নানা অভিজ্ঞতার কথা। জগন্নাথ বসু বলেন, এক জন ডাক্তার মানুষের কত কাছে আসতে পারেন, আর সেই কাছে আসার অভিজ্ঞতা যে কতটা ভালো করে ফুটিয়ে তোলা যায় লেখায়, তা বোঝা যায় ডাক্তার সরোজ গুপ্তের লেখা গল্পগুলো পড়লে। তিনি বলেন, সরোজদা সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন, তাঁর লেখার ভঙ্গিও বেশ সরস আর চমৎকার। তাঁর লেখা গল্পের মধ্যে পুরোনো দিনের কলকাতাকেও ধরা রয়েছে। সে দিক থেকে মনে হয় ওঁর বইটা পাঠকদের ভালো লাগবে। এক জন সার্থক চিকিৎসকের পাশাপাশি এক জন সরস লেখক বা সাহিত্যিকও ছিলেন তিনি, বলেন জগন্নাথ বসু। উর্মিমালা বসু বলেন, অভিভাবক হিসেবেও তিনি ছিলেন যথাযথ।

গানে গানে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়, ‘খোলা হাওয়ায়’ দাদুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংগীত পরিবেশন করেন তাঁর নাতি নাতনিরা। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানেন ছোটো ছেলে অর্ণব গুপ্ত, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’ গানের সুরে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here